পাঁচ আঙুলের সাতকাহন

সেঁজুতি জাহানসেঁজুতি জাহান
Published : 16 Nov 2022, 01:04 PM
Updated : 16 Nov 2022, 01:04 PM

হাতের পাঁচটি আঙুল সমান নয়

প্রবাদটি আমরা মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি বোঝাতে ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এই পাঁচটি আঙুলের প্রত্যেকটি যে মনুষ্য সমাজে ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন-ভাষায় কথা বলে থাকে তা আমরা টের পাই কম।

পাঁচ আঙুলের নাম আমরা সবাই জানি- বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা এবং কনিষ্ঠা। ইংরেজিতে বললে- থাম্ব, ইনডেক্স ফিঙ্গার, মিডল ফিঙ্গার, রিং ফিঙ্গার ও লিটল ফিঙ্গার।

নার্সারি রাইমসে ইংরেজরা হাতের পাঁচ আঙ্গুলকে আদর করে ফিংগার ফ্যামিলি নাম দিয়েছে। সেখানে বৃদ্ধাঙ্গুলি হচ্ছে ড্যাডি ফিংগার, তর্জনিকে বলে মাম্মি ফিংগার, মধ্যমাকে ব্রাদার ফিংগার, অনামিকাকে সিসটার ফিংগার, কনিষ্ঠাকে বেবি ফিংগার। তার মানে একটা আঙুল পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন ও একটি শিশু আবশ্যক। এই পাঁচজন ছাড়া পরিবারটি যেন অসম্পূর্ণ!

কিন্তু মানুষের ভাষিক দুনিয়ায় আঙুলগুলো বিচিত্রভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের মানব-ভাষায় আমরা প্রতিনিয়ত আঙুলের ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন-ভাষা ব্যবহার করে থাকি। আর পাঁচ আঙুলের ব্যবহার ছাড়া তো জীবন অকল্পনীয়। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন রচিত সেমিরূপকথার বইয়ের একটি গল্প বুদ্ধদেব বসু অনুবাদ করেন 'আঙ্গুলিনা' শিরোনামে। 

'আধ আঙ্গুলে' নামের একটা গল্পও আমাদের এই দেশে বেশ প্রচলিত। তো এই আঙুল বিষয়ক নানা তথ্য ও আঙুল-ভাষার ব্যবহার নিয়ে কী কাণ্ড ঘটেছে তার কিছুটা হদিস নেয়া যাক।

তবে ঘটনা, রূপকথা, কল্পকথা যাই বলুন কেন, আঙুল কিন্তু কবিদেরকেও কম ভাবায় নি। আমাদের নিজেদের ভাষাতেই রচিত কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার বইয়ের নামই হয়েছে এই আঙুলের নামে: ঝর্ণা আমার আঙুলে । আর এই কবির সৃষ্টিশীল আঙুলকে নির্দেশ করে আরেক কবি বেলাল চৌধুরী লিখলেন এক কেতাব, সেটিও আঙুল থেকে বিচ্ছিন্ন নয়: শামসুর রাহমান রূপালি আঙুলের ঝর্ণাধারা

অবশ্য এই আলোচনার মূল লক্ষ্য কবিতায় আঙুলের ব্যবহার দেখানো নয়, বরং আঙুলকে ঘিরে অন্য মানুষের অন্য কিছু উদ্ভাবনা ও বিশ্বাসের অনুসন্ধান।

আমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলকে আমরা বুড়ো আঙুল বলি। কেউ কেউ মনে করেন এটা দেখতে বুড়ো মানুষের মতো তাই এটাকে বৃদ্ধাঙ্গুল বলে। কিন্তু হাতের অবস্থান একটু খেয়াল করলে টের পাওয়া যাবে এটি ছাড়া 'অঞ্জলি' অসম্ভব। অর্থাৎ বয়োজ্যেষ্ঠ আঙুলটি ছাড়া, বা যদি এভাবেও বলি তার অভিজ্ঞতা ছাড়া মানবকুলের প্রার্থনা বা নিবেদনটা যেন ঠিকঠাক মতো হয় না।

আবার শক্ত করে কিছুকে ধরে যেকোনো সময়ের অনুকূলে এগোনোর জন্য আমাদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলির সহায়তা নিতে হয়। মানব-বিবর্তনের ইতিহাসে এই বৃদ্ধাঙ্গুলই মানুষকে অন্যপ্রাণী থেকে অগ্রসর করেছে। মানুষের মতো পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীই এভাবে ধরতে পারে না।  কারণ 'বুড়ো' এই আঙুলের অবস্থান হাতের অন্য আঙুলের চেয়ে একটু বিপরীতমুখী। নৃ-বিজ্ঞান যাকে 'অপজিট থাম্বস' বলে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আঙুলগুলোকে মেলে ধরে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় প্রাইমেটের একই গ্রুপের সব প্রাণীর সঙ্গে মিল থাকলেও মানুষের হাতের গঠন অন্য যেকোনো প্রাণীর হাতের গঠন থেকে বেশ আলাদা। ইংরেজিতে থাম্প প্রদর্শন মোটামুটি অভিজ্ঞ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সমর্থনবাচক চিহ্নের অর্থই বোঝায়।

