Published : 23 Mar 2026, 09:49 AM
The Missing Thread– Daisy Dunn রচিত নতুন একটি বই যা নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরে; এখানে নারীরা নিজের যৌনতা সম্পর্কে কী ভাবে তা নিয়ে লেখক ডেইজি ডান আলোচনা করেছেন যা পুরুষদের বাধাধরা বিদ্বেষপূর্ণ ধারণার ঠিক বিপরীতে অবস্থান করে। বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত প্রবন্ধটি বাংলায় তর্জমা করেছেন নীলিমা রশিদ তৌহিদা। বি.স.
সেমোনিদেস অফ আমোর্গোস (Semonides of Amorgos) ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের গ্রিসের একজন পুরুষ কবি। তাঁর মতে, সমাজে প্রধানত ১০ ধরনের নারী আছে। কিছু নারী আছে যারা শূকরের মতো—কারণ তারা পরিষ্কার করার চেয়ে খেতে বেশি পছন্দ করে। কিছু নারী আছে যারা শেয়ালের মতো—কারণ তারা খুবই পর্যবেক্ষণশীল। কিছু নারী গাধার মতো—তাদের অবাধ যৌন আচরণ। কিছু নারী কুকুরের মতো—কারণ তারা অবাধ্য। আবার কিছু নারী আছে যারা ঝড়ো সমুদ্রের মতো, কেউ কেউ আছে লোভী পৃথিবীর মতো, কেউ আবার চোর বেজির মতো, অলস ঘোড়ার মতো, কুৎসিত বানরের মতো। আর আছে একমাত্র ভালো ধরনের নারী— যারা পরিশ্রমী মৌমাছির মতো। এই যে নারীর এই তালিকা—এখানে সেই সময়ের নারীবিদ্বেষ স্পষ্ট। তবে এর মধ্যে তথাকথিত যৌনভাবে অবাধ “গাধা-নারী”—এই বিশেষণটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি রহস্যময়।
প্রাচীন ঐতিহাসিক বর্ণনা সাধারণত নারীদের সীমাবদ্ধ ও একান্ত জীবনই প্রকাশ করে। গ্রিসে নারীরা জনসমক্ষে পর্দা করতেন। রোমে তাদের অভিভাবক থাকতেন, সাধারণত বাবা বা স্বামী, যারা তাদের চলাফেরা ও সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। তাহলে কি কামুক নারীর ধারণা শুধু পুরুষদের কল্পনা ছিল? নাকি প্রাচীন নারীরা আসলে যৌনতা নিয়ে আমাদের ধারণার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন?
আমার নতুন বই The Missing Thread–এর জন্য গবেষণা করতে গিয়ে আমি বুঝেছি, প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাস যদি নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে চাই, তবে নারীরা যৌনতা সম্পর্কে আসলে কী ভাবতেন তা জানতে আমাদের খুব খুঁটিয়ে দেখতে হবে। যে সব প্রাচীন সূত্র আজও টিকে আছে, তার বেশিরভাগই পুরুষদের লেখা এবং তারা নারীর যৌন আচরণ অনেক সময় বাড়িয়ে দেখাতেন। কেউ নারীর সতীত্ব অতিরিক্তভাবে তুলে ধরতেন, কেউ ইচ্ছে করে তাদের কামুক দেখাতেন। যদি এই বর্ণনাগুলো সরাসরি সত্য ধরে নেওয়া হয়, তাহলে মনে হবে নারীরা হয় পুরোপুরি সতী, নয়তো যৌনউন্মাদ। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, কিছু নারীর লেখা আমাদের তাদের মনের ভেতরে তাকানোর সুযোগ দেয় যেখান থেকে নারীদের যৌনতা সম্পর্কে আরেকটু গভীর ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মোহের স্বীকারোক্তি
