Published : 19 Apr 2026, 03:52 PM
বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি মাধ্যমেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও ত্যাগের মুহূর্তগুলো শিল্পমাধুর্যে বোনা হয়েছে। তবে এর মধ্যে উপন্যাসের মাধুর্য পাঠককে সবচেয়ে গভীরভাবে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসিক ঘটনা ও মানুষের অনুভূতি অনুভব করাতে সক্ষম হয়েছে। কারণ এতে মানুষের জীবনের নানান দিক-অনুভূতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন যেমন লিপিবদ্ধ হয় তেমনই দ্বন্দ্ব, আনন্দ ও বেদনা—বহুমাত্রিকভাবে প্রকাশিত হয়। বাস্তবতা ও কল্পনার সম্মিলনে উপন্যাস পাঠকের সামনে জীবনের এক গভীর ও বর্ণিল প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। দেশের বিখ্যাত ঔপন্যাসিকদের কলমে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, শিল্পের এক জ্বলন্ত রূপ হয়ে ধরা দিয়েছে। যার সর্বশেষ সংযোজন কবি ও কথাসাহিত্যিক জব্বার আল নাঈম। তিনি তার লেখা ‘মাস্টার’ উপন্যাসের মাধ্যমে হৃদয়ে ইতিহাস, আবেগ ও স্মৃতির যে আলোক ছড়িয়ে দিয়েছেন তাতে নিঃসঙ্কোচেই বলতে পারি—জব্বার দৃপ্তপায়েই পদক্ষেপ ফেলেছেন পূর্বপুরুষদের দেখানো পথে।
চাঁদপুরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়কালের একটি সত্যি ঘটনাকে লেখক কাহিনির উৎস করেছেন এখানে। ঘটনা এবং চরিত্রগুলো অতীত থেকে সংগ্রহ করা হলেও উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আবার কখনো সমাজ, পরিবেশ কিংবা ইতিহাস থেকেও অনেক উপাদান গ্রহণ করেছেন। তাই পাঠ করতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে এই উপন্যাসে একটি গল্পকে উপস্থাপন করার পাশাপাশি মানবজীবনের জটিলতা ও বৈচিত্রকেও শিল্পিতভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়েছেন লেখক। ফলে চরিত্রের গভীরতা, আবেগের সত্যতা এবং জীবনচিত্রের বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন—সবকিছুরই বাস্তবসম্মত সমন্বয় ঘটেছে এই উপন্যাসে।
ইতিহাসকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস ‘মাস্টার’ এর বেশির ভাগ অংশ চাঁদপুরের কাশিমপুর গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, আর পটভূমি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ এবং এর অব্যাবহিত পরের সময়কালের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। মোটা দাগে উপন্যাসটি ১৯৭১—এর পূর্বপর্ব থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা ও ১৯৮৮ সালের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বারবার ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং স্বপ্নদ্রষ্টা কিছু ব্যক্তির সাহসী উত্তরণের চিত্র। তবে উপন্যাসে গ্রামের চিত্রনাট্য থেকে আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবে গ্রামের জনজীবন ও জনপদে যে তীব্র ও দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, তা পাঠকের উপলব্ধিতে নতুন দৃষ্টিকোণে লেখকের ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানাকে অবলোকন করতে পারা।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ননী গোপাল নন্দী নামের একজন শিক্ষক, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রেমে জড়িয়ে পড়েন নবনীতা দেবসেন নামে তার নিজ গ্রামের এক তরুণীর সঙ্গে। নবনীতা গ্রামের মেয়ে হলেও ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী এবং প্রাণবন্ত। লেখকের ভাষ্যে—‘নবনীতা নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চান।’ মেধাবী নবনীতা একসময় ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেলে। ঢাকা মেডিকেল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বল্প দূরত্বের কারণে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাত ননী গোপাল আর নবনীতার ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু জমিদার বংশের উত্তরাধিকার ননীর বাবা এ সম্পর্ক মেনে নেন না কিছুতেই। ত্যাজ্য করেন সন্তানকে। অভিমানী ননী গোপাল নন্দী পরিবার এবং প্রেম সবকিছু ছেড়েছুড়ে বেছে নেন শিক্ষকতা। চাঁদপুরের কাশিমপুরের এক হাইস্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি যখন শিক্ষকতা শুরু করেন তখন ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সে ঢেউ এসে পড়েছে গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝেও। তিনি তাদের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেন। হিন্দু ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে ছাত্ররা প্রথমে তাঁকে বিশ্বাস না করলেও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সখ্যতা। তিনি কেবল পাঠদাতা নন, বরং একজন দিকনির্দেশক এবং প্রেরণাদাতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন ওইসময়ে।
দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনাও জাগ্রত করে দেন ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে। ইতিহাস, গণিতের সমীকরণ এবং বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে ছাত্রদের বোঝাতে থাকেন কী কারণে স্বাধীনতা প্রয়োজন এবং এর জন্য ত্যাগ স্বীকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাদের শেখান নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ। গড়ে তোলেন সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী হিসেবে। ছাত্রদের এভাবে নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করার কারণে একসময় শত্রুর আক্রমণের শিকার হতে হয়। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার শরীর, মুখমণ্ডল। সুদূর ভারতে যেয়ে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে চেহারা ঠিক করতে হয়। তবুও দমে যাননি তিনি। যুদ্ধশেষে নব উদ্যমে নেমে পড়েন। তার চেষ্টা ছিল যেন ছাত্ররা শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়, কারণ শিক্ষিত জাতিই ভবিষ্যতে দেশ গড়তে সক্ষম। তিনি বিভিন্নভাবে তার ছাত্রদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেন। সহায়তা করেন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যেতেও।
তবে সমাজে ভালো লোকের চাইতে মন্দ লোকের পরিমাণ যেন বেশি। মানুষের ভালো তারা কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। এরকম কিছু চরিত্র সুদেব মাস্টার, প্রান্ত মাস্টার, হান্নান মেম্বারের মতো লোকেরা। তারা বিভিন্নভাবে ননী মাস্টারকে বাধাগ্রস্ত করতে থাকে। যখন কিছুতেই থামাতে পারে না মাস্টারকে তখন সন্তানতুল্য ছাত্রী জয়ার সাথে ননী মাস্টারকে জড়িয়ে কুৎসা রটানোর মতো নিন্দনীয় কাজ করেন তারা। ঘৃণ্য এই কাজকে মানতে পারেন না ননী মাস্টার। অভিমানে সব ছেড়েছুড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। অভিমানী মাস্টার একসময় ছাড়েন বাংলাদেশও—চিরদিনের জন্য।
আমি যতটুকু বুঝি তা হলো—ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসে সময়ের প্রেক্ষাপট এবং চরিত্রচিত্রণ; দুটি ব্যাপারকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সময় এখানে অপরিহার্য উপাদান, কারণ ইতিহাসের ভিত্তি নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়কালকে কেন্দ্র করে। অপরদিকে চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে লেখকের সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ইতিহাসনির্ভর গল্প, উপন্যাসের চরিত্রগুলো কখনো ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কল্পনায় নির্মিত হয়, আবার কখনো প্রকৃত ইতিহাসের ব্যক্তিত্ব হিসেবেও উপস্থাপিত হতে পারে। এই উপন্যাসে লেখক ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কল্পনায় নির্মাণ করেছেন চরিত্রগুলো। তবে লেখায় কল্পনার বিস্তার ঘটালেও লেখক জব্বার আল নাঈম ইতিহাসের সত্যতাও বজায় রেখে স্বকল্পিত পরিবেশ ও আবহ নির্মাণের মাধ্যমে কাহিনিকে করেছেন জীবন্ত। ঘটনাবিন্যাসে এমন এক স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা তিনি বজায় রেখেছেন যে, পুরো রচনাটিকে নিছক কাহিনি মনে না হয়ে ইতিহাসেরই এক নিরবচ্ছিন্ন পাঠ বলে মনে হয়। এর পর্বগুলোতে যুক্ত হয়েছে আবেগের গভীরতা, যা পাঠককে স্পর্শ করে। তাছাড়া বিভিন্ন নীতিবাক্যের ব্যবহার উপন্যাসটিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে যা পাঠের একঘেয়েমিতা দূর করে এটিকে আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করে তুলেছে।
উপন্যাসে লেখকের ভাষাও আমাকে বিশেষভাবে টেনেছে। মর্মস্পর্শী উপস্থাপনার কারণে উপন্যাসটি গভীর আবেগ সৃষ্টি করেছে। যতবার পড়া যায়, ততবারই এটি এক ধরনের তীব্র বিষাদ ও বেদনার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৫০ বছর পরে রচিত হলেও সেই সময়কার মানসিকতা ও বাস্তবতার একটি সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হবে উপন্যাসটি।
ফলে পাঠ শেষে অনুভব করতে পারি, জব্বার আল নাঈমের ‘মাস্টার’-এর ভিত্তি ইতিহাসে প্রোথিত হলেও এর রূপায়ণ নিঃসন্দেহে তার সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতার ফসল। উপন্যাসটির কেন্দ্রে থাকা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত মাস্টার এবং তার ছাত্রদের উত্তরণ তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে,—পাঠক সহজেই তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনার ভেতর দিয়ে যাত্রা করতে পারে। কাজটি জটিল হলেও জব্বার নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। তাই বারবার মনে হয়েছে—এটি কেবল ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তার অব্যাবহিত কিছুকাল পরের গল্প নয় কেবল; এটি ভাঙন, বেঁচে থাকা, প্রেম আর মানবিকতার এক জটিল অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ। ফলে এই উপন্যাস সরাসরি ইতিহাসের দলিল না হয়েও সময়ের নির্মম সত্যকে ধারণ করে। এখানে গুলির শব্দ যেমন আছে, তেমনই আছে মানুষের ভেতরের নীরব ভাঙচুর। তবে লেখক সবকিছু নিখুঁতভাবে ধরতে চাননি; বরং তিনি দেখিয়েছেন একটি ক্রান্তিকালের ভেতরে মানুষ কীভাবে বদলে যায়। কোথাও প্রতিরোধ, কোথাও পতন—এই দ্বৈততাই উপন্যাসটির শক্তি।
তাই বলা যায়, ‘মাস্টার’ কোনো সরল কাহিনী নয়; এটি সময়ের এক ভাঙা আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় আন্দোলন-সংগ্রাম, যুদ্ধ, মানুষ এবং ভালোবাসার জটিল সত্য। এই উপন্যাস পাঠককে শুধু গল্প শোনায় না বরং তাকে সেই সময়ের ভেতরে নিয়ে গিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাছাড়া, উপন্যাসটি সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস ও মানবিক বিপর্যয়ের এক অংশবিশেষকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পাঠকের কাছে যা একটি জীবন্ত ও মর্মস্পর্শী বাস্তবতাও উপস্থাপন করে।