Published : 21 Aug 2022, 04:28 PM
আঁধারের আরতি থেকে আলোর অর্ঘ্য পর্যন্ত এক নিবিড় যাত্রা—সে যাত্রায় বেজে ওঠে আঁধার এবং আলো। যদি না বেজে উঠত তবে তরঙ্গের বিভায় জগতের সৃজন ঘটত কি? বাজিয়ে তোলার সুলুকে হাঁটি, চলুন।
একটি সত্য অন্য সত্যের থেকে যখন নিজের সত্তাকে আলাদা করে নেয় তখন সে বেজে ওঠে। একটি বাস্তব যখন হয়ে ওঠে তখন সে বেজে ওঠে। যখন সে হয়ে ওঠে, অস্তিমান হয়, তখন তার বেজে ওঠাই অস্তিমান হয়।
আপাতত বুঝি তবলাকে বাজায় হাত—হাত ও তবলার মাঝে বিরাজ করে শূন্য। তবলাকে যদি বাজতে হয় তবে হাত ও তবলাকে হতেই হবে ভিন্ন দুই সত্তা, যাদের রয়েছে নিজ বাসনা, ব্যক্তিত্ব ও ভাষা—এবং সেই কারণে সংলাপে যাবার যৌনতাও রয়েছে তাদের দুইয়ের অবারিত। কে কাকে বাজায়? তবলাও কি হাতকে বাজায়! বিহার যে এমনই!
যৌনতা কেবল সঙ্গম নয়, সংঘর্ষও বটে: একে অপরকে ভেঙে এবং ভাঙতে ভাঙতে জুড়তে থেকে—কে কার প্রদেশে কতটা আগ্রাসনে কতটা স্নেহে কতটা প্রেমে অধিকার পেয়ে যায় সেসব চিহ্ন গোপন রয়, তবু কখনও কখনও ভাস্বর হয়ে ওঠে: যখন তারা উড্ডীন অবগাহনের অতলে নিজেদের হারিয়ে ফেলে এবং খুঁজে পেতে থাকে আকাশগঙ্গায়। তবেই তো বিচ্ছিন্নতা থেকে মিলনের মাঝে কাজ করা সুতোগুলো স্পন্দিত হয়—স্তন থেকে স্তনন।
তবলাদেহের অভেদ্যতাকে ছন্দ-শিল্পিতার ছায়ায় বাজিয়ে তুলতে থেকে, তার অতলকে ছুঁয়ে যেতে যেতে অধিকার করতে থাকে হাত। হাত কি জানে যে তার স্নায়ুকে উত্তাল করে আনন্দের বেশে গাঢ়তর আগ্রাসনে অধিকার নিয়ে নেয় তবলাটি!
তবলা ও হাত একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে তাদের দুইয়ের মাঝে বিরাজমান শূন্যে যেসব সত্য অপেক্ষা করে তাদের স্পন্দিত করতে হলে তবলা ও হাতের বিরহকে উদযাপন করতে হয়। বিচ্ছিন্নতার সূত্রে নিহিত রয়েছে আরাধ্য সব জগতের সক্রিয় হয়ে ব্যক্ত হওয়ার বাসনা। একেকটি নক্ষত্র নিজেদের গেঁথে নেয় মহাশূন্যে। মনে যেন রাখি যে, নক্ষত্রগুলো নিছক কথা নয়, বরং তারা সেই কেন্দ্র যাদের ঘিরে জমাট বাঁধে বিশাল শূন্য। নক্ষত্রের মাঝে বিরাজ করে শূন্যের বাসনার বীজ, নক্ষত্র দেহ ঘিরে জাগে শূন্যের স্থিতিসাগর—তাদের আবর্তনকে দেখতে দেখতে এগিয়ে যাই আমরা।
তবলা কি একটি তালবাদ্য! তাল কি আসলে সেইনিটি বা প্রকৃতস্থতার সূচক? অমিত এবং অনিয়ত জগতসমূহের অধরা দশার অগণন সম্ভাবনা থেকে একটি দুইটি কিংবা কয়েকটি স্রোতকে ধরতে চাই যখন, এই তাল তখন আমার সহায়। অনিয়ত যত বাস্তব-খন্ড ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের মাঝে তবলায় বোল তুলে সেসব বিচ্ছিন্ন জগতের ভাঙা সিরামিকের টুকরোগুলোয় গলিত স্বর্ণের প্রলেপ দিয়ে জুড়ে দিই, আর তখন তা সমগ্রতার রূপ পেয়ে আমার মরমকে বিস্তৃত করে যুক্ত করে অনন্তের সাথে—এমনই লীলা।
তবলার মত একটি সাদৃশ্যহীন বাদ্য নিজের গর্ভে কী কী জগতকে ধরে রেখে গুম হয়ে রয়েছে—চলুন তন্ময় হই। আপনি স্পর্শ করেন তার দেহে আর সে একটি একটি করে অভিব্যক্তি বেদনা আপনাকে দান করে। একেকটি বোল একেকটি জগত—যেসব জগতের শিরা উপশিরা আপনার মাঝে শেকড়ের মত গেঁথে নিচ্ছে নিজেদের। কিংবা বিদ্যুল্লতার মত পেরিয়ে যাচ্ছে আপনার স্নায়ু জাল। এত এত বিপুল জগতের দিকে যাত্রা করলে আমরা দিক হারাতে পারি বিধায় অল্পের ধ্যান আপাতত আমাদের আরাধ্য হোক।
তবলার মিষ্টতা আমাদের যখন ছুঁয়ে যায় তখন কেবল মিষ্টতাই আমারা লাভ করি তা নয়। বরং সেই স্রোতের কথা ভাবুন যা তবলার প্রতিটি ধ্বনিবিস্তারের সাথে সাথে আপনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই স্রোত একবার আপনার আত্মার দেয়ালকে ভিজিয়ে সরে যায় সাথে সাথে—তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিতে দিতে স্রোতের তরঙ্গ এঁকে বেঁকে একবার ছুঁয়ে, একবার দূরে যেয়ে আপনার চেতনাকে অতিক্রম করে আপনাকেই নিয়ে যায় অন্য কোথাও। স্রোতটি নিজের পথ খুঁজে বেরিয়ে যায়, একটি মোহনায় নিজেকে মুক্ত করে, হারিয়ে যায়—যার খোঁজ আপনি আর কোথাও কখনও পাবেন না। আপনাকে সে রেখে যায় নিঃস্ব ও বিপন্ন দশায়।
তাল যদি আপনাকে জাগ্রত ও যুক্ত রাখে তথা একাগ্রতা দান করে, অর্থাৎ প্রকৃতস্থতা অথবা সেইনিটিতে টিকিয়ে রাখে আপনাকে, সেই সেইনিটির জগতটি কেমন? বিপরীত দিকে ইনসেইনিটি অথবা অপ্রকৃতস্থতার জগতটিই বা কেমন? আমার মতে ইনসেইনিটির জগতটি আপাতদৃষ্টিতে গোলমেলে হলেও তার দান করার এবং প্রকাশিত হবার সুযোগ বেশি। কেননা সে পরোয়াহীন এবং অবারিত, কাজেই নিজের ভেতরটা খুলে দেখাতে সে সংকোচহীন, অতএব আপনাকে সে দেখতে দেয়ও বেশি। অগোছালো থাকাটা তার নিজের গড়ে তোলা একটি আড়াল মাত্র। নিত্যে ধাতস্থ এবং ধাতস্থ হতে ইচ্ছুক আমাদের মন সেই অগোছালো অজস্র জগতকে একত্রে সামাল দিতে পারে না—কেননা আমাদের মানসের অভ্যস্ততা চেনা বাস্তবের বাইরে যেতে সংশয়ে পড়ে।
আমাদের মন যখন সেই অগোছালকে সামাল দিতে শিখে ফেলে তখন আবার সেই এলোমেলোকে সামাল দেয়া মনের অধিকারী মানুষটিকে সামাল দিতে পারে না আমাদের পরিপার্শ্ব। উন্মাদ, ইত্যাদি নামে ডাকতে শুরু করে তাকে—কেবল সেই নতুন করে এলোমেলো হয়ে যাওয়া লোকটিকে চিহ্নিত করে দেয়া এবং তাকে এড়িয়ে চলবার উদ্দেশ্যেই। কেউ কেউ অবশ্য স্নেহও করেন। পাগলকে স্নেহ করার ঐতিহ্য আমাদের তো রয়েছেই। অস্বীকার করি কেমন করে! স্নেহ করার পেছনের রহস্যটিই বা কী?