আবার এই আঙুল দেখিয়ে তাচ্ছিল্য অর্থে কাঁচকলা প্রদর্শনও বোঝানো হয়। বাংলার এই কাঁচকলা দিয়ে যা বোঝানো হয়, সেটি ইংরেজিতে মিডল ফিঙ্গার দিয়ে বোঝানো হয়। অর্থাৎ ধ্বংস অর্থটি অধিক প্রচলিত। আজকাল অবশ্য ইংরেজি মিডল ফিঙ্গারের ব্যবহার বাংলাতেও বেশ বেড়ে গেছে। ফলে কোনো কিছু নিয়ে চরম বিরক্ত বা চিন্তিত থাকলে বাংলা বা ইংরেজি ভাষার অধিকাংশ মানুষই এখন মিডল ফিঙ্গার দেখিয়ে ছেড়ে দেয়। মুখে স্ল্যাঙ বলার চেয়ে এটি বেশ সহজ। আর এই চিহ্ন-ভাষা যেহেতু আম-পাবলিকের সভ্য ভাষার মধ্যে পড়ে না, সেহেতু তুলনামূলক জনপ্রিয় হয়েছে ভাষাটি। আমাদের মাথায় রাখা উচিৎ 'জনপ্রিয়তা'র সঙ্গে জনগণের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্যতার একটা আদি সম্পর্ক আছে। ফলে 'জনপ্রিয়' মানেই অখাদ্য বা ক্লাসিক নয়, এমন ভাবার কোনো কারণ নাই। সমাজের এই ডিজিটালাইজেশনের আগে মিডল ফিঙ্গার বা মধ্যমার বাংলা কোনো চিহ্ন-ভাষা ছিল না। ইংরেজি এই চিহ্ন-ভাষার উদ্ভব ঘটেছে ফরাসি আর ইংরেজদের মধ্যেকার চিরচেনা সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ থেকে।

অন্ত্ররজাল থেকে পাওয়া ঘটনাটা খানিকটা এরকম : ১৪১৫ সালে এজিনকোর্টের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ফরাসি আর ইংরেজদের মধ্যে। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ফরাসিরা নিজেরা নিজেরা যুক্তি করে নিজেদের মধ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে আপাত যুদ্ধে জিতে গিয়ে সকল ইংরেজ সৈন্যের মধ্যমাকে কেটে ফেলা হবে যাতে ভবিষ্যতে ইংরাজরা প্লাক গাছ থেকে তৈরি করা তাদের বিখ্যাত ধনুক দিয়ে তীর নিক্ষেপ করতে না পারে। উল্লেখ্য ইংরেজরা ঐ তীর ছোড়ায় অনেক পারদর্শী এবং বিখ্যাত ছিল। আর শতবর্ষ ধরে চলা ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধের একটা পরম্পরাও ছিল।

সেই যুদ্ধে ইংরেজরা রাজা পঞ্চম হেনরীর নেতৃত্বে জয় লাভ করে। এবং জেতার পরে তারা ফরাসিদের মধ্যমা দেখিয়ে বলেছিল, দেখো আমরা এখনো তোমাদেরকে প্লাক করতে পারি। যতোদূর জানা যায় ইংরেজদের ওই প্লাক গাছের ধনুক সম্পর্কিত কিংবদন্তি থেকে 'প্লাক ইউ' এবং 'প্লাক ইউ' থেকে আজকের 'ফাক ইউ' চিহ্ন-শব্দগুচ্ছের জন্ম।

তর্জনী বা ইনডেক্স ফিঙ্গার তো বরাবরই নির্দেশাত্মক চিহ্ন-ভাষা বোঝায়। নেতা থেকে শুরু করে ঘরের বাচ্চার চাঁদমামা নির্দেশ করা পর্যন্ত এই তর্জনীর চিহ্ন-ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আবার ঝগড়ার সময় অনেকেরই তর্জনী উঠে যায় মোরগ লড়াইয়ের মোরগের গ্রীবার মতো।

বাম হাতের চতুর্থ আঙুলে বিয়ের আংটি পরানোর রীতি সম্পর্কে বলা হয়, হার্ট থেকে একটা শিরা নাকি সরাসরি অনামিকার সঙ্গে যুক্ত। এই শিরার নাম ভেনা এমোরিস বা ভেইন অব লাভ। প্রাচীন রোমানরা এই অদ্ভুত তত্ত্ব বের করেছিলেন। এই উদ্ভাবিত সূত্রের ইতিহাস না জানা থাকলেও এর বিশ্বাস এখন অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই প্রচলিত। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এনগেইজমেন্ট অনুষ্ঠানে পাত্রীর বাম হাতের অনামিকায় একটি আংটি পরানো হয়। আর এই জন্যই বোধ হয় আঙুল পরিবারের সিস্টার ফিংগারকে রিং ফিংগারও বলা হয়ে থাকে। 

