২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

দুই কবি, এক হৃদয়: হাফিজ ও গ্যোয়েটের অমোঘ বন্ধন

ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায় কেবল উপাসনালয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে, প্রকৃতিতে, আনন্দে, শিল্পে। গ্যোয়েটে উপলব্ধি করলেন তিনটি বড় সত্য: প্রথমত ধর্মের ভিতরে প্রেমই কেন্দ্র। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষা কিন্তু মানুষের ঈশ্বরানুভূতি একই সুরে বাঁধা। দ্বিতীয়ত, পূর্ব ও পশ্চিম আলাদা নয়; তিনি দেখলেন, ইউরোপের দর্শন আর প্রাচ্যের সুফিবাদ একই প্রশ্নের ভিন্ন ভাষা। তৃতীয়ত, মানবতা ধর্মের ঊর্ধ্বে।

নাজমিন মর্তুজা নাজমিন মর্তুজা

Published : 16 Apr 2026, 04:58 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:25 PM

হাফিজ চতুর্দশ শতকের ইরানি কবি। তাঁর আসল নাম শামসুদ্দিন মুহাম্মদ হাফিজ। পারস্যের শিরাজ শহরে তার জন্ম। ‘বুলবুল-ই সিরাজ’ উপাধিতে ভূষিত হাফিজ। তাঁর কবিতাকে বলা হয়ে থাকে লিসান উল গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী )এবং ‘তরজমান-উল-আসরার’ (রহস্যের মর্মসন্ধানী)। আনুমানিক চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তাঁর জন্ম এবং ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে এই কবির মৃত্যু। নিজের জীবনযাপন এবং সৃষ্টির প্রতি হাফিজ ছিলেন খুবই নিরাসক্ত, উদাসীন। ফলে তাঁর কবিতার কোনো সংগ্রহ তিনি নিজে করে যাননি। মৃত্যুর প্রায় একুশ-বাইশ বছর পর কবির বন্ধু মুহম্মদ গোলাবন্দ ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে হাফিজের কবিতার প্রথম সংকলন করেন। সেটিই ‘দিওয়ান-ই-হাফিজ’ নামে পরিচিত। হাফিজের প্রায় পাঁচ শতাধিক কবিতা এই সংকলনে আছে। এবং মনে করা হয় এর বাইরে বহু কবিতা হারিয়ে গেছে। হাফিজের কবিতা গীতিকবিতা, গজল গান। লেখামাত্র তা মুখেমুখে গীত হত এবং ধর্মমন্দির থেকে পানশালা সর্বত্র তাঁর কবিতার ছিল অবাধ বিস্তার। হাফিজের কবিতা কাব্য ও দর্শন তত্ত্বের জন্য সারা বিশ্বে সমাদৃত।

পারসি গজলের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন হিসেবে তাঁকে মানা হয়। তাঁর কবিতায় গোলাপ, বুলবুল, মদ, প্রেম, সবই এক গভীর আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। প্রেম তাঁর কাছে শুধু মানবপ্রেম নয়, ঈশ্বরপ্রেমও। যুক্তির বদলে হৃদয়ের পথ বেছে নেওয়া এক মরমি কণ্ঠ। হাফিজ-এর দিওয়ান শুধু কবিতার বই ছিল না; অনেক মানুষের কাছে এটা ছিল জীবন বোঝার এক পাঠশালা। কেন এই বই মানুষকে ভেতর থেকে বড় করে তোলে। 

প্রেমকে জীবনের কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন।

হাফিজ বললেন জ্ঞান, ক্ষমতা, ধর্মীয় অহংকার-- সবকিছুর ওপরে প্রেম।

এই প্রেম শুধু মানুষে মানুষে নয়; ঈশ্বর, প্রকৃতি, জীবন--সবকিছুর সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক।

যে মানুষ প্রেমকে কেন্দ্র করে ভাবতে শেখে, সে স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে ওঠে।

ভণ্ডামির বিরুদ্ধে সাহস

হাফিজ মসজিদ, মন্দির, ধর্মগুরু কারও ভণ্ডামিকে ছাড় দেননি। তিনি শিখিয়েছেন--ধর্ম মানে ভয় নয়, আনন্দ। ধর্ম মানে নিয়ম নয়, হৃদয়ের সততা। এই সাহস মানুষকে মুক্ত করে।

