Published : 09 Mar 2021, 10:52 AM

আলোচনাটা শুরু করবো তুলনার জন্য শহীদুল জহিরের `সে রাতে পূর্ণিমা ছিলো` উপন্যাসের উদাহরণ টেনে। স্বাধীনতা উত্তর কালের যে কয়েকজন উপন্যাসিক পাঠক সমাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছেন তার মধ্যে শহীদুল জহির একজন। `সে রাতে পূর্ণিমা ছিলো` প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯৫ সালে। প্রকাশের আগেই তিনি `জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা` উপন্যাসের মাধ্যমে সে সময়ে অনেকের মনোযোগ কেড়েছিলেন। তাই `সে রাতে পূর্ণিমা ছিলো` প্রকাশের সময়ে তিনি আনকোরা অপরিচিত কোন লেখক ছিলেন না। সাথে সাথেই লেখাটা সাড়া ফেলেছিলো। আমরা যারা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম ও শিল্প সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দিতাম, তাদের কথাবার্তাতে তিনি প্রায়ই উল্লেখিত হতেন। আজ ফিরে দেখা ও লেখাটা পুনরায় পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এই উপন্যাসটা আমার পড়া সেরা উপন্যাসের একটা। বিশ্ব পর্যায়ের সেরা কাজগুলোর সমতুল্য। বর্তমানে যে সব বেষ্ট সেলার উপন্যাস বিশ্ব বাজারে বিক্রি হয় তার কিছু আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। শহীদুল জহিরের উপন্যাসটা তাদের সহজেই অতিক্রম করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো যে শহীদুল জহির সাড়া ফেললেও যাকে বলা যায় ব্যাপক সাড়া তা ফেলতে পারেন নি। সেরা লেখক হিসাবে তার প্রতিষ্ঠা পেতে আরো প্রায় দশ-পনের বছর লেগে যায়। শহীদুল জহিরের সাথে প্রায়ই একই সময়ে বই প্রকাশ করেছিলেন এমন একজনের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন রকম। তিনি প্রকাশ করেছিলেন ইংরেজিতে। নাম অরুন্ধতী রায়। উপন্যাসের নাম `গড অফ স্মল থিংগস`। প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯৬ সালে। প্রকাশের পরে তিনি বুকার পুরষ্কার পান। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। সাড়া ফেলে বাংলাদেশেও, যাকে বলা যায় ব্যাপক সাড়া। সে সময়ে পত্র পত্রিকাতে বইটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এমনকি মনে আছে টিভিতে সাহিত্য অনুষ্ঠানে বইটা নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। নীলক্ষেতের বই বাজারে পাইরেটেড কপি বিক্রি হওয়া শুরু হয়। বছর খানেক পরে বের হয় বাংলাতে অনুবাদ। তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একজন সেলেব্রিটিতে পরিণত হন।
আমি এই দুই সেরা কাজের পাশাপাশি তুলনা করে দেখালাম বোঝাতে যে, বাংলা সাহিত্যের সেরা কাজ ও বিশ্ব সাহিত্যের সেরা কাজ নিয়ে যে বাংলাদেশের ভিতরে যে প্রতিক্রিয়া ঘটে তার অনেক পার্থক্য আছে, যদিও মানের দিক থেকে তাদের খুব বেশি ব্যবধান হয়তো নেই। বরং শহীদুল জহিরেরটাই হয়তো বাংলাদেশের জন্য বেশি প্রযোজ্য ছিলো। তাতে ছিলো মুক্তিযুদ্ধ, খুব কৌশলে শিল্পিতভাবে মিল ঘটানো হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সাথে। তবু বাংলা সাহিত্যের সেরা কাজকে বিশ্ব সাহিত্যের এক সেরা কাজ, সহজেই দেশের ভিতরে প্রতিক্রিয়াতে হারিয়ে দিতে পেরেছিলো।
এই রকম প্রসঙ্গে যখন কারো সাথে কথা বলি তখন কিছু কিছু অদ্ভুত যুক্তির মুখোমুখি হই। যেমন কেউ হয়তো বলছেন যে বুকার পুরস্কারের মাধ্যমে অরুন্ধতী রায়ের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ঘটেছিলো। সে রকম প্রচার প্রচারণা চালানোর প্রতিষ্ঠান তো বাংলাদেশে নেই। এই পর্যবেক্ষণটা সত্যি হতে পারে কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অভাব অরুন্ধতী রায়ের কাজের প্রচার বাংলাদেশের ভিতরে হবার ক্ষেত্রে বাধা হয় নি। বাংলাদেশের লেখক সমাজ ও তৎকালীন মিডিয়া নিজেরাই বইটার প্রচারে নেমেছিলো। প্রতিষ্ঠানের অভাব শুধু বাধা হয়েছিলো শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে। অরুন্ধতী রায়ের ক্ষেত্রে বিশ্ব মিডিয়ার প্রচারের প্রতিক্রিয়াতে ঘটেছিলো বাংলাদেশের মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া, তার ধারাবাহিকতাতে লেখক সমাজ। সেই প্রতিক্রিয়া শহীদুল জহিরকে নিজস্ব ভাষাতে পড়ার প্রতিক্রিয়ার চেয়ে শক্তিশালী হয়েছিলো। যারা শহীদুল জহিরকে সে সময়ে পড়েছিলেন তারা বুঝে উঠেন নি যে অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে যে রকম উচ্ছ্বাস, বাংলাদেশকে নিয়ে লিখিত হবার কারণে শহীদুল জহিরকে নিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে উচ্ছ্বাস তার চেয়ে বেশি প্রাপ্য ছিলো।
আরেকটা অদ্ভুত কথা প্রচলিত আছে। তা হলো শিল্প সাহিত্যের কাজ ভালো না মন্দ তা মহাকালই মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে জগতে মহাকালের ধারণাটা জনপ্রিয় কিন্তু ভুল একটা ধারণা। কবিতার ক্ষেত্রে মহাকালের ধারণাটা কিছুটা তবুও চলে। কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশ্ব সাহিত্যের বড় কাজগুলো প্রকাশের প্রথম বছরই সাড়া ফেলে, এমনটাই দেখা যায়। কোনটা ভালো তা বোঝার জন্য মহাকালের অপেক্ষাতে বসে থাকা হয় না। এর মধ্যে হয়তো কয়েকটা সমকালে গুরুত্ব পাওয়ার পাশাপাশি কালোত্তীর্ণ হতে পারে। সমকালে গুরুত্ব পায়নি কিন্তু কালোত্তীর্ণ হয়েছে এমনটাই মনে হয় কম। এক্ষেত্রেও তাই মূলে আছে দ্বিচারিতা। যারা মহাকালের কথা বলেন তাদের কিন্তু সমকালে অরুন্ধতী রায়কে গ্রহণে আপত্তি হয়নি।
আমি এমনও শুনেছি যে শিল্পীর সব কাজ বিবেচনা করেই তাকে মূল্যায়ন করতে হবে। এরকমটাও অরুন্ধতী রায়ের ক্ষেত্রে হয়নি। প্রথম কাজ প্রকাশের পরেই তাকে সাহিত্য বোদ্ধা সমাজের গ্রহণ করেছেন। তাই এক্ষেত্রেও দেখা গেছে দ্বিচারিতা। আর এই কথাটাও অদ্ভুত কারণ লেখা এখনো হয়নি, তেমন অজানা ভবিষ্যতের অপেক্ষাতে মূল্যায়ন ফেলে রাখার কোন যুক্তি নেই। অরুন্ধতী রায় তার প্রথম উপন্যাসের পরেরটা লিখেছেন প্রায় বিশ বছর পরে। খুব কম লোকই অন্যের সব লেখা পড়ে। ভেবে দেখুন আমি আপনি জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথের সব লেখা পড়েছি কিনা?
এই কথাগুলো আগেও অনেকে বলেছেন। `গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না` বলে তো একটা কথা প্রচলিত আছেই। কিন্তু আমার মনে হয় সমস্যাটা আরো গভীর। সমস্যা হলো সমস্যাটা আছে জেনেও সে অনুযায়ী যা করণীয় তা না করা। তাই সমালোচনা সমালোচনাতেই থেকে যায়। উত্তরণ হয় না।
খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে শিল্প সাহিত্যকে বাংলাদেশের মানুষ যে ভাবে ভোগ করে তার সাথে উপনিবেশিক আমলের সম্পর্ক আছে। উপনিবেশিক সময়ে বাংলাদেশ অন্য রাষ্ট্রের অধীনস্থ ছিলো। তার সাথে যুক্ত হয়েছিলো সাংস্কৃতিক আধিপত্য। এখনও তার ধারাবাহিকতাতে ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, স্পেনীয় ইত্যাদি ইউরোপীয় সাহিত্যকে অগ্রগণ্য মনে করা হয়, যা উপনিবেশিক আমলের প্রভাব তাতে সংশয় করার সুযোগ নেই। এতো সবাই জানেনই। কিন্তু জানা আর করনীয়তে পার্থক্য আছে, যার প্রতি আমি নজর দিতে বলবো।
এই প্রসঙ্গে আমি একটা সাম্প্রতিক ভিডিও আলোচনার উদাহরণ দেবো। আলোচনাটা করেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক ডঃ মাসুদুজ্জামান। বিষয় রবীন্দ্রনাথের মেঘ ও রৌদ্র গল্পে উপনিবেশিকতার অনুসন্ধান। মাসুদুজ্জামানের আলোচনার প্রসঙ্গ কি তা আলোচনার আগে রবীন্দ্রনাথের গল্পটার একটা সার সংক্ষেপ দেয়া যাক। গল্পের মূল চরিত্র শশিভূষণ। আইন পড়া শেষ করে গ্রামে থাকেন। সেখানে গিরিবালা নামের এক বালিকা সাথে তার কিভাবে সম্পর্ক তৈরি হয় তা গল্পের একটা বিষয়। কিন্তু আরেক মূল কাহিনি শশিভূষণের ইংরেজদের সাথে নানা সমস্যা, মামলা মোকদ্দমাতে জড়িয়ে যাওয়া। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এগুলোর কারণ, শশিভূষণ যে গ্রামে থাকেন, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার চেষ্টা। এই করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়। এই হলো মোটামুটি গল্পটা।
মাসুদুজ্জামান উপনিবেশিক আমলে ইংরেজরা কিভাবে শাসন ও শোষণ করেছে তার উদাহরণ হিসাবে গল্পটার আলোচনা করেছেন। তিনি বলছেন যে রবীন্দ্রনাথ গল্পের মধ্যে উপনিবেশিকবাদীদের মন মানসিকতা ও আচরণ সুনিপুনভাবে তুলে ধরেছেন যার অনেক পরে এডওয়ার্ড সাইদের মতো ব্যক্তিরা আলোচনা করেছেন। তার ব্যাখ্যা চমৎকার ও অভিনন্দন যোগ্য।
কিন্তু তার আলোচনাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আসেনি। আসলে শুধু তার আলোচনাতে নয়, উপনিবেশিক শাসন ও আজকাল তার সাথে সম্পর্কিত ওরিয়েন্টালিজম যাকে বাংলাতে প্রাচ্যবাদ বলা হয় তাতে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টার প্রতি আলোকপাত দেখি না। তা হলো বর্তমানে যেহেতু সেই উপনিবেশিক শাসন নেই, সেখানে প্রাচ্যের কী করণীয়। এ লেখার সূত্র ধরে আমি করনীয় কী বলতে শুধু শিল্প সাহিত্যের দিকেই নজর সীমিত রাখছি। যদিও আলোচনার অনেকটাই অন্যান্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি আশ্রিত দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে।
এবার গল্পতে আবার ফিরে আসা যাক। গল্পে গ্রামবাসীর আচরণের দিকে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভালোই আলোকপাত করেছেন। শশিভূষণ যে ইংরেজদের সাথে মামলা মোকদ্দমাতে পেরে ওঠে না তার একটা কারণ গ্রামবাসী। কারণ শশিভূষণ তাদের জন্য ইংরেজদের সাথে মামলা-দ্বন্দ্বে জড়ালেও যখন সাক্ষী দেবার দরকার পড়ে তখন কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। ফলে শশিভূষণ মামলাতে বার বার হেরে যান। গ্রামবাসীরা কেন এই আচরণ করেন? উপনিবেশিক আমলের নানা নির্যাতনের ভয় ভীতি হয়তো তা সহজেই ব্যাখ্যা করতে পারবে। তাই গ্রামবাসীদের প্রসঙ্গ তোলা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে ও একারণেই হয়তো মাসুদুজ্জামানের আলোচনাতে গ্রামবাসীদের ভূমিকার কথা আসেনি। কিন্তু যদি আমাদের মনোজগতে এখনো উপনিবেশিক আমলের প্রভাব রয়ে গেছে বলি, তাহলে বর্তমানে যেমন শশিভূষণ, ইংরেজ আছেন তেমনি রয়ে গেছেন গ্রামবাসীরাও। নিপীড়ন নির্যাতনের ভয় হয়তো নেই কিন্তু মনোজগতের উপনিবেশিকতা থেকে কি তারা মুক্ত হতে পেরেছেন? আমি শিল্প সাহিত্যের বরাত দিয়ে দেখাবো যা তা ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথের গল্পে যেমন গ্রামবাসীদের মামলাতে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না, তেমনি শিল্প সাহিত্যের জগতের যারা সাধারণ অধিবাসী, তাদেরকেও দেখা যায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনে অংশ না নিতে।
সাধারণ অধিবাসী কারা? সবাই। শশিভূষণ নিজেও একজন গ্রামবাসী ও সেই অর্থে একজন সাধারণ অধিবাসী। কিন্তু শশিভূষণ নিজেকে আলাদা করছে উপনিবেশিক দমনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে। না নিলে তার অবস্থানও সবার সঙ্গে একীভূত হয়ে থাকতো। এই যুক্তিতে বর্তমানের শিল্প-সাহিত্যের সাথে যারা জড়িত তারা সবাই গ্রামবাসীর ভূমিকাতে। এর মধ্যে হয়তো কেউ কেউ শশিভূষনের মতো ভূমিকা পালনে নিজেকে উত্তরিত করতে পারছেন, যেমন ডঃ মাসুদুজ্জামান নিজেই। তবে বেশীর ভাগই নয়।

ইংরেজদের শাসন এখন নেই কিন্তু যেটা আগে বলেছি, তা হলো মনোজগতের যে উপনিবেশতা থেকে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সম্পর্কিত চিন্তাগুলো বের হতে পারেনি। শিল্প-সাহিত্য বা চিন্তার ক্ষেত্রেও যা হচ্ছে তা হলো, পশ্চিমা অঙ্গনে যে শিল্প-সাহিত্য চর্চা বা সম্পর্কিত চিন্তার বিকাশ ঘটছে তাকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছি কোন বিবেচনা ছাড়াই। মেঘ ও রৌদ্র গল্পে একটা ঘটনা আছে যে দেশি পাল তোলা নৌকা ইংরেজদের ইঞ্জিনের নৌকাকে এক ধরণের প্রতিযোগিতাতে হারিয়ে দেয়। তখন গুলি করে সেই নৌকার পাল ফুটিয়ে দেয় এক ইংরেজ। এরকম ঘটনা আর ঘটছে না এখন যেহেতু সেই শাসনের অবসান হয়েছে। তাই এখন যদি দেশি পালের নৌকা পিছিয়ে থাকে তবে তার কারণ একটা হবে দেশি নৌকার সেই সক্ষমতা নেই।
কিন্তু সক্ষমতা থাকবেই। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন যে ইঞ্জিন চালিত নৌকার গতি বেশি থাকলেও দেশিও পাল তোলা নৌকার মাঝিরা তাদের নদী সম্পর্কিত স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। কারণ নদীর সেই বিশেষ বাকে তার যে জ্ঞান আছে তা ইঞ্জিন চালিত নৌকার মাঝিদের নেই। সে রকম ভাবে পশ্চিমা সাহিত্য যেমন ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান ও স্পেনীয় সাহিত্য যতই সমৃদ্ধ হোক, বাংলাদেশের নিজস্ব পটভূমিকে কাজে লাগাতে পারবে বাংলা ভাষার নিজস্ব শিল্প সাহিত্যই। এমনকি আরো বেশি উৎকর্ষও সম্ভব। যেমন, যদি দেশীয় নৌকা একটা ইঞ্জিন লাগিয়ে নিতে পারে, তবে নদী সম্পর্কে স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তার পক্ষে আরো বেশী গতিশীল হওয়া সম্ভব। যেমনটা আমি মনে করি ঘটেছে শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে। তিনি ইঞ্জিন ধার করেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার যাদুবাস্তবতা থেকে, কিন্তু এমন একটা উপাখ্যান রচনা করেছিলেন যা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব ছিলো।
তাই বাংলা ভাষাতে যে বিশ্ব সাহিত্যের সমতুল্য বা অধিকতর উন্নত কাজ হচ্ছে না এমনটা আমি মনে করি না। পরিসংখ্যান শাস্ত্রের বরাত দিয়ে বলতে পারি যে এরকম সম্ভাবনা থাকবেই ও সে অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কাজের সৃষ্টি হচ্ছে বলে আস্থাশীল। কিন্তু শহীদুল জহিরকে চিহ্নিত করা গেছে, বাকিদের কেন করা যাচ্ছে না? এখানেই করনীয়ের বিষয়টা আবার উল্লেখ করছি। শহীদুল জহির যে আমাদের কাছে পরিচিত হতে পেরেছেন তার ক্ষেত্রে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছেন কবি মোহাম্মদ সাদিক। তার একটা ইউটিউব ভিডিওর বরাতে জানতে পেরেছি যে ঘটনাক্রমে শহিদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস `জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা` তার হাতে পৌছায়। প্রকাশনার মানের দিক থেকে অন্তত নিম্নমানের প্রকাশনা ছিলো সেটা। কিন্তু তিনি উপন্যাসটা পাঠে মুগ্ধ হয়ে তা একটা ভালো প্রকাশনী থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন, সেই সাথে প্রচারেরও। সে থেকেই লেখক হিসাবে শহীদুল জহিরের পরিচিতি শুরু হয়। কিন্তু লেখাটা যদি ঘটনাক্রমে মোহাম্মদ সাদিকের হাতে না পড়তো তাহলে শহীদুল জহিরের পরিচিতি বাড়ার ক্ষেত্রে হয়তো আরো সময় লেগে যেত। এমন কি তিনি হয়তো এখনো অপরিচিত থেকে যেতেন।
মোহাম্মদ সাদিক নিজের গুণে একটা ভালো লেখাকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি সেদিক থেকে তিনি নিজেকে শশিভূষনের পর্যায়ে উত্তরিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাকি যারা ছিলেন তারা হয়তো পড়েছিলেন সেই গ্রামবাসীদের পর্যায়ে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে, একটা নতুন লেখার ভালো মন্দ সবাই বিবেচনা করতে পারবেন না। সবাই হয়তো পড়ে দেখবেনও না। তবে ব্যাপারটা অনেকখানি জানাজা ও জিহাদের মতো। সমাজের পর্যাপ্ত সংখ্যক করলেই সবাই করেছেন ধরে নেয়া যায়। শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে তা লেখক সমাজের সম্পৃক্ততা অবশ্যই যথেষ্ট ছিলো না। কারণ তা অরুন্ধতী রায়ের সমপর্যায়ের ছিলো না। তাই লেখক বা বিদ্বান সমাজ এক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের পর্যায়ের থেকে গেছেন।
কিন্তু আজকে প্রায় পঁচিশ বছর পার হয়ে পরিস্থিতির কতটুকু পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যাপারটা ভালো করে দেখার জন্য আমি তিনটি অনলাইন প্লাটফর্মে, যেখানে আমার কিছু লেখা প্রকাশ হয়েছে খতিয়ে দেখেছি। প্লাটফর্ম গুলো হলো বিডিনিউজ২৪, সৃজন ও তীরন্দাজ। সমকালকে (১৯৯০ পরবর্তী) নিয়ে লেখা সেখানে থাকলেও এগিয়ে আছে সংখ্যার দিক থেকে পূর্বতনরা (রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ হক, অন্যান্য) এগিয়ে আছে। যে প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেখানেও বিষয়গত ভাবে বিশ্ব সাহিত্যই বেশি আলোচিত হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু লেখাগুলোর বিষয়গত বৈচিত্র্যের কারণে সে তালিকা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। একটি আপাতত গণনার ভিত্তিতে বলতে পারি যে সমকালের সাহিত্যের চেয়ে পূর্ববর্তীদের নিয়ে আলোচনা আছে প্রায় তিন গুনের মতো। বিশ্ব সাহিত্যও সে রকম। তবে লক্ষণীয় যে বেশ কিছু লেখা আছে যেখানে বিশ্ব সাহিত্য ও চিন্তা প্রকাশ পেলেও তা সমকালকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে। যেমন করোনা নিয়ে কিছু লেখা আছে যে বিশ্ব সাহিত্য ও দর্শন থেকে প্রচুর সাহায্য নিলেও সমকালই মূল উপজীব্য, লেখাগুলো সাহিত্যের না হলেও।
তাই মিডিয়াতে বর্তমান প্রকাশনার দিক থেকে বিষয়টা এতো হতাশার না, যদিও অনেক দূর যেতে হবে। আরো দেখার দরকার আছে, আগের চেয়ে সমকালকে নিয়ে লেখার সংখ্যা বেড়েছে কিনা। এ বিষয়টার সংখ্যাগত বিচারের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হতে পারে। যারা বিধিবদ্ধ ভাবে করার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। তবু বলতেই হবে যে সমকালকে নিয়ে আমি বেশ কিছু লেখা দেখছি, যদিও বিশ্ব সাহিত্য ও অতীত এখনও সাহিত্য আলোচনাতে প্রাধান্য বজায় রেখেছে। মানে যে উপনিবেশিকতার কথা বলছি তা থেকে বের হবার একটা প্রবণতা লক্ষণীয় এই কার্যক্রমে।
কিন্তু সমকালকে নিয়ে এই লেখাগুলো কতটুকু ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারছে তাও বিবেচনার বিষয়। দুঃখজনক ভাবে সেই ইমপ্যাক্ট নেই বলেই মনে হয়। ইমপ্যাক্ট বলতে কি বুঝাই আগে ব্যাখ্যা করি। ইমপ্যাক্ট বলতে বুঝচ্ছি যে বইটা ব্যাপক বিক্রি হবে, লেখককে সমাজে ও রাষ্ট্রে বড় লেখক হিসাবে তাকে প্রকাশ্য আলোচনাতে আনা হবে। যেমন তিনি একুশে বই মেলাতে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে একক আলোচনা করবেন। এই মর্যাদা দেবার সময়ে তার বয়স বিবেচনাতে নেয়া হবে না। এই ইমপ্যাক্টের সাথে তুলনীয় সেরকম প্রতিক্রিয়া, যা আমরা বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে দেখিয়ে থাকি।
কেন তা হচ্ছে না তার ব্যাখ্যাতে কেউ কেউ সাহিত্য জগতের দলাদলির কথা বলেন। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেঘ ও রৌদ্র গল্পের প্রসঙ্গ আবার আসছি। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন যে গ্রামবাসী ব্যস্ত থাকতো দলাদলি, চক্রান্ত আর মিথ্যা মোকদ্দমায়। মামলা দলাদলিতে দক্ষ সেই গ্রামবাসীই আবার শশিভূষণের মামলাতে সাক্ষী দিতে অনিচ্ছুক ছিলো।
কিন্তু সাহিত্য জগতে দলাদলির ব্যাপারটা সঙ্গে মেঘ ও রৌদ্রের গ্রামবাসীর এক বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। গ্রামবাসীর দলাদলিতে অপরের ক্ষতিসাধনের যে আকাঙ্ক্ষা তা এখনকার সাহিত্য জগতে নেই। এই দলাদলি মূলত বন্ধুত্বের দলাদলি। আমার নিজের দেখাতে ১৫-২০ বিশ বছর আগে লক্ষ করেছি যে লেখকরা পত্রিকা, লিটল ম্যাগ ইত্যাদি দলে বিভক্ত হয়ে থাকতো। এক লিটল ম্যাগে লেখা প্রকাশ করলে অন্য লিটল ম্যাগের লোকেরা দূরে থাকতো। এখনকার সময়েও তা আছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফেসবুক গ্রুপগুলো। বন্ধুদের মধ্যে সবাই তো ভালো উন্নত লেখক হবেন না। পরিসংখ্যান গত ভাবে তা হতে পারে না। দশ জনের একটা দলে হয়তো এক দুই জন ভালো লেখক। এরকম দশটা গ্রুপ মিলে এক-দুইজন গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাকি ভালো বা গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের অনুসন্ধানের জন্য দলের বাইরে যেতেই হবে। কিন্তু এই অনুসন্ধান বন্ধুত্বের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য হয়তো নিজের দলের বাইরে অনুসন্ধানের প্রবণতা দেখা যায় না। হলেও দেখা যায় যে ভালো লেখকের সাথে ভালো নন এমন মিশেল, মানে মাঝে নিজের দলের দুই একজনকে আলোচনাতে টেনে আনা। এই পর্যবেক্ষণটা আমি পেয়েছি বর্তমানের গুরুত্বপূর্ণ একজন কথা সাহিত্যিক থেকে, যিনি বলেছিলেন যে এখনকার এক প্রথম সারির পত্রিকা এরকম ভালোর সাথে ভালো নন এমন মিশেল দিতে খুব দক্ষ।
সাহিত্যের মূল্যায়নের আলোচনাটা তাই বিক্ষিপ্ত এবং অনির্ভরযোগ্য। লিটল ম্যাগ ও পত্রিকাগুলোতে নতুন গ্রন্থের আলোচনা বের হয়। যা আমার নিজের বইয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। কিন্তু এরকম একটা দুইটা আলোচনা একটা সময়ে কোন গ্রন্থ পাঠ অনিবার্য করে তোলে না। তুলনাতে দেখুন যে কিছুদিন আগে কবি ও শিক্ষক হিমেল বরকতের মৃত্যুতে পত্রিকা ও সোশাল মিডিয়া কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলো। এমন প্রতিক্রিয়ার কারণে, যারা তার নাম ও কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহের সাথে তার সম্পর্ক কথা জানতেন না, তারাও তার প্রতি মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরকম প্রতিক্রিয়া কোন কারণে লেখকের জীবিত থাকাকালীন সময়ে ঘটে না। তাই কোন লেখা যদি সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ন হয়ে থাকে কোন পাঠকের কাছে, থাকে তবে এমনভাবেই তাকে প্রচার করার চেষ্টা করা উচিত, যাতে তা পাঠ করা সাহিত্য অনুরাগীদের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সাহিত্যের মূল্যায়নগুলো অকার্যকর হবার কারণে আমি মনে করি যারা কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অথবা বয়োজ্যেষ্ঠ, তাদেরকে এই আলোচনাগুলোতে এগিয়ে আসতে হবে। যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তারা যদি আলোচনা দলাদলি মুক্ত হয়ে অন্যদের লেখা নিয়ে আলোচনা করেন তবে তার ইমপ্যাক্ট অনেক বেশি হবে। যেমন উদাহরণ স্বরূপ, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক কারণ তার প্রচুর অনুসারী আছেন। কিন্তু এই আলোচনাতে এই সব ব্যক্তিবর্গকে অনেক নিরপেক্ষ হতে হবে, না হলে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন পরিহার করতে হবে ভালোর সাথে ভালো নন এমন মিশেল।
এখানে লক্ষ করার বিষয় যে বর্তমান প্রজন্ম গদ্য লেখাতে অনেক বেশি সিদ্ধহস্ত। আগে যেখানে ছিলো কবিতার জয়জয়কার সেখানে এখন অনেক বেশি পাঠক টানে উপন্যাস। প্রচুর লোকে এখন নানা বিষয়ে প্রবন্ধও লিখছেন। তাই আগে যদি এরকম প্রবন্ধ না থাকে, তার জন্য সেই সময়ের সাহিত্যের প্রধান ধারাই দায়ী। যদিও সম্প্রতি কবিদের মধ্যেও ফেসবুকে গদ্য লেখার প্রবণতা বাড়ছে। তাই আগে যারা অন্যের লেখা অভ্যাসবশতই আলোচনা করতেন না, তারা হয়তো এখন এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে এগিয়ে আসবেন।
কাজেই সাহিত্য আলোচনাতে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রবণতা আছে তবু তাতে বাকি আছে আরো অনেক অর্জন। এখানে দেখুন যে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগের গুরুত্বের প্রয়োজনের উল্লেখ করছি। এখানে কেউ কেউ বলতে পারবেন যে এই বিষয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রয়োজন আছে, কারণ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলোই তা করে থাকে। এই কথাগুলো অসত্য হয়তো নয়, কিন্তু এমন প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনে কত বছর লেগে যাবে তা অনুমান করুন। আমি মনে করি যে তা হবে সুদীর্ঘ। তাই তার আগেই ব্যক্তির এখানে ভূমিকা পালনের সুযোগ আছে, যেমনটা দেখা যায় ফেসবুকের পোস্টের ক্ষেত্রে যার একটা উদাহরণ আমি আগেই দিয়েছি। ব্যক্তির উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনও ঘটবে সময়ের ধারাবাহিকতাতে।
মনোজগতে উপনিবেশিকতা দূর করা জন্য অবশ্যই উপনিবেশবাদিদের সমালোচনা করা দরকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এখন আর উপনিবেশ নেই। তাই আগে কিভাবে নিপীড়ন নির্যাতন হয়েছিলো তার ব্যাখ্যা সমালোচনা করলে বর্তমান সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু সম্প্রতি সমালোচনা সাহিত্যের একটা ধারা দেখা যায় সেখানে সমালোচনার প্রাধান্যটাই বেশি বলে মনে হয়। এই সমালোচনার ধারা পশ্চিমাদের পাশাপাশি কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের নানা প্রভাবের সমালোচনা করে থাকে। এই সমালোচনার ধারা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে ধারাটা সমকালের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার দিকে মনোযোগী নয়। ফাকে ফাকে দুই একজন হয়তো করছেন, কিন্তু