উপরে উল্লেখিত কবির সময়কালেই আমরা স্যাফোর কথা পাই। তিনি খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে গ্রিসের লেসবস দ্বীপে গীতিকবিতা লিখতেন। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন যে একজন নারীকে একজন পুরুষের সঙ্গে বসে কথা বলতে দেখে তাঁর শরীরে তীব্র অনুভূতি জাগে—হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন, কথায় জড়তা, শিরায় আগুনের মতো অনুভূতি, সাময়িক অন্ধত্ব, কানে শব্দ শোনা, ঠান্ডা ঘাম, কাঁপুনি, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। কেউ কখনও প্রবল আকর্ষণ অনুভব করলে, তার কাছে এই অনুভূতিগুলো পরিচিত। অন্য একটি কবিতায় স্যাফো একটি নারীকে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। তিনি স্মৃতিচারণা করেন—কীভাবে নরম বিছানায় শুয়ে তিনি নিজের আকাঙ্খা পূরণ করতেন। এগুলো এমন এক নারীর স্বীকারোক্তি, যিনি জানতেন মোহ বা আকর্ষণকে দমন করা খুব কঠিন। আজ স্যাফোর অনেক কবিতাই খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই সেগুলো পুরোপুরি সঠিকভাবে পড়া কঠিন। তবে গবেষকেরা একটি প্যাপিরাসে “ডিলডো”র উল্লেখ পেয়েছেন। গ্রিক ভাষায় এগুলোকে বলা হতো olisboi। গ্রিসে এগুলো উর্বরতার আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার হতো, আবার সুখানুভবের জন্যও ব্যবহৃত হতো। অনেক ফুলদানির ছবিতেও এগুলোর চিত্র দেখা যায়। পরবর্তীতে রোমেও পুরুষাঙ্গ-আকৃতির বস্তু তাবিজের মতো মনে করা হতো। এগুলোকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হত। তাই নারীরা এমন প্রতীক থেকে দূরে থাকবেন—এটা ভাবার কোনো কারণ ছিল না।
প্রাচীন নারীরা কামমূলক দৃশ্যের সামনে লজ্জা পেতেন—এমন নয়। বরং কেউ কেউ সেগুলো সঙ্গে নিয়েই কবরে সমাধিস্থ হয়েছেন। রোম শক্তিশালী হওয়ার আগে ইতালির মূল ভূখণ্ডে দক্ষ Etruscans জাতি প্রভাবশালী ছিল। তারা নানা রোমান্টিক দৃশ্য দিয়ে সেই অঞ্চল ভরিয়ে তুলেছিল। অনেক শিল্পকর্ম ও সমাধির মূর্তিতে দেখা যায় যে পুরুষ ও নারী একসঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে এক Etruscans নারীর কবরের সঙ্গে একটি ধূপদানিও রাখা হয়েছিল। তাতে পুরুষ ও নারীর একে অপরের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করার দৃশ্য ছিল।
পতিতাবৃত্তিকে যেভাবে দেখা হতো
প্রাচীন কোনো পতিতালয়—যেমন Pompeii–এর একটি—দেখলেই বোঝা যায় যে তখন যৌনতা প্রায় প্রকাশ্যেই উপস্থিত ছিল। সেখানে ছোট, কুঠুরির মতো ঘরগুলোতে যৌনকর্মীরা কাজ করতেন। ঘরের দেয়ালগুলো গ্রাফিতিতে ভরা থাকত যার বেশিরভাগই পুরুষ গ্রাহকের লেখা। তারা অনেক সময় নির্দিষ্ট নারীদের যৌন দক্ষতা নিয়ে মন্তব্য করত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও বক্তৃতায় এমন কর্মীদের কঠিন জীবনের কথা অনেক পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এথেনীয় রাজনীতিবিদ Apollodorus–এর দেওয়া একটি অভিযোগমূলক বক্তৃতা, Against Neaera’তে এসব নারীর অনিশ্চিত জীবনের খুব স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে এই জগতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এমন কোনো নারীর কথা শুনি যা আমাদের অবাক করে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ইতালির দক্ষিণ প্রান্তে বসবাসকারী নারী কবি নোসিস একটি শিল্পকর্মের প্রশংসা করে কবিতা লিখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, এটি একজন যৌনকর্মীর অর্থে তৈরি হয়েছিল। নোসিস লিখেছিলেন, প্রেম ও যৌনতার দেবী আফ্রোদিতি–এর একটি সুন্দর মূর্তি মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছিল। সেই মূর্তি তৈরি করার টাকা দিয়েছিলেন পলিয়ারখিস নামে এক যৌনকর্মী।