অনামিকা বা ইংরেজি রিং ফিঙ্গার নিয়ে আমার কিছু নিজস্ব কথা বলবার আছে। তার আগে এর পৌরাণিক ইতিহাসটা জেনে নেওয়া যাক। ভারতীয় পুরাণে যে ঘটনাটির কারণে রিং ফিংগারের নাম 'অনামিকা' হয়েছে তা হলো: মহাদেব শিব একবার ভীষণ রাগান্বিত হয়ে চতুর্মুণ্ডু ব্রহ্মার একটি মুণ্ডু ঘাড় থেকে খুলে ফেলেন। এই কাজে তিনি অস্ত্রের বদৌলতে এই অনামিকাকে ব্যবহার করেছিলেন।

পরে স্বাভাবিক হওয়ার পর অনুতপ্ত শিব নিজের এই অনামিকা আঙুলকে অভিশাপ দিলেন এই বলে যে: 'আজ থেকে তুই নাম গ্রহণের যোগ্যতা হারালি।'

ইংরেজি ভাষা-সভ্যতায় এনগেইজমেন্ট হয় এই আঙুলে রিং পরানোর মাধ্যমে। যেটা আমাদের এখানেও এখন ব্যপকভাবে প্রচলিত। 

ফলে মজা করেই এ কথা বলা যায় যে, অভিশপ্ত ওই নামহীন অনামিকাটি আসলে বিবাহিত বা এনগেইজড নরনারীকে একটি আংটির মাধ্যমে দুটি পক্ষের মধ্যে একটি গতি করে দেয় হয়ত! 

তা না হলে হাত এবং পা মিলিয়ে এতোগুলো আঙুল থাকতে এই ভেনা এমোরিস প্রবাহিত আঙুলটিতে আংটি পরিয়ে এনগেইজড দেখানোর কারণ কী? এমন নয়তো : একটি নামহীন অভিশপ্ত আঙুলকে প্রেমের শক্তি দিয়ে শাপমুক্ত করা? প্রিয়ের নামটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া?

কনিষ্ঠা বা লিটল ফিঙ্গার দিয়ে প্রায় সর্বত্র ওয়াসরুমের জরুরত বোঝানো হয়। কান চুলকাতেও কনিষ্ঠার অবদান জগৎ জুড়ে।

হাতের পাঁচটি আঙুল আসলেই সমান নয়। কেউ যদি কাউকে অনামিকা প্রদর্শনের অর্থ বোঝাতে মধ্যমা প্রদর্শন করে দেয় তো ওপরওয়ালা রক্ষা না করলে কী ঘটনাটাই না ঘটে যেতে পারে!

‘হাতের কাজ' বলতে এই পাঁচটি আঙুলের নানাবিধ কর্মযজ্ঞকেই বোঝানো হয়। বলিউডের অভিনেতা ঋত্বিক রোশনের মতো হাতের আঙুল পাঁচটির বদলে ছয়টি থাকলে কিন্তু কাজের গতি খুব একটা বাড়ে বা কমে না। কিন্তু পাঁচটির পরিবর্তে চারটি বা তিনটি অথবা পাঁচটির অবস্থা ও রক্ত সঞ্চালন যদি অনিয়মিত হয় তাহলে কিন্তু কাজের গতি বেশ বাঁধাগ্রস্ত হয়।

তার মানে আঙুলগুলো হোমো স্যাপিয়েন্স গ্রুপের প্রাণীদের জন্য কেবল কিছু প্রত্যঙ্গ নয়, হাতের পাঁচটি আঙুলের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে মানুষ বিবর্তন ও বুদ্ধিমত্তার পথে সমানতালে এগোতে পারে।

সুতরাং হাতের পাঁচটি আঙুলের যত্ন নিন এবং তাদের চিহ্ন-ভাষাগুলোর ইতিহাসও জেনে নিন। না হয় এই ভাষার সংকটে বরবাদ হয়ে যেতে পারে নিজেরটাসহ অপরের জীবনটাও।

মানব ইতিহাসে কেবল মুখের ভাষাই শুধু ভাষা নয়। হাতের পাঁচটি আঙুলও অনেক কথা বলে। সালাম বা টাটা বোঝাতেও কিন্তু হাতের অবস্থানের ওপর নির্ভর করা লাগে। দশভুজা হতে গেলে কিন্তু আগে হাতের আঙুলের কারিশমার ওপরই জোর দিতে হয়। কোনো কিছু হাতড়ে না পেলেই তো আমাদের মেজাজ বিগড়ে যায়।

সর্বোপরি বলতে চাই, 'হাতের পাঁচ' বা পাঁচটি আঙুলকে যেন কোনো অবস্থাতেই না হারাই আমরা। এই হাত দিয়েই যে আমরা মরুতের মাঝে সাঁতার কেটে কেটে সময়ের সাথে এগোচ্ছি, সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছি? আমরা মানুষেরা আসলে এক ধরনের ডাঙার মাছ, যারা পানির বদলে বাতাসে বসবাস করে; অন্তত ঈগলের দৃষ্টিতে তাই তো! 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক