হোর্হে লুইস বোর্হেস : শেকসপিয়র রহস্য

আবদুস সেলিম
Published : 7 Feb 2020, 05:34 PM
Updated : 7 Feb 2020, 05:34 PM

মূল: হোর্হে লুইস বোর্হেস
বাংলা অনুবাদ: আবদুস সেলিম

পাউল গ্রাউসাক-এর ক্রিতিকা লিতেরারিয়ার প্রান্তিক দুটি পরিচ্ছেদে শেকসপিয়র প্রসঙ্গ– কিংবা আমার মতে বলা যায়– শেকসপিয়র রহস্য নিয়ে আলোচনা আছে। সম্ভবত বিষয়টি আপনারা ধারণা করতে পারছেন। গ্রাউসাক-এর আলোচনার প্রতিপাদ্য হলো বর্তমান বিশ্বে বিয়োগান্তক, মিলনান্তক, ঐতিহাসিক নাটক এবং কবিতার জনক বলে যাঁকে এত শ্রদ্ধা করা হয় তিনি ১৬১৬ সালে প্রয়াত উইলিয়ম শেকসপিয়র কি না। উক্ত দুটি প্রবন্ধে তিনি অবশ্য মধ্য উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত স্বীকৃত মতামতেরই পক্ষাম্বলন করেছেন। কিন্তু ঠিক এই সময়কালেই মিস ডেলিয়া বেকন, হথর্ন রচিত একটি প্রবেশক সম্বলিত গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যদিও স্বয়ং হথর্ন-এর এই গ্রন্থটি পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। ডেলিয়া বেকন শেকসপিয়র নামাঙ্কে প্রকাশিত সাহিত্যকর্মের পিতৃত্ব প্রদান করেন কূটনীতিজ্ঞ ও দার্শনিক ফ্রানসিস বেকনকে যিনি আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা এবং এক অর্থে বিজ্ঞানের বলিও বটে।
আমি যদিও ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে বর্তমানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে শ্রদ্ধেয় উইলিয়ম শেকসপিয়রই উপরোল্লিখিত শিল্পকর্মের স্রষ্টা, তবুও গ্রাউসাক-এর যুক্তির কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। তাছাড়া, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এক দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটেছে। মজার ব্যাপার হলো একে গোয়েন্দা পুলিশি দৃষ্টিকোণ থেকে মনস্তাত্ত্বিক বলে অভিহিত করা যায় এবং এই মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান লন্ডনের নিকটবর্তী ডেটফোর্ডের এক সরাইখানায় ১৫৯৩-এ খুন হওয়া কবি ক্রিস্টোফার মার্লোর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে।
শেকসপিয়র-এর বংশ পরম্পরা ও বেড়ে ওঠার ইতিহাস নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা যেতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায় : শেকসপিয়র-এর অপ্রতুল শিক্ষা গ্রহণ মূলত স্ট্র্যাটফোর্ডের গ্রামার স্কুলে।
বন্ধু-প্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকার কবি বেন জনসন-এর সাক্ষ্যে জানা যায় শেকসপিয়র 'সামান্য লাতিন এবং তদপেক্ষা সামান্য গ্রিক ভাষা জানতেন।' অথচ উনবিংশ শতাব্দীর অনেকেই শেকসপিয়র-এর সাহিত্যকর্মে বিশ্বকোষীয় জ্ঞানের গভীরতা আবিষ্কার করেছে। আমার কাছে মনে হয় যদিও শেকসপিয়র-এর শব্দভাণ্ডার দানবীয়রূপে বিপুল, বিশাল ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন জ্ঞান-শাখা এবং বিজ্ঞানের শব্দাবলির সঠিক ব্যবহার এক ব্যাপার এবং ঐসব জ্ঞান-শাখা ও বিজ্ঞান বিষয়ে গভীর কিংবা শুধুমাত্র বাহ্য জ্ঞান থাকা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। আমরা এর সাথে সের্বান্তেস-এর সাযুজ্য খুঁজে পাই। মনে পড়ছে জনৈক মি. বার্বি ঊনবিংশ শতাব্দীতে সের্বান্তেস, এক্সপার্ট ইন জিওগ্রাফি নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল।

