Published : 03 Jul 2026, 10:50 PM
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক জায়গায় আঙুল থেমে গেল। ফেসবুকে এক বন্ধু, কাফি মাহমুদ, বেশ মজা নিয়ে গাইছিলেন “একটা কাতলামাছে খাচ্ছে তামাক, আম গাছেতে ঠ্যাং তুলে…" হাসি পেল, তারপর মুগ্ধতা। অসম্ভবকে সম্ভব করে, উল্টোকে সোজা করে ভাষার এমন শব্দখেলা বাংলা সাহিত্যের সেই চিরচেনা উল্টোপুরাণের ঐতিহ্য, যেখানে যুক্তির চেয়ে কল্পনা আর রসই মুখ্য। আমার সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাগীতিতেও আছে এই রকম উল্টো বাকপ্রতিমা: ‘গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়।’ তবে আমি যে-গানটির কথা বলছি, সেটা বাদল শহীদের "কইয়োরে নদী" অ্যালবামের অন্তর্গত। কিন্তু রচয়িতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তখন ভাবলাম, সব স্রষ্টা আলোয় থাকেন না, কেউ কেউ আড়ালে থেকে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি মানুষের মুখে মুখে প্রজন্ম জুড়ে বেঁচে থাকে আর এটাই বাংলার লোকজ বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধের আসল সৌন্দর্য।
বাংলা লোকসাহিত্যের এক চমকপ্রদ ধারা হলো এই “উল্টোপুরাণ" বা "আজগুবি গান"। একটা দোয়েল পাখি ঘুরিয়ে আঁখি
জাল ফেলে গঙ্গার জলে ….
জাল ফেলে পদ্মার জলে
একটা চামচিকাতে উল্টায় কাশি
একটা চামচিকাতে উল্টায় কাবা
ওরে ঠোঁট দিয়ে মাটি ঠেলে
কতো রঙ দেখবি মহিমন্ডলে।
একটা কাতলা মাছে খাচ্ছে তামাক
আম গাছেতে ঠ্যাং তুলে
কতো রঙ দেখবি মহি মন্ডলে।
মাছ তামাক খাচ্ছে, কুমির গাছে চড়ছে, শেয়াল হাসছে কুমিরকে দেখে--এই অসম্ভব দৃশ্যগুলো আসলে শিশুমনের কল্পনা আর গ্রামীণ রসবোধের অপূর্ব মিশেল। বাদল শহীদের সেই বিখ্যাত গান ‘একটা কাতলা মাছে খাচ্ছে তামাক, আম গাছতে ঠ্যাং তুলে।’ শুধু বাংলা নয়, ইংরেজি সাহিত্যেও এই ধারার অস্তিত্ব আছে। এডওয়ার্ড লিয়ার বা লুইস ক্যারল যেভাবে ননসেন্স ভার্স লিখেছেন, বাংলায় সুকুমার রায় সেই ধারা ধরেছেন "আবোল তাবোল"-এ। বাদল শহীদ সেই একই লোকজ উত্তরাধিকার বহন করছেন, তবে একদম গ্রামীণ সুর ও ছন্দে। এই ঘরানার মজাটা হলো যত বেশি অসম্ভব, তত বেশি আনন্দ। পড়তে পড়তে মুখে হাসি চলে আসে, মন হালকা হয়।
এই ধরনের গান আপাতদৃষ্টিতে "আজেবাজে" মনে হলেও এর ভেতরে একটা গভীর কাজ আছে। উল্টো জগৎ আমাদেরকে দেখায় যেখানে দুর্বল শক্তিশালীকে হারায়, ছোট বড়কে পিছনে ফেলে। শেয়াল হাসছে কুমিরকে দেখে--এটা আসলে ক্ষমতার উল্টো চিত্র। লোকশিল্পে এই টপসি-টার্ভি ওয়ার্ল্ড ধারণাটা বহু প্রাচীন।

পিটার ব্রুগেলের সংযোগ
এই গানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে পিটার ব্রুগেল দ এল্ডারের বিখ্যাত চিত্রকর্ম "নেদারল্যান্ডিশ প্রোভার্বস" ব্রুগেলের ছবিতে দেখা যায় মানুষ চাঁদকে জাল দিয়ে ধরছে, শেয়াল গোলাপ খাচ্ছে মাছকে মাছ খাচ্ছে উল্টো নিয়মে। একটা ছবির ভেতরে শতাধিক অসম্ভব দৃশ্য, ঠিক যেভাবে বাদল শহীদের গানে একটা ছবির পর আরেকটা ছড়িয়ে পড়ে।
সুকুমার রায়ের সংযোগ
বাংলায় সুকুমার রায় শুধু লেখক ছিলেন না, নিজেই আঁকতেন তাঁর আজগুবি চরিত্রগুলো। হাঁসজারু, মাছরাঙা-ভালুক এই হেঁয়ালি প্রাণীগুলো আঁকা আর লেখা একসঙ্গে চলত। লোকগানের আজগুবি আর সুকুমারের আঁকা মিলে যায় একই বিন্দুতে।
সালভাদোর দালি
স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালির সুররিয়ালিজমের সঙ্গেও একটা সূক্ষ্ম মিল আছে। দালির ছবিতে গলে পড়া ঘড়ি, হাতির পা মাকড়সার পায়ের--এগুলো যুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। বাদল শহীদের গানও ঠিক তাই করে, বাস্তবের নিয়ম ভেঙে একটা স্বপ্নের জগৎ তৈরি। তফাৎ শুধু একটাই, দালি করেছেন তেলরঙে ক্যানভাসে, আর বাদল শহীদ করেছেন সুর আর ছন্দে।
বাদল শহীদের লোকগানে অসম্ভব দৃশ্যে হাসির জগৎ, পিটার ব্রুগেল তৈলচিত্রে রয়েছে উল্টো পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাস। সুকুমার রায়ের লেখা ও রেখায় রয়েছে আজগুবি প্রাণী ও ছড়ার বিস্তার। সালভাদোর দালির সুররিয়ালিস্টিক যুক্তিভাঙা স্বপ্নের ছবিগুলো সবাই আসলে একটাই কাজ করেছে: বাস্তবকে উল্টে দিয়ে মানুষকে একটু শ্বাস নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
শুধু মজা, নাকি ভেতরে আগুন?
প্রশ্নটাই আসল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কাতলা মাছ তামাক খাচ্ছে, এটা নিছক হাসির জন্য। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই "আজগুবি" জগতের ভেতরে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে ক্ষোভ, প্রতিবাদ আর সমাজের আয়না।
এধরনের শিল্পকর্মে দুটো ধারা একসঙ্গে চলে: এক. বিশুদ্ধ আনন্দের সৃষ্টি। কিছু উল্টোপুরাণ সত্যিই শুধু শিশুমনের কল্পনা থেকে জন্মায়। ভয়হীন, দায়হীন এক জগৎ যেখানে নিয়ম নেই। এটা মানুষের মনের একটা স্বাভাবিক চাহিদা, একটু উড়তে চাওয়া।
দুই. ব্যঙ্গের মোড়কে সত্য কথা বলে, এই ঘরানার বড় অংশটা আসলে ক্ষমতাকে বিদ্ধ করার অস্ত্র। মধ্যযুগের ইউরোপে সাধারণ মানুষ রাজা বা চার্চের সমালোচনা সরাসরি করতে পারত না, করলে মাথা যেত। তাই বেছে নিত উল্টোপুরাণ। "হাতির মাথায় টিকটিকি নাচছে"এটা বলা যেত, কিন্তু আসলে বোঝাত ছোটরাই বড়দের নাচাচ্ছে।
বাংলার প্রেক্ষাপট
ময়মনসিংহ গীতিকা, পাঁচালি, বাউল গান এসবের ভেতরে উল্টো দৃশ্য মানেই প্রায়ই সমাজের অসঙ্গতির দিকে আঙুল তোলা। জমিদার, পুরোহিত, শাসকশ্রেণী এদের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলা বিপজ্জনক ছিল। তাই লোককবি বেছে নিতেন হাসির ছদ্মবেশ। সুকুমার রায় এই কাজটা করেছেন সবচেয়ে সচেতনভাবে। তাঁর "আবোল তাবোল" শুধু শিশুসাহিত্য নয়, ঔপনিবেশিক সমাজের আমলাতন্ত্র, ভণ্ডামি, নিয়মের জঞ্জাল নিয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ। শিল্পীরা জানতেন সরাসরি বললে মানুষ রাগ করে, হাসিয়ে বললে মনে থাকে।
তাহলে উত্তর হলো উল্টোপুরাণ দুটো কাজ একসঙ্গে করে: উপরে হাসি, ভেতরে প্রশ্ন। যে শুধু মজা নিতে চায়, সে মজা পায়। যে একটু ভাবে, সে দেখতে পায় কাতলা মাছটা তামাক খাচ্ছে না, আসলে ক্ষমতাবান লোকটার দিকেই আঙুল উঠছে।
উল্টা পুরাণ শুধু বাংলা সাহিত্যের একটি অভিনব রসধারা নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে প্রশ্ন করার এক সাহসী সাহিত্যিক কৌশল। পরিচিত সত্যকে উল্টে দিয়ে, ব্যঙ্গ, রস এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে এটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। বাংলা সাহিত্যে এর গুরুত্ব যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি বিশ্বসাহিত্যের পরিসরেও এটি ক্ষমতার ভাষ্য, সামাজিক কাঠামো এবং প্রচলিত আখ্যানকে পুনর্বিবেচনার এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পভাষা। সাহিত্য শেষ পর্যন্ত শুধু গল্প বলে না, চেনা গল্পের ভেতরের অচেনা সত্যও উন্মোচন করে; আর উল্টা পুরাণ সেই কাজটিই অসাধারণ দক্ষতায় করে।