দুখু ও হুসেন— দুই বিদ্রোহী ও তাদের কূপমণ্ডূক প্রতিপক্ষ
“আজ বাঙ্গালী মুসলমান দর্শন, বিজ্ঞান, আর্ট, কোনোটিতেই নাই। … আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বহুদিন হতে বিরোধ করে বসেছি এবং দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষাকেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি—এই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক।”
“আজ বাঙ্গালী মুসলমান দর্শন, বিজ্ঞান, আর্ট, কোনোটিতেই নাই। … আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বহুদিন হতে বিরোধ করে বসেছি এবং দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষাকেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি—এই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক। ব্রিটিশদের সঙ্গে ইউরোপের জ্ঞানদীপ্ত মন যখন এদেশে আসল এবং আমাদের আড়ষ্ট মনকে আঘাত করল তখন হিন্দু সে আঘাতে জেগে উঠে সে মনকে আলিঙ্গন দ্বারা বরণ করে নিল, আর আমরা সে আঘাতে জাগতে চাই না বরং চোখ রাঙিয়ে সে মনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি।”
বক্তব্যটি সাম্প্রতিক কালের মনে হলেও আসলে তা অনেক পুরনো। এটি ১০০ বছর আগে মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে আবুল হুসেনের প্রদত্ত একটি বক্তৃতার অংশ। ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুসলিম সাহিত্য সমাজের ওই অধিবেশনে উপস্থিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও। দ্বিতীয় দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ’খালেদ’ কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। হুসেনের বক্তৃতায় অসন্তুষ্ট হয়ে উপস্থিত কিছু মাদ্রাসা ছাত্র মজলিশ থেকে উঠে চলে যায়। হুসেন তবু বলে চলেন, আমাদের শিক্ষা একমুখী করতে হবে এবং কেমন করে করা দরকার তা ভাবতে হবে। আমার মতে যে সমস্ত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার একটিও নষ্ট করার প্রয়োজন নাই। কেবল পাঠ্যতালিকা, পলিসি ও আইটলুক পরিবর্তন করলেই কাজ হবে।
এ আলোচনাও খুব সাম্প্রতিক মনে হয়, কেননা অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ওই অধিবেশনে নজরুলের খালেদ কবিতা শুনে অনেক দর্শক পুলকিত হয়েছিলো, তবে উপস্থিত একজন দর্শক তাঁর হিন্দুপ্রীতির জন্য তাঁকে সমালোচনাও করেন। তিনি এখন সঠিক পথে ফিরছেন বলে তাঁকে প্রশংসা করা হয় এবং আশা করা হয় যে তা অব্যাহত থাকবে। আর একশো বছর পরে আজ নজরুল যেভাবে প্রশংসিত তাতে মনে হয় তারা মৃত নজরুলকে জীবিত নজরুলের চেয়ে বেশি সঠিক পথে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন! ভাগ্য ভাল যে হুসেন এখনও স্বাধীন আছেন।
বিদ্রোহী কবি নজরুল ও বিদ্রোহী চিন্তাবিদ ও কর্মী আবুল হুসেন দুজনেরই সাধনা ছিলো বাঙালি মুসলমানকে কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা, অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের অন্ধকূপ থেকে বের করে আনা। এই সংগ্রামে তাদের দুজনেরই প্রতিপক্ষ ছিলো তৎকালীন সুবিধাবাদী গোষ্ঠি। এই গোষ্ঠি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি। সক্রেটিসকে যারা হেমলক পান করিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তারাও তাদের সময়ের ধর্মকে ব্যবহার করেছে। অতএব ধর্মের এই ব্যবহার অতি পুরনো। ইসলাম ধর্মের মানবতাবাদী রূপ ও মর্মকথা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ না জানার ফলে নজরুল ও হুসেনের বিরুদ্ধে সেসময়ের নেতৃস্থানীয়রা তা করতে পেরেছে। তাঁরা দুজনই ইসলামের মহৎ বৈশিষ্ট্যের প্রতি মানুষকে আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু যা মানুষকে পিছিয়ে রাখে, অন্ধকারে থাকতে প্ররোচিত করে, প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড় করায়—সেসবের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এই দুই মহৎ বাঙালি ব্যক্তিত্ব। তাদের সেই কথাগুলোকেই ধর্মের বিরুদ্ধে বলে তকমা দিয়ে সুবিধাবাদী গোষ্ঠি তাদের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। সেই প্রতিপক্ষ এখনও বহাল।