মোদ্দা কথা হলো নান্দনিক ব্যাপারটা সাধারণের জন্য সহজগম্য নয় এবং ফলে তারা সৃজনী ব্যক্তিগণের অপরাপর গুণাবলির সন্ধানে উৎসুক হয়– যেমন তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার। এক্ষেত্রে সের্বান্তেস এবং শেকসপিয়র উভয়েই সন্দেহাতীতভাবে সৃজনী ব্যক্তিত্ব। মিস ডেলিয়া বেকন এবং অন্যান্যরা দাবি করেন যে নাট্যকারের পেশা কুমারী সম্রাজ্ঞী (ভার্জিন কুইন) এলিজাবেথ এবং প্রথম জেমস-এর শাসনামলে তাৎপর্যহীন ছিল এবং শেকসপিয়র-এর মধ্যে যে জ্ঞানের আলো আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয় তাতে বেচারা উইলিয়াম শেকসপিয়র-এর কোনো অংশদারিত্ব ছিল না। কারণ ঐসব সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা কোনো জ্ঞানকোষীয় জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি। মিস ডেলিয়া বেকন তাঁর সমনামি ফ্রানসিস বেকনকে সেই লেখক বলে শনাক্ত করেছেন।
যুক্তি এভাবে উত্থাপিত হয়েছে : বেকন ছিলেন রাজনীতিক ও বৈজ্ঞানিক রূপে অতীব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বিজ্ঞানকে তিনি পুনঃস্থাপিত করতে চেয়েছিলেন 'রেজনাম হোমিনিস' বা মানব সাম্রাজ্য হিসেবে। একজন কূটনৈতিক এবং দার্শনিক রূপে নাটক রচনা তাঁর আত্মশ্লাঘার প্রতিকূলাচরণ ছিল। ফলে তিনি নিত্য নামের পরিবর্তে নাট্য প্রযোজক উইলিয়ম শেকসপিয়র ছদ্মনাম খুঁজে বের করেন।
যাঁরা মিস বেকন-অভিসন্দর্ভকে সমৃদ্ধ করতে কিংবা বলা যায় এক অযৌক্তিক পর্যায়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছেন তাঁরা সাঙ্কেতিক বিশ্লেষণের আশ্রয় নিয়েছেন। এই পর্যায়ে আমরা, বলা যায় এডগার অ্যালান পো-র গোয়েন্দা-গল্প 'গোল্ড বাগ'-এর রাজ্যে প্রবেশ করি। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, তাঁরা উইলিয়ম শেকসপিয়র-এর সমগ্র সাহিত্যকর্ম খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে 'বি' দিয়ে শুরু, 'এ' দিয়ে অনুগামিত, পরবর্তীতে 'সি' এবং 'ও' এবং সবশেষে 'এন' অক্ষর সম্বলিত অন্তত একটি লাইন অনুসন্ধান করতে যারপরনাই সচেষ্ট হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁরা বেকন-এর গোপন কোনো স্বাক্ষর উৎঘাটনে তৎপর ছিলেন। কিন্তু তাঁরা বিফল হয়েছেন। পরবর্তীতে একজন তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়েও আরো অযৌক্তিক পর্যায়ে গিয়ে স্মরণ করেছেন যে যেহেতু ইংরেজি ভাষায় 'বেকন' শব্দটির অর্থ শূকর মাংস তাই বেকন তাঁর নিজ নামের স্বাক্ষর না দিয়ে সাংকেতিক বা শব্দ-ধাঁধার মাধ্যমে 'হগ' বা 'পিগ' বা 'সোয়াইন' শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি অসাধারণভাবে অসম্ভাবনীয় কারণ নিজের নাম নিয়ে কেউ এ ধরনের কৌতুক কখনো করে না। ঐ ভদ্রলোক, আমার বিশ্বাস, সম্ভবত কোনো একটি লাইনের সন্ধান পেয়েছিলেন যার শুরু হয়েছিল 'পি' দিয়ে কিন্তু 'আই' দিয়ে অনুগমিত না হয়ে হয়েছে 'ওয়াই' দিয়ে এবং তৃতীয় শব্দটির শুরু 'জি' দিয়ে। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর অভূতপূর্ব উপপ্রমেয় বা প্রস্তাব শেকসপিয়র-এর বিশাল সাহিত্যকর্মের ভেতর শুধুমাত্র শূকর প্রাপ্তির কারণেই অতীব যৌক্তিক রূপে বিবেচিত হবে।