তা যাইই হোক, ইনসেইনিটির তুলনায় সেইনিটি গোপন করে অনেক বেশি, কেননা তার জগতটা বরং বেশি জটিল ও গোলমেলে, কেননা সে আপোষকামী, আপাত স্থিতির সাথে তার সমঝোতা সদা চলমান। ভূপৃষ্ঠের মত নিজের ওপরে একোটি ক্রাস্ট দিয়ে সে ভেতরের আন্দোলনকে আড়াল করেছে চতুরভাবে। সে কি তবে চায় না তার গভীরে প্রবেশ করুক মানব হৃদয়? যদি না চায় তবে কেউ কেউ কেমন করে তার খোঁজ পেয়ে যায়! যারা পায় তাদেরকেই তো আমরা ইনসেইন বলে চিহ্নিত করি। কেননা তারা সেই দরজাগুলো দেখতে পায় যেখানে একটি সূক্ষ্ম, অর্ধভেদ্য কিংবা সদা বিলীয়মান এবং বিকাশমান রেখার দুই পাড়ে সেইন আর ইনসেইন দুই জগত একত্রে চলেছে!
সদা বিলীয়মান ও বিকাশমান রেখাটির নিজস্ব একটি স্থিতির চেষ্টা রয়েছে, আবার সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে এও সত্য। রেখাটির দুই ধারের দুই জগত একে অপরের সাথে মিলে যেতে চায় এবং নিজেদের স্পর্শও করে তারা। স্পর্শ যখন করে তখনই তো আমরা নিজেদের ভেতরে মহাবিশ্বের সাথে সংযুক্ত হওয়ার স্বাদ পাই, আমরা হৃত হই, স্থবির হয়ে চেনা জগত থেকে বিচ্যুত ও বিচ্ছিন্ন হই। কিন্তু সাদা-কালোয় বিচার করতে অভ্যস্ত জগত আমাদের নিয়ে পিছুটান দেয়। তখন ফিরে আসতে হয়। সেই রেখাটি তখন নিজেকে ঐ বিন্দুতে জাগিয়ে তোলে, ভেদ রেখা হয়ে ওঠে সে।
প্রকৃতস্থতার বা সেইনিটির একটি শঙ্কা ও সংশয় এই যে, সে আশ্রয়হীন হয়ে পড়তে পারে। যদি সে কিছুমাত্র ছাড় দেয় তবে তার একনিষ্ঠতার কিংবা একমুখীণতার সাধনা ভেঙে পড়তে পারে। তার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এমন সব প্রদেশ ও সময় যার হিসেব তার খতিয়ানে মেলানোর শক্তি হয়ত তার নেই।
অপরদিকে অপ্রকৃতস্থতার সমর্পণ এমন ধারায় যে নিজেকে সে অণু-পরমাণুতে বিশ্লিষ্ট করে ভেঙে ফেললেও তার একত্বের কুল ভাঙে না, বরং অবিরত ছড়িয়ে পড়ে আলো, বহুর মাঝে সেই এককে ধরতে তার অনায়াস সফলতা অবিরত থাকে, বহু রূপে, বহু নামে, বহু স্বরে বহুকে যেমন ধরে সে, এককেও ধরে। সে নিজের মাঝ থেকে আশ্রয়ের নীড়কে ছড়িয়ে দিতে থাকে বহু পাখির বহু গানের বেজে ওঠায়। নিখোঁজের সেই সীমা তারই জন্য অপেক্ষমাণ যেই কুলে বিপন্নতা একটি বিজয় ও সম্পন্নতা হয়ে হীরের মত উজ্জ্বল হয়ে থাকে বহু কোণের বহু কিরণের ছটায়, দীপ্তিতে।