পলিয়ারখিস কোনো ব্যতিক্রম ছিলেন না। এর আগেও এক হেটায়েরা (উচ্চ মর্যাদার যৌনকর্মী) ছিলেন, যার নাম ডরিখা(Doricha)—তিনি নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে জনসমক্ষে দেখানোর জন্য ষাঁড় রান্নার জন্য বড় বড় শিক কিনেছিলেন, যা ডেলফিতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল। এই নারীরা আসলে যৌনতাকে গ্রহণ করেননি, বরং যৌনতার মাধ্যমে মৃত্যুর পরও স্মরণীয় হওয়ার যে বিরল সুযোগটি তারা পেয়েছিলেন—সেটিকেই তারা গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তারা জানতেন, তাদের পরিচিত অধিকাংশ নারীই অজ্ঞাতই থেকে যাবেন।
পুরুষ লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি
পুরুষ লেখকরা পক্ষপাতী হলেও, নারীর যৌনতা ও জীবন সম্পর্কে আকর্ষণীয় ধারণা দেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪১১ সালে কৌতুকনাট্যকার এরিস্টোফেনিস একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন, যার নাম লিসিস্ত্রাতা । এই নাটকে এথেন্সের নারীরা যৌন ধর্মঘটের আয়োজন করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বামীদের শান্তিচুক্তিতে রাজি করানো, যাতে পেলোপনেসিয় যুদ্ধ শেষ হয়। এই যুদ্ধটি সত্যিই হয়েছিল যা প্রায় তিন দশক ধরে এথেন্স, স্পার্টা এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে চলেছিল। নাটকের অনেক নারী চরিত্র এই ধর্মঘট তেমন মানতে চাননি, কারণ এতে তাদের যৌনতার সুখানুভব ত্যাগ করতে হয়। হাস্যরসের জন্য তাদেরকে “গাধা-নারী”র মতো সেই ধরাবাধা বিবরণে দেখানো হয়েছে। তবে নাটকের এক জায়গায় গল্পটি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে। তখন এরিস্টোফেনিস নারীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেন।
নাটকের প্রধান চরিত্র লিসিস্ত্রাতা, যিনি এই যৌন ধর্মঘটের আয়োজন করেন, যুদ্ধের সময় নারীদের জীবন কেমন হয় তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, নারীরা যে শুধু অ্যাসেম্বলিতে (যেখানে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়) অংশ নিতে পারেন না তা নয়, এর পাশাপাশি যুদ্ধে তারা বারবার নিজেদের প্রিয়জন হারান। দীর্ঘ এই যুদ্ধ বিবাহিত নারীদের জন্য খুব কষ্টকর। অবিবাহিত নারীদের জন্য তা আরও খারাপ। কারণ তারা আর বিয়ের সুযোগই পায়না। লিসিস্ত্রাতা বলেন, পুরুষরা যুদ্ধ থেকে পাকা চুল নিয়ে ফিরেও বিয়ে করতে পারে। কিন্তু কুমারী নারীদের ক্ষেত্রে তা হয় না। অনেককেই তখন বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের জন্য খুব বেশি বয়সী বলে মনে করা হয়। এই কথাগুলো যেকোনো যুদ্ধে পুরুষ ও নারীর অভিজ্ঞতার পার্থক্য এতটাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে এটা বিশ্বাস করতেই হয় যে তারা আসলেই সেই সময়ের নারীদের প্রতিফলন।