আনন্দকে পবিত্র করা

মদ, সঙ্গীত, বসন্ত, ফুল, এসব হাফিজের কবিতায় পাপ নয়; জীবন।

তিনি বললেন জীবনকে ভালোবাসা মানে নিজেই এক আধ্যাত্মিকতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করে। আনন্দকে পবিত্র করার যে দৃষ্টিভঙ্গি এটা মূলত জীবনকে সন্দেহ নয়, উদযাপনের চোখে দেখার এক সাহসী অবস্থান। এই জায়গাটাতেই  হাফিজ অন্যদের থেকে আলাদা।

তার কবিতায় মদ মানে শুধু পানীয় নয়, মুক্তির প্রতীক। সঙ্গীত মানে ভোগ নয়, আত্মার কম্পন। বসন্ত মানে ঋতু নয়, পুনর্জন্ম। ফুল মানে সাজসজ্জা নয়, সৌন্দর্যের ভাষা।

তিনি যেন বলছেন জীবনের আনন্দকে সন্দেহ করা বন্ধ করো; ভালোবাসা, সৌন্দর্য আর আনন্দকে গ্রহণ করাই এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা। এখানে বড় কথা হলো অপরাধবোধের শৃঙ্খল ভাঙা। অনেক ধারায় আনন্দকে সন্দেহ করা হয়, কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে যে-হৃদয় সত্যিকারের আনন্দ অনুভব করতে পারে, সে ঈশ্বরের কাছেই আছে। কারণ আনন্দ মানে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এই ভাবনা আমাদের শেখায়, পবিত্রতা মানে শুধু সংযম নয়; পবিত্রতা মানে জীবনের সৌন্দর্যকে গভীরভাবে অনুভব করা।

জীবনকে ভালোবাসা এক ধরনের প্রার্থনা।

বিনয় শেখানো

হাফিজ বারবার বলেছেন মানুষের জ্ঞান সীমিত। এই উপলব্ধি মানুষকে নম্র করে। হাফিজের কবিতা পড়ে মানুষ বুঝতে শেখে সত্যিকারের স্বাধীনতা বাইরে নয়, ভেতরে। এই কারণেই তাঁর দিওয়ান শুধু পড়া হয় না; মানুষ এটাকে সঙ্গে রাখে, খুলে দেখে, ভবিষ্যৎ জানতে আওয়াজ তোলে, দুঃখে সান্ত্বনা খোঁজে। একটা বই যখন মানুষের বন্ধু হয়ে ওঠে তখন সেটাই মানুষকে বড় করে তোলে।

ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে

জার্মানির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একজন। কবি, নাট্যকার, দার্শনিক একজন পূর্ণ মানব। ইউরোপের অস্থির সময়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যের দিকে হাত বাড়ালেন। হাফিজের কবিতা পড়ে তিনি আরবি শিখলেন, কোরান পড়লেন, পারস্য সাহিত্য গ্রহণ করলেন এবং লিখলেন West–Eastern Divan পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনের কাব্য।

দুই মন, এক আত্মা। একজন পারস্যে, আরেকজন জার্মানিতে। দুজনের মাঝে পাঁচ শতাব্দীর দূরত্ব।

তবু একজন লিখলেন পৃথিবী ধ্বংস হলেও তিনি হাফিজের সঙ্গে হাঁটতে চান। হাফিজ প্রেমকে করেছিলেন পথ। গ্যোয়েটে সেই পথ ধরে হেঁটেছিলেন। একজন শুরু করেছিলেন গান, আরেকজন তা শুনে উত্তর লিখেছিলেন। এই কারণেই তাদের সম্পর্ককে বলা হয় দুই মন, এক আত্মা। পারস্যের হাফিজ আর জার্মানির ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে তাদের জীবনের দূরত্ব বিশাল, কিন্তু অনুভূতির জায়গাটা আশ্চর্যজনকভাবে এক।

দুজনেই শেষ পর্যন্ত মাথা নত করেছিলেন এক জিনিসের সামনে: প্রেমের সামনে, আর সেই প্রেমের ভেতরে থাকা ঈশ্বরের সামনে।

হাফিজের কাছে সিজদা মানে ছিল হৃদয়ের আত্মসমর্পণ। মসজিদে, মদের পেয়ালায়, প্রেমিকার চোখে সবখানেই তিনি এক আলোর সন্ধান করতেন। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল রীতি নয়, অনুভূতি।

গ্যোয়েটে যখন তাঁর কবিতা পড়লেন, তিনি বুঝলেন এই সিজদা তিনি নিজেও চেনেন। তাই তিনি আরবি শিখলেন, কোরান পড়লেন, নিজের ভেতর সেই একই আলো খুঁজলেন। তাঁর কাব্যে তিনি লিখলেন পূর্ব আর পশ্চিম একই স্রষ্টার সৃষ্টি।

আধ্যাত্মিকতার খোঁজে এগোতে গিয়ে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে  আসলে এক ধরনের ভেতরের রূপান্তর পেলেন।

শুরুটা ছিল কৌতূহল দিয়ে। প্রাচ্য সাহিত্য, ইসলামি দর্শন, সুফি ভাবনা সবকিছু জানতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা গবেষণা থেকে অভিজ্ঞতায় বদলে গেল। সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল ঈশ্বরকে বোঝার পথ একটিই নয়। 

 হাফিজের দিওয়ান ও গ্যোয়েটের আধ্যাত্মিক যাত্রা--এটি শুধু ইতিহাস বা অনুবাদের তথ্যকে তুলে ধরে না, বরং সেই অন্তর্দৃষ্টি, ভেতরের প্রস্তুতি, এবং প্রাচ্য-প্রতীচীর মিলনের দার্শনিক অনুভূতিটিকেও সংজ্ঞায়িত করে।

পারস্যের সুফি কবি হাফিজ-এর কবিতা পড়ে তিনি বুঝলেন, ধর্ম কেবল বিধান নয়; এটা অনুভূতি, প্রেম, বিস্ময়, আত্মসমর্পণ।

ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায় কেবল উপাসনালয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে, প্রকৃতিতে, আনন্দে, শিল্পে। গ্যোয়েটে উপলব্ধি করলেন তিনটি বড় সত্য: প্রথমত ধর্মের ভিতরে প্রেমই কেন্দ্র। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষা কিন্তু মানুষের ঈশ্বরানুভূতি একই সুরে বাঁধা। দ্বিতীয়ত পূর্ব ও পশ্চিম আলাদা নয়; তিনি দেখলেন, ইউরোপের দর্শন আর প্রাচ্যের সুফিবাদ একই প্রশ্নের ভিন্ন ভাষা। তৃতীয়ত, মানবতা ধর্মের ঊর্ধ্বে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা মানুষকে আলাদা করে না; এক করে। এই উপলব্ধির ফল ছিল তাঁর কাব্যগ্রন্থ West–Eastern Divan—যেখানে তিনি ঘোষণা করলেন, পৃথিবী এক, স্রষ্টা এক, আর মানুষের হৃদয়ও এক।

গ্যোটে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি তথ্য পাননি, তিনি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেছিলেন। তাই বলা যায়, তাদের দুজনের হৃদয় এক জায়নামাজে নত হয়েছিল: মানবতার সামনে, প্রেমের সামনে, আর এক অবিভাজ্য সত্যের সামনে।

জার্মানির এক বৃদ্ধ কবি। বয়স তখন অনেকটাই পেরিয়েছে। বন্ধুর মৃত্যু, যুদ্ধের অস্থিরতা, সভ্যতার ভাঙন সব মিলিয়ে মন যেন শুকনো। সেই সময় এক বই এসে তাঁর জীবনের দরজা খুলে দিল। সেই বই ছিল পারস্যের কবি হাফিজ এর দিভান।

এই গল্প আসলে এক প্রেমের গল্প। ভাষা আর সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে এক কবির আরেক কবিকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।

১৮১২ সালে জার্মান ভাষায় অনূদিত হাফিজের কবিতা হাতে পেলেন ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে। তিনি তখন জীবনের শেষ পর্বে। তাঁর চারপাশে ইউরোপ যুদ্ধবিধ্বস্ত, মানুষ বিভক্ত, বিশ্বাস ক্ষতবিক্ষত।