বেকনীয় তত্ত্বের বিশিষ্ট প্রবক্তার মধ্যে ছিলেন মার্ক টোয়েন। তাঁর রচিত ইজ শেকসপিয়র ডেড ? গ্রন্থে টোয়েন এই তত্ত্বের সারসংক্ষেপ চাতুর্যের সাথে তুলে ধরেছেন যা পাঠকের চিত্তবিনোদনের জন্য আমি পড়তে সুপারিশ করি, বিশ্বাস করার জন্য নয়। এই যুক্তিমালা মূলত অনুমাননির্ভর যার পুরোটাই গ্রাউসাক দক্ষতার সাথে খণ্ডন করেছেন।
প্রসঙ্গক্রমে আমি এর সাথে কিছু ভিন্ন প্রকৃতির যুক্তি উত্থাপন করতে চাই। গ্রাউসাক বেকন-এর নামের 'সাথে নিম্নমানের কাব্য রচনার প্রসঙ্গ এনেছেন। আমি বলব বেকন এবং শেকসপিয়রের মন-মানসিকতা মূলত এবং অপরিবর্তিতভাবে ভিন্নধর্মী, বেকন-এর মানসিকতা অবশ্যই শেকসপিয়র অপেক্ষা আধুনিক ছিল। বেকন ছিলেন ইতিহাস সচেতন। তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন তাঁর যুগ, অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দী বৈজ্ঞানিক যুগের ঊলাষগ্ন এবং তিনি চেয়েছিলেন অ্যারিস্টটল-এর রচনার অভ্যর্চনা প্রকৃতির সরাসরি অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হোক।
আজকের যুগে আমরা যাকে বৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনী বলি বেকন ছিলেন তার প্রথম প্রবক্তা। তাঁর নিউ অ্যাটলানটিস গ্রন্থে তিনি একদল পর্যটকের অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন যারা প্রশান্ত মহাসাগরের এক অজানা দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়। এই অভিযানের অনেক বিস্ময়কর ঘটনার বাস্তব রূপ আধুনিক বিজ্ঞানে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন : পানির নিচে এবং আকাশে সচল জাহাজ; বদ্ধ ঘরের ভেতর সৃষ্ট কৃত্রিম বৃষ্টি, তুষারপাত, ঝড়, অনুরণন এবং রংধনু; বিভিন্ন সঙ্কর জাতীয় সাম্প্রতিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্বলিত চিড়িয়াখানা।
রূপকের প্রতি বেকনের আকর্ষণ মানসিকভাবে শেকসপিয়র-এর সমতুল্যই ছিল। আর ঠিক এখানেই উভয়ের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় যদিও দুজনের রূপক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। উদাহরণস্বরূপ একটা যুক্তিবিদ্যার, যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল-এর সিস্টেম অব লজিক গ্রন্থটা নেয়া যায় যেখানে মিল মানুষের ভ্রম-প্রবণতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্য অনেকের মতো মিল মিথ্যা যুক্তির শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। বেকন সেই একই কাজ করতে গিয়ে বলেছেন মানুষের মন মসৃণ সমতল আয়না নয়। বরং বলা যায় কিছুটা অবতল বা উত্তল আয়না যা বাস্তবকে বিকৃত করে। তিনি দাবি করেন ভ্রান্তি-প্রবণতা মানব চরিত্র। ফলে তিনি আমাদের ভ্রান্তি-প্রবণতাকে 'আরাধ্য' বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তারই তালিকা প্রস্তুতে সচেষ্ট হয়েছেন।