আমি আগেই বলেছি যে এক দুইটা বিচ্ছিন্ন আলোচনাতে কারো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসাবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় এখানে এখানে উল্লেখ করা দরকার। পশ্চিমা উপনিবেশিকতার সমালোচনা হলেও যে পদ্ধতিতে করা হয় তা ধার করা হয়েছে পশ্চিম থেকেই। যেমন প্রাচ্যবাদ শব্দটি এসেছে ওরিয়েন্টালিজম, উত্তর আধুনিকতাবাদ এসেছে পোস্ট মডার্নিজম থেকে, এগুলো কোনটাই দেশীয় নয়। মার্ক্স, গ্রামসি দেশিয় নন, নয় বহুল ব্যবহৃত সাব আলটার্ন শব্দটা। এডওয়ার্ড সাইদ তার ওরিয়েন্টালিজম বইটা লিখেছিলেন ইংরেজিতেই। এমন কি গায়ত্রী স্পিভাক ও হালের দীপেশ চক্রবর্তীর খ্যাতির সূচনাও সেভাবেই। এরা সবাই পশ্চিমা জ্ঞান কাণ্ডের ভিতরেই অবস্থান করেন ও উপনিবেশিকতার প্রভাব মুক্ত নন। দেশীয় দর্শন, সাহিত্য ও সমাজ চিন্তা চর্চা বাদ দিয়ে আমরা যদি শুধু তাদের নিয়ে আলোচনা করি তা মনোজগতে উপনিবেশিকতা প্রভাবেই ঘটছে।
কিন্তু আমার তাতে আপত্তি নেই। মেঘ ও রৌদ্র গল্পের শশিভূষণ তো ইংরেজদের বানানো আইনের পাঠ করেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এছাড়া আজকাল বাংলাদেশের এতো মানুষ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন ও নানা ভাবে বৈশ্বিক জ্ঞান আহরণ করছেন। তাই কেউ যদি পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের ভিতরে অবস্থান করে কাজ করেন তাতে আমি অসুবিধা দেখি না, তা যে ভাষাতেই হোক।
কিন্তু পশ্চিম বা অন্য স্থান থেকে আহরোনের পাশাপাশি দেশের ভিতরে সেই চিন্তাগুলোর কেমন বিকাশ ও পরিমার্জনা হচ্ছে, বা নতুন কিছু তৈরি হচ্ছে কিনা তার দিকেও লক্ষ থাকা প্রয়োজন ও তাকে সমমানের মর্যাদা দেয়ার চর্চা শুরু করা দরকার। বর্তমান বিশ্বে অন্য দেশ ও ভাষাতে যে সাহিত্য ও জ্ঞানের চর্চা হয় তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে দেখেছি পাশ্চাত্যের যে কোন ধরণের আলোচনা, সাহিত্য ও ইতিহাস বিশ্লেষণকে নানা তকমা দিয়ে পরিত্যাজ্য করার প্রবণতায় লিপ্ত থাকতে। তারা অন্যান্য গোষ্ঠীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বাতিল করে, একান্ত নিজস্ব চিন্তা বিকাশের প্রচেষ্টা করছেন। এই ধারাটা শক্তিশালী কারণ তারা মেঘ ও রৌদ্র গল্পের মতোই সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট কাজে লাগাতে পারেন, যার সঙ্গে বাইরে থেকে আসা জ্ঞান ও ধ্যান ধারণা প্রতিযোগিতাতে পেরে উঠে না। কিন্তু এই শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান তাত্ত্বিক উগ্রবাদ একসময়ে ক্ষতিকর উগ্রবাদকে সহায়তা করতে পারে। তাই ভূখণ্ডের ভিতরের ও বাইরের সংস্কৃতি ও জ্ঞান তাত্ত্বিক উদার চর্চার আমি পক্ষে। যা অর্জিত হতে পারে বিশ্ব সাহিত্য ও চিন্তা চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব সাহিত্য ও চিন্তা চর্চার প্রতি সম মনোযোগ দেয়ার মাধ্যমে। একই রকম সম মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন দেশের ভিতরে সমকালের কাজ ও অতীতের কাজের তুলনাতে।
দেশের ভিতরে সাহিত্য আলোচনাতে আরেকটা সমস্যা লক্ষ করেছি, যে ধারাটাও বেশ শক্তিশালী। উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছি। কয়েকবছর আগে একজনে লেখকের নাম ফেসবুকে বেশ আলোচনাতে এসেছিলো, যার নাম বাংলাদেশের বোদ্ধা গোষ্ঠীর সে সময়ে জানতেন না। তখন সেই লেখককে গ্রাম বাংলার প্রতিনিধি হিসাবে চালানোর প্রবণতা সম্বলিত কিছু পোস্ট দেখেছি। পোস্টগুলোতে গ্রামের মানুষকে কিছুটা হলেও শহুরে মধ্যবিত্তের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছিলো। ওই লেখকের জনপ্রিয়তা ছিলো সেই প্রয়াসের সপক্ষের যুক্তি। এই আলোচনাগুলোতেও আছে দ্বিচারিতা। তুলনাতে দেখুন সম্প্রতি পেন্সিল ও অন্যান্য প্লাটফর্ম কিন্তু সাহিত্য ভোক্তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। অথচ সেই একই বোদ্ধা গোষ্ঠী পেন্সিল জাতীয় প্লাটফর্মের প্রশংসাতে পঞ্চমুখ নন। কারণ এ প্লাটফর্মগুলোতে হয়তো সেই শ্রেণী দ্বন্দ্ব নেই যা তারা প্রতিনিয়ত অনুসন্ধান করছেন। এই