যৌনতা নিয়ে নারীদের বাস্তব ভয় আমরা গ্রিক ট্র্যাজেডিতেও দেখতে পাই। নাট্যকার সফোক্লিস, যিনি ঔদিপাস রেক্স–এর জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত, তার হারিয়ে যাওয়া নাটক তেরেউস (Tereus)–এর একটি নারী চরিত্র একজন কুমারী থেকে স্ত্রী হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। সেখানে পৌরাণিক রানি প্রোক্নি (Procne) বলেন, “একটি রাত আমাদের বেঁধে দেওয়া হয়, যেখানে আমাদের নিজেদের ভালো ও সুন্দর রূপে তুলে ধরতে হয়।” উচ্চবিত্ত সমাজে তখন বিয়েগুলো সাধারণত ঠিক করে দেওয়া হতো। তাই অনেক নারীর জন্য প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা সত্যিই প্রোক্নি-এর বিবরণের মতো বিভ্রান্তিকর হত।
প্রাচীন যৌন পরামর্শ
নারীরা মাঝে মাঝে তাদের চিন্তা প্যাপিরাসে লিখে রেখেছেন। থিয়ানো—যিনি পিথাগোরাসের সমসাময়িক ছিলেন (কেউ কেউ বলেন, তিনি পিথাগোরাসের স্ত্রী)—তার একটি চিঠিতে বন্ধু ইউরিডাইসকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, একজন নারী যখন স্বামীর বিছানায় যাবে, পোশাকের সাথে সাথে তার লজ্জাও ত্যাগ করা উচিত। বিছানা ছেড়ে উঠে গেলে সে পোশাক ও লজ্জা এ দুইই আবার ফিরে পাবে। যদিও চিঠিটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তবুও তার ভাবনা অনেকটাই আধুনিক নারীর ভাবনার মতোই। এ থেকে মনে হয়, প্রাচীন নারীরাও এ ধরনের পরামর্শ অনুসরণ করতেন।
এলেফান্টিস (Elephantis) নামক একজন গ্রিক কবি নারীদের যৌন পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটা নিজস্ব ছোট বই লিখেছিলেন। দুঃখজনকভাবে তার লেখা আজ আর পাওয়া যায় না, তবে রোমান কবি Martial ও রোমান জীবনীকার ও নথি-সংরক্ষক Suetonius–এর উল্লেখে জানা যায়, সম্রাট Tiberius(কামুক প্রবৃত্তির জন্য কুখ্যাত ছিলেন) সেই গ্রিক নারী কবির বই সংগ্রহ করেছিলেন।
যখন অন্য নারীর কথা পুরুষদের লেখায় উদ্ধৃত হয়, তারা সাধারণত যৌনতার বদলে প্রেমের ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করেন। যা তাদেরকে Martial ও Catullus সহ অন্যান্য পুরুষ সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে। ক্যাটুল্লাসের প্রেমিকা লেসবিয়া বলেন, ‘’কোনো মুহূর্তে একজন নারী তার প্রিয়তমকে যদি কিছু বলে, তা বাতাস ও বহমান পানিতে লেখা উচিত।‘’ একদম Pillow-talk এর মতো।
রোমান কবি সুলপিসিয়া (Sulpicia), যাঁর কবিতা এখনো টিকে আছে, জন্মদিনে সে প্রিয়তম সেরিন্থাস থেকে দূরে গ্রামে থাকায় নিজের দুঃখ বর্ণনা করেন—অন্তত রোমে আছে ভেবে সে স্বস্তি অনুভব করেন।
যৌনতা নিয়ে নিজেদের ভাবনা বলতে গিয়ে এইসকল নারীদের নিজেদের প্রিয়তমের সাথে যৌনতার কথা সরাসরি অভদ্র বিবরণে বলার প্রয়োজন কখনো ছিল না। বিভিন্ন উৎসের অধিকাংশ পুরুষদের দখলে থাকলেও নারীরা—যেমন আফ্রোদিতি জানতেন যে পর্দা নামার পরও সমান আগ্রহী হয়ে ওঠা যায়।