এর ভেতর প্রথম হলো 'আইডলা ট্রাইবাস' বা শ্রেণী বা দলের উপাস্য যা সকল মানবজাতির মধ্যেই দেখা যায়। তিনি বলেছেন কিছু মানসিকতা আছে যা বস্তুর মধ্যে সাযুজ্য খুঁজে পায়। আবার অন্য কিছু মানসিকতা আছে যা সবকিছুর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা বাড়াবাড়িভাবে দেখতে চায়। আসলে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ নিজেকে অবলোকন করে এই অসামঞ্জস্যতা ও সামঞ্জস্যতা খুঁজে বের করার প্রবণতাকে শুধরে নেয়। এরপর বেকন গুহার উপাস্য বা 'আইডলা স্পেকাস'-এর কথা বলেছেন। অন্য কথায় বলতে গেলে, প্রতিটি মানুষ নিজের অজান্তে কোনো না কোনো ভ্রান্তির শিকার। একজন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেই ধরা যাক যার কাছে হাইনের কবিতা, স্পিনোজার দর্শন এবং আইনস্টাইন বা ফ্রয়েড-এর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হলো। যদি এই ব্যক্তি সেমিটীয় বিরোধী হয় তবে সে এই সবই একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করতে চাইবে এই যুক্তিতে যে উপরোক্ত সকলই ইহুদি। অন্য দিকে সে যদি ইহুদি বা সেমিটীয় বংশোদ্ভূত হয় তবে সবকিছুই মুহূর্তেই গ্রহণ করতে চাইবে কারণ তার ইহুদি-প্রীতি রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে সে নিরপেক্ষভাবে বিষয়গুলো বিচার করবে না বরং তার ব্যক্তিগত ভালো লাগা না লাগার ওপর নির্ভর করবে।
এরপর বেকন 'আইডলা ফোরাম' বা ভাষাগত বিভ্রমের কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন ভাষা দার্শনিকদের নয় বরং জনগণের উদ্ভব। চেস্টারটন পরবর্তীতে বলেছেন ভাষার উদ্ভব শিকারি, মৎস্যজীবী এবং যাযাবরদের দ্বারা এবং তাই ভাষা মূলত কাব্যিক। অন্য কথায় বলতে গেলে, ভাষার জন্ম সত্য কথনের জন্য নয়। এর জন্মদাতা আবেগতাড়িত কল্পনাপ্রবণ জনগোষ্ঠী এবং ফলে ভাষা ক্রমাগত আমাদের বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি বলেন কেউ একজন কানে শোনে না এবং আপনার এই বক্তব্যে কারো যদি সন্দেহের উদ্রেক হয় তবে আপনি বলবেন, 'হ্যাঁ, লোকটা জড় পদার্থের মতো বধির', শুধু এ কারণে যে আপনার হাতের কাছে 'জড়পদার্থের মতো বধির'– এমন অভিব্যক্তির সহজলভ্য বাগধারা রয়েছে।
এর সাথে বেকন চতুর্থ আরাধ্য সংযোজন করেছেন– 'আইডলা টিয়াট্রি' বা থিয়েটারের উপাস্য। বেকন বলেছেন সব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি– তাঁর নিজ দর্শন, পর্যবেক্ষণ এবং উপাত্ত সংগ্রহ এবং অনেক থেকে একে না যাওয়া বরং এক থেকে অনেকে যাওয়ার পদ্ধতিসহ বাস্তব বিশ্বকে বদলে কমবেশি কাল্পনিক বা বলা যায় সহজতর বিশ্বের জন্ম দেয়। যেমন মার্কসবাদ সব ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে। কিংবা ধরা যাক ইতিহাসবিদ বসুয়েত যিনি পুরো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ভেতর ঈশ্বর বিধানের ছায়া খুঁজে পান। অথবা স্পেংলার-এর তত্ত্ব বা টয়েনবির সাম্প্রতিক মতবাদ। বেকন এসবের কোনোটিকেই বাস্তব মনে করেন না, বরং সংজ্ঞায়িত করেন থিয়েটার হিসেবে যা প্রতীকী বাস্তব।
উপরন্তু, ইংরেজি ভাষার ওপর বেকনের কোনো আস্থা ছিল না। তিনি ভাবতেন স্বদেশি ভাষার শক্তি কম। ফলে তিনি তাঁর সব লেখা লাতিনে অনুবাদ করিয়েছিলেন। যদিও বেকন মধ্যযুগ সম্বন্ধে অত্যন্ত নিচু ধারণা পোষণ করতেন, কিন্তু মধ্যযুগীয়দের মতো বিশ্বাস করতেন যে লাতিনই একমাত্র আন্তর্জাতিক ভাষা। অন্যদিকে শেকসপিয়র-এর, আমরা জানি, গভীর ইংরেজি ভাষাপ্রীতি ছিল। মানতেই হবে ইংরেজি ভাষা তার দ্বৈত শব্দ ভাণ্ডারের কারণে পাশ্চাত্যের সব ভাষার মধ্যে অনন্য সাধারণ। সর্বসাধারণের কথোপকথন বা ভাব প্রকাশ, যেমন, শিশু, প্রাকৃতজন, নাবিক বা কৃষকদের জন্যে রয়েছে স্যাক্সন-উৎস শব্দাবলি আর বৌদ্ধিক বিষয়াদি প্রকাশের জন্যে রয়েছে লাতিন উদ্ভূত শব্দসমূহ। এই শব্দগুলোর কখনই সুস্পষ্টভাবে সমনামিক বা সমার্থক নয়। এদের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে সূক্ষ্ম দ্যোতনিক পার্থক্য রয়েছে। স্যাক্সনীয় অর্থে 'ডার্ক(Dark)' শব্দটি 'অবসকিউর(Obscure)'-এর সাথে তুল্য নয়; 'ব্রাদারহুড' এবং 'ফ্র্যাট্যারনিটি' সমার্থক নয়; লাতিনীয় অর্থে 'ইউনিক' শব্দটি 'সিঙ্গল'-এর সমতুল্য নয় বিশেষ করে কবিতায়, কারণ কাব্য শুধুমাত্র আবহ এবং অর্থের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয় যতটা শব্দের দ্যোতনাময় আবহের ওপর নির্ভরশীল।
শেকসপিয়র-এর এই বোধ ছিল। বলা যায় শেকসপিয়র-এর বৈশিষ্ট্যই হলো এই লাতিন ও জর্মন শব্দমালার পারস্পরিক ব্যবহার। যেমন ম্যাকবেথ তার রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবছে এই লাল রং সকল সমুদ্রকে রঞ্জিত করে তাদের সকল শ্যামলিমাকে একটি অরুণাভ এককে পরিণত করতে সক্ষম :
Will all great Neptune's ocean wash this blood
Clean from my hand ? No, this my hand will rather
The multitudinous seas incarnadine,
Making the green one red.

তৃতীয় পঙক্তিতে আমরা দেখি দীর্ঘ, সুললিত, ধ্রুপদী লাতিন দুটি শব্দ : 'মাল্টিচুডিনাস', 'ইনকারনাডাইন', ঠিক এরপরই যুক্ত হয়েছে হ্রস্ব স্যাক্সন শব্দমালা : 'গ্রিন ওয়ান রেড।'


চিত্রকর্ম: সালভাদর দালির আঁকা ম্যাকবেথ
আমার মতে বেকন ও শেকসপিয়র-এর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক অসঙ্গতি এতই স্পষ্ট যে এই বিষয়টিই অলীক ও কাল্পনিকভাবে আবিষ্কৃত সকল বেকনীয় যুক্তি ও সঙ্কেতকে অসাড় প্রমাণ করতে যথেষ্ট।
অন্যান্য শেকসপিয়র প্রতিদ্বন্দ্বীদের আমি গুরুত্ব দেই না। তবে ক্রিস্টোফা মারলো পড়ার পর আমার মনে হয়েছে এদের মধ্যে তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা রয়েছে। মারলো ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৫৯৩ সালে খুন হন- যে বয়সে কিটস এবং আমাদের শহরতলির কবি এবারিস্তো কাররিয়েগো মারা যান। মারলোর জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।
মারলোকে 'ইউনিভার্সিটি উইট' বা বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিজীবী বলা হতো। তাঁর মানসিকতার একদল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র স্বেচ্ছায় নাটকের মতো নিম্নমানের শিল্পচর্চায় নাম লেখান। শেকসপিয়র-এর মতোই তিনিও অমিত্রাক্ষর ছন্দের (Blankverse) ভক্ত ছিলেন। মারলোর অনেক পংক্তিই শেকসপিয়র-এর চেয়ে কোনো অংশে কম দীপ্তিময় নয়। যেমন মিগেল দে উনামুনো গ্যেটের মূল ফাউস্ট-এর চেয়ে মার্লোর পংক্তিমালাকে অনেক উচ্চমানের বলে প্রশংসা করেছেন। তবে উনি সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছেন যে একটিমাত্র পংক্তির উৎকৃষ্টতা পুরো নাটকের উৎকৃষ্টতা সৃষ্টি করে না যা সত্যিই দুরূহ কাজ। গ্যেটের ফাউস্ট-এর মতো মারলোর ডকটর ফাউস্টাস নিজেকে আবিষ্কার করে হেলেন-এর (ধারণা করা হতো ট্রয়-এর হেলেন পুরাকালের