উপরে উদ্ধৃত হুসেনের বক্তৃতার অংশটি নেয়া হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ উপন্যাস থেকে। লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান। একশো বছরের ব্যবধান অনেক, তবে প্রায় সবই দালানকোঠা, যানবাহন ও যাতায়াত ব্যবস্থায়। সমাজে মানুষের চিন্তায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে ও অসহিষ্ণুতায় অগ্রগতি হতাশাজনক। এখানেই এ উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা। উপন্যাসটিতে বাঙালি মুসলমান সমাজের দুই বীরের কথা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে একটি সংলাপে। এক স্থানে মোহাম্মদ মোজাম্মেল বলছেন, ”’আমাদের বিদ্রোহী তো দু’জন, এক দুখু মিয়া, আরেকজন যশোরের মে’বাই হুসেন মিয়া!’ মোজাম্মেল লাঠি ভরে দাঁড়িয়ে হুসেনকে বুকে জাপটে ধরেন।” দুখু মিয়া, বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আরেকজন হুসেন— আবুল হুসেন, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও তার বিখ্যাত মুখপত্র ’শিখা’র অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও কারিগর।
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। সেই তুলনায় আবুল হুসেন সম্পর্কে জনমনে ধারণা অত্যন্ত অপ্রতুল। অথচ দুজনের লক্ষ্য ছিলো অভিন্ন ও তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। যত দিন যাচ্ছে আবুল হুসেন সম্পর্কে শিক্ষিত মহলে আগ্রহ ও জানার ব্যাপ্তি তত বাড়ছে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ও শিখার শতবার্ষিকী উদযাপন হয়েছে দেশ জুড়ে। আনোয়ারুল কাদীর, আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির প্রমুখ সম্পর্কে নতুন নতুন আলোচনায় ঋদ্ধ হচ্ছে মানুষ। ’নিষুপ্ত জাগরণ’ উপন্যাসটি এই ঋদ্ধকরণে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উপন্যাসটির প্রায় শুরুতেই দেখা যায় ১৯২৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় আহসান মঞ্জিলে হুসেনের প্রকাশিত লেখা নিয়ে বিচারের মজলিশ। আগের বছর অর্থাৎ ১৯২৮ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার বলিয়াদির জমিদার খানবাহাদুর কাজেম উদ্দীন সিদ্দিকী সাহেবের বৈঠকঘরে যে সালিশ ডাকা হয়েছিলো সেখানে হুসেনকে ক্ষমা চাইতে হয় এবং এমন লেখা আর লিখবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে জীবন রক্ষা করতে হয়। আহসান মঞ্জিলে নবাবের দরবারে বিচারের রায়ের অপেক্ষায় থাকাকালীন তাঁর মনে নানা কথা ভিড় করতে থাকে।
”হুসেন ইউরোপের মধ্যযুগের গির্জার নিপীড়নমূলক ইতিহাস স্মরণ করে। ব্রুনো, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও’র ওপর গির্জার ধর্মযাজক সম্প্রদায়ের অত্যাচারের যে উদ্দেশ্য, একই উদ্দেশ্য এখন তার উপর চলছে। উচ্চশ্রেণী দ্বারা নিম্নশ্রেণীর সমাজকে অর্থনৈতিক শোষণের অস্ত্ররূপে ধর্মকে ব্যবহার চলে। কাজীদা’র কথা মনে পড়ে, ধর্মীয় কুসংস্কারের ওপর কবিতা লেখার দায়ে তার মাথার দাম হাঁকা হয়েছে, ঢাকাতেও কম অপদস্থ হতে হয়নি! কাজীদা গতবার বাসায় দাওয়াত খাওয়ার দিন বলে গেছেন, মিয়াভাই, আপনি আমার মাথারও উপরে, সৈয়দ হয়েও নামে লাগান না, আমিতো গালভরা কাজীর মাথা কেটে শুধু নজরুল ইসলাম হতে পারলাম না, বুঝলেন তো কে বড়! বংশের লেজে না মিয়াভাই, মাথায় বড় হতে হবে, বলেই সেই প্রাণখোলা হাসি।”
উপন্যাসে বর্ণিত অনেক কিছুই কল্পনাপ্রসূত যেহেতু তা উপন্যাস। তবে সেসব সম্পূর্ণ বাস্তবানুগ, এখানেই ঔপন্যাসিক শামছুজ্জামানের মুন্সিয়ানা। তিনি নিরেট নীরস ঘটনামালার সঙ্গে কল্পনার এমন অভূতপূর্ব মিশেল ঘটিয়েছেন যে, হুসেনের সময়কালটা পুরো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সমাজের গলদ ও মূল সংকট স্পষ্টভাষায় তুলে ধরতে তাঁরা দ্বিধা করেন নাই, সত্য উচ্চারণে কোনো আপস করেন নাই।
নজরুল ও হুসেনের কাঙ্ক্ষিত সমাজ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এই দুই বিদ্রোহী বীর আমাদের কাছে এখনও আলোচ্য ও তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণীয়। তবে যেসব সভায় এখন ‘বক্তার পর বক্তা’ ‘বিশেষণের পর বিশেষণ’ দিয়ে টেবিল ভেঙ্গে ফেলছে থাপ্পড় মেরে, সেখানে পাওয়া যাবে না এই দুই বিদ্রোহী বীরকে। তারা বেঁচে আছেন পথের ঝরে পড়া ফুলে ও অনগ্রসর পিছিয়ে পড়া শোষিত মানুষের মাঝে। দুখু মিয়া ও হুসেন বেঁচে থাকবেন বাংলার দুখী লড়াকু মানুষের স্বপ্নের মাঝে।
