২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সার্থকতা বিচ্ছেদেই ও অন্যান্য কবিতা

মাছের পোনা ধরতে জানেন/ একমাত্র লালন সাঁই,/ তাঁর সাধ মেটে না লাঙল চষে/ ও মনা, তুই থাকবি বসে?

সার্থকতা বিচ্ছেদেই ও অন্যান্য কবিতা
চিত্রকর্ম সফিউদ্দিন আহমেদ

হাসান হাফিজ হাসান হাফিজ

Published : 25 Mar 2026, 08:24 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:14 PM

বাজাও বাঁশি ও পোড়ামন

মাছের পোনা ধরতে জানেন

একমাত্র লালন সাঁই,

তাঁর সাধ মেটে না লাঙল চষে

ও মনা, তুই থাকবি বসে?

আরশিনগর বাড়ির পাশে

খাঞ্চা যে তার কাঞ্চা বাঁশে

‘অপার’ হয়ে থাকব না আর

জীবন-মরণ হোক একাকার

সাধন পূজন হয় নি সারা

নিজ ভজনায় আত্মহারা

ও পোড়া মন বাজাও বাঁশি

মরণ-কূপে ফুলের ফাঁসি

ভবের জীবন

তাপের দহন

আমরা নিলাজ সেই কারণে

লালন করি ভালোবাসি।

জাগরণ ভুলেছে রুমাল

রুমালের সঙ্গে আছে সম্পর্ক অশ্রুর

বিচ্ছেদেরও রয়েছে কিছুটা

যে কোনো রুমাল দেখলে কেঁপে উঠি

কুঁকড়ে যাই ভিতরে ভিতরে।

কী প্রপঞ্চ সুগন্ধি রুমালে,

তুমি ধ্বংস, বীজাণুর আশ্রয়দায়িনী।

তুমি উষ্ণ দয়িতারও অচ্ছেদ্য বাঁধন

কলজে খাওয়া ঠোকরানো বিষাদমঞ্জুল

শুকনো বকুল ফুল প্রত্ন সে সম্পদ।

ভুল করে ফেলে গেছে কবে কেউ

যারা আর কোনোদিনই ফেরে না ভুলেও!

স্মৃতি হয়তো আলগোছে সুড়সুড়ি দেয়

পুরনো ক্ষতের কষ্ট অর্জনও সে করে

কিন্তু হায়! বৃথা সবই, রোদনই সম্বল

কিন্তু সংবিতের কোনো হেলদোল

আলতো পলকা অঙ্কুরের জেগে ওঠা নাই!

নির্লিপ্ততা কেন জয়ী

সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়

ছিঁড়তে ছিঁড়তে ফালি

একসময় বহু কষ্টে সাধনার ধন

সামান্য এ জীবনও ফুরায়।

গাঙে ঢেউ কলকল ছলছল

সময়ের দ্বন্দ্ব দাবি উদ্বেগহীনতা

সেইসব নির্লিপ্তিরই কথা বলে যায়

গাঙচিল ঠোঁটে মাছ দিগন্ত সুদূরে লাল

ভাঙাচোরা স্মৃতি উছলায়

সম্পর্ক কী এতোই ভঙ্গুর?

কেন ছেঁড়ে? কে-বা ছেঁড়ে?

মমতা মগ্নতা নিয়ে

একটিবারও নেড়েচেড়ে

দেখে না সে, কেন যে দেখে না!