হাফিজের কবিতা খুলতেই তিনি যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়লেন। সেখানে ধর্ম নেই, বিভাজন নেই শুধু প্রেম, আনন্দ, আধ্যাত্মিকতা, মানবতার দীপ্তি। গ্যোয়েটে অনুভব করলেন এই কবি তাঁর আপনজন।

তিনি লিখেছিলেন, পৃথিবী ধ্বংস হলেও হাফিজের সঙ্গে তিনি পাশাপাশি হাঁটতে চান। এই বাক্য আসলে এক আত্মস্বীকারোক্তি। তিনি শুধু হাফিজকে পড়েননি, তাঁর ভেতর বাস করতে শুরু করেছিলেন।

হাফিজে কেন এত গভীর আকর্ষণ? হাফিজ যুক্তির পথ ছেড়ে প্রেমের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় মদ, গোলাপ, বুলবুল সবই আসলে ঈশ্বরের রূপক। পূর্ব আর পশ্চিম আলাদা নয়। মানুষের হৃদয় এক।  বয়স পঁয়ষট্টি তবু নতুন ভাষা শেখার এই তাগিদ কেবল গবেষণা ছিল না; এটা ছিল ভালোবাসা।

পুঁথির সাঁকো

প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলনবেলার পুঁথি। এখানে তিনি কখনো নিজেকে হাফিজ ভাবেন, কখনো তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে রূপ নেন। তিনি যেন বলতে চান কবিতা জাতির নয়, মানুষের। এই বই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। হাফিজ তাঁর কাছে হয়ে উঠলেন গুরু, বন্ধু, সহযাত্রী।

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সাহিত্য কেবল শব্দ নয়। এটা মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হওয়ার উপায়। এক পারস্য কবির গজল এক জার্মান কবির হৃদয় বদলে দিয়েছিল। আর সেই বদলে যাওয়া হৃদয় আমাদের জন্য রেখে গেছে এক পুঁথি, যেখানে লেখা আছে, পৃথিবীর শেষ সত্য একটাই: প্রেম।

 গ্যোয়েটের দিভান থেকে কিছু ভাবানুবাদ, আর তার সঙ্গে সেই অদ্ভুত বন্ধনের গল্পের স্বাদ আমরা নেবো।

“যদি সমগ্র পৃথিবী ডুবে যায় অতলে,

হাফিজ, তবু তোমার সঙ্গেই চলি নির্ভয়ে।”

“তুমি মরমি ভাষার মূল,

তোমার শব্দের গভীরতা ভাষারও অতীত।”

“ধর্মের পতাকা না তুলেও

তুমি সত্যের সাধক

যারা বোঝে, তারাই বোঝে।”

“তোমার গানের পেয়ালায় ঠোঁট রাখি, যেন পৌঁছে যাই স্রষ্টার দরজায়।”

এই পং‌ক্তিগুলোতে এক কবির কণ্ঠে আরেক কবির প্রতি শ্রদ্ধা নয়, একেবারে আত্মসমর্পণ। তাঁর মনে হলো, এই মানুষটি তাঁরই মতো কথা বলছেন। এ যেন সময়ের ওপার থেকে এক বন্ধুর ডাক। গ্যোয়েটে শুধু মুগ্ধ হননি। তিনি বদলে গিয়েছিলেন।  লিখলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ West–Eastern Divan।

এই বই শুধু কবিতা নয়। এটা এক বন্ধুত্বের দলিল। একজন জার্মান কবি লিখছেন এক পারস্য কবির উদ্দেশে সময়কে অতিক্রম করে। কারণ এখানে কোনো সাক্ষাৎ নেই। কোনো চিঠি নেই। কোনো হাত মেলানো নেই। তবু আছে বন্ধুত্ব। কবিতা দুজন মানুষকে এক করে দিয়েছিল। গ্যোয়েটে নিজেই বলেছিলেন, তিনি আর হাফিজ যেন যমজ আত্মা। সাহিত্যের ইতিহাসে এই সম্পর্ক এক বিরল ঘটনা।

দুই যুগ। দুই পৃথিবী। এক হৃদয়।

এই বন্ধনের নাম কবিতা।