প্লাটফর্মগুলো শেষমেশ মধ্যবিত্তেরই প্রতিনিধি। পার্থক্য এই যে, মধ্যবিত্তের মধ্যে যে পাঠক-লেখক গোষ্ঠী এতদিন প্রচলিত প্রথম সারির পত্র পত্রিকাতে তাদের কাজ প্রকাশ করতে পারতো না, এই প্লাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকাশের মাধ্যম খুঁজে পেয়েছেন। আমি নিজে এরকম কয়েকটি ফেসবুকের গ্রুপের সদস্য। এই গ্রুপগুলো এক ভিন্ন জগত তৈরি করেছে, যেখানে বোদ্ধা গোষ্ঠী যেসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানেও সেরা লেখক-লেখিকা আছেন। তাদের বই লেখা প্রকাশের পরেই বিক্রি হয়ে যায়। তারা নিজেদের মধ্যে সাহিত্য আলোচনা করেন। ও সেই আলোচনাতে বোদ্ধা গোষ্ঠী যাদের সেরা লেখক-লেখিকা মনে করেন তাদের নাম থাকে না।
নানা উপদলের বিভক্ত সাহিত্য ও সাহিত্য সম্পর্কিত চিন্তাকে মনে করি একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। যেমন, প্রধান মিডিয়াগুলো, অনলাইন প্লাটফর্ম ইত্যাদিতে যুক্তরা মিলে বছরে হয়তো প্রায় ১০০০ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনগুলি তা চিহ্নিত করলে পাঠক সমাজের খুব সুবিধা হতো। একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশিত সব উপন্যাসের নাম প্রচারের প্রয়োজন নেই। একটা সীমিত সংখ্যক পড়লেই চলে। সেই সীমিত সংখ্যককেই যারা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তারা আলোচনা-প্রচারের মাধ্যমে বিশিষ্ট ও অনিবার্য করে তুলতে পারেন। তেমনি সপ্তাহে সোশাল মিডিয়া ও পত্র পত্রিকাতে শত শত কবিতা প্রকাশ করা হয়। বছরে কবিতার বই বের হয় ২০০০-৩০০০ হাজারের মতো। এখানেও কারা এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ, তাদের ইতিমধ্যেই যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তারা চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারেন। এতে অরাজকতা কিছুটা হলেও কমবে ও আগ্রহী পাঠক জানতে পারবেন কাদের পাঠ করা আসলেই জরুরি। এর মানে অন্যরা লিখবেন না বা অন্য কারো লেখা পড়ার দরকার নেই তা নয়। সমকালের গুরুত্ব একটি চলমান বিষয়। তার পরিবর্তন পরিমার্জনা চলা বাঞ্ছনীয়। নিত্য নতুন লেখার আগমন ও পাঠের মাধ্যমেই সেই পরিবর্তন পরিমার্জনা সম্ভব। এই চিহ্নিত করণে ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা ভুল হতে পারে এবং এরকম অস্বাভাবিক কিছু নয়। একটি সময়ের একশত লেখক-চিন্তাবিদের মধ্যে হয়তো শুধু একজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু এই এক জন তৈরির ভিত্তি তৈরি করে দেন বাকি নিরানব্বই জন। তাই বাকি নিরানব্বই জন যে চর্চা করছেন তাও সামাজিক ভাবে খুব জরুরী। আমি আগের একটা আলোচনাতে দেখিয়েছিলাম যে এই একজনকে সমকালে বিশিষ্ট করে তুলতে পারলে, সমাজ ও রাষ্ট্র তার কাছ থেকে নানা প্রয়োজনে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা পেতে পারে, যেরকম অবদান শুধুমাত্র সমকালের লেখক-চিন্তাবিদদের পক্ষে সম্ভব। লেখাটা প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ২৪ এ।
মোটামুটি ভাবে বাংলাদেশে বোদ্ধা গোষ্ঠীর সাহিত্য ও সাহিত্য আশ্রয়ী আলোচনার দুটি মূল ধারা। একটা হলো বিশ্ব সাহিত্য ও চিন্তা কেন্দ্রিক ও অপরটি হলো অতীতাশ্রয়ী। অতীতাশ্রয়ীদের মধ্যে যেমন আছে মাত্রাতিরিক্ত মুগ্ধতা, তেমনি আছে যে কাটা ছেড়া ছিদ্রান্বেষীতা। এই দু`য়ের সমমর্যাদায় সমকালকে আলোচনাতে আনার প্রচেষ্টা নেই। সমকালকে গুরুত্ব না দেবার ফল হতে পারে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা, যা উগ্রবাদ প্রসারের উর্বর ক্ষেত্র। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উগ্রবাদ সময়ের পরিক্রমায় ক্ষতিকর উগ্রবাদকে সহায়তা করে। এরকম কিছু লক্ষণ বর্তমানে আছে ও তার পরিণতি কেমন হতে পারে তার উদাহরণ আমাদের আশে পাশের দেশগুলোতেই পাওয়া যাবে। এ লেখাটা তাই বিশ্ব সাহিত্য ও অতীতের বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে বর্তমানে যে সাহিত্য ও সাহিত্য আশ্রয়ি কর্মকাণ্ড চলছে তাকে গুরুত্ব দিবার চর্চাকে গতিশীল করার আহবান করছে।