এত কেন নিরাসক্তি,ঔদাসীন্য

কবি তার আদি অন্ত বিবরণ

আলাভোলা শব্দসত্যে কিছুই লেখে না

মন বোঝা ভার

জংলীছাপ শার্ট, ঈদ উৎসবে পাওয়া উপহার

তার মধ্যে শরীর গলিয়ে দিই

মন কিন্তু উড়ে যায় অন্তরীক্ষে,

ডানা নাই, তা সত্ত্বেও মন যে কীভাবে ওড়ে

সে এক রহস্য। নিজের মনকে আমি ছুঁতে পারি নাই।

চিনি নাই নিজেকেই। এই দুঃখ দাহ নিয়ে 

বিলাসিতা করাও অন্যায়! শার্ট থেকে বিলাসিতা-

প্রক্ষিপ্ত চিন্তার ধারা কেমন বিপথগামী

এ দৃষ্টান্ত থেকে কিন্তু পষ্ট বোঝা যায়।

হচ্ছিল মনের কথা। নিরজনে গহনে সে বনে

ঘোরে ফেরে, অনিচ্ছায় পথটথও হারিয়ে বেদিশ

মাঝে মাঝে হয়। চিন্তিত বা উদাসীন কোনোটাই

হতে চেয়ে অসফল আমি। অতএব মেনে নেই।

মেনে নেওয়াটাই হয়তো যুগধর্ম, জীবনের, বাস্তবের।

দুর্দিনের দুঃখগাথা

দেউলিয়ার সাধ আহ্লাদ বলে কিছু থাকতে নাই

থাকতে পারতো, কিন্তু আর নাই, ফিরেও পাবে না

        বিসর্জন সে দিয়েছে নিজেই

        ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায়

        যেভাবে যেমনটাই হোক,

সত্য এই, অধিকার হারিয়েছে জন্মশোধ, দীর্ঘশ্বাস

তাকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভবপর নয় 

ভালোবেসে নেমেছি পাতালে অন্ধ কুঠুরিতে

নিঃস্ব ও কাঙাল রিক্ত হয়ে গেছি কোন্ সে কবেই 

এরকম দুঃখ দিন কীভাবে সূচিত হলো কী কারণে

অলক্ষুণে সেই দগ্ধ দুর্দিনের দিনলিপি রচনা করেছি

এভাবেই দীর্ণ আর দেউলিয়া হয়ে গেছি এমন পতন

কারো যেন না থাকে কপালে, এ প্রার্থনা করি।

মানুষের অধঃপাত!

বিচ্ছেদ মিলন দোঁহে এক লপ্তে লেপটালেপটি করে থাকে

আমরা জানি, দু’জনার ভালো সখ্য, একই মুদ্রা এপিঠ ওপিঠ-

একে ওরা অপরের সম্পূরক, কেন তবে পৃথগান্ন করা?

বিচ্ছেদকে কাছে পেলে সাধ্যমতো সমাদর কোরো

আখেরে সুমিষ্ট ফল মিলতে পারে সেইমতো সম্ভাবনা আছে।

সে তো নয় মিলনের মতো অন্ধ স্বার্থপর, সংকীর্ণ ও নিচু

তবে যে মানুষ ছোটে দিবারাত্রি দিগ্ভ্রান্ত তার পিছু পিছু?

জানে না বলেই ছোটে, মানুষের ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষা  সীমিত

মানুষের ত্রাণকল্পে অতএব কিছুমিছু করুণা বরাদ্দ করা আছে, 

যৌনলাঞ্ছনার পাপ, শিশুহত্যা, নীতিলঙ্ঘনের পুঁজ, পরাস্ত কলুষ

‘মানুষ’ নামের মধ্যে চিরস্থায়ী কলঙ্কের গাঢ়ছাপ বসিয়ে দিয়েছে

‘মানুষ’ নামের যোগ্য নাই আর, তারা ঘৃণ্য পশুরও অধম!

সার্থকতা বিচ্ছেদেই

গাঙে ঢেউ, দূর গ্রহে, সে কম্পন বুঝতে পারে কেউ?

বুঝেও যে না বোঝার ভান করে, তার কোনো

শাস্তির নিয়ম নাই- সে উল্টে রাঙায় চোখ

তার প্রশংসায় দেখি উচ্চকিত উচ্ছ্বসিত লোক

এ কেমন নীতিরীতি, অদ্ভুত আজব সত্য, যৌক্তিকতা নাই

তরঙ্গের ওঠাপড়া নাচন-ভাঙন আমি আস্তে টের পাই

নীরবে হজম করি,যদিও বা সহ্যশক্তি অকালে হারাই

হারানোর মধ্যেও তো নিঃস্বতার আনন্দ লুকোনো আছে

এই বোধ নিয়ে যায় স্বৈরিণীর বুকের গোপনে কাছে

তাই আমি চিরকাল হারাতেই বেশি ভালোবাসি

গাঙের ডাকাত ঢেউয়ে তার ছায়া স্পর্শ গাঢ় আলিঙ্গন

নিভৃতে একান্তে পাই, বিচ্ছেদেই হোক তবে সার্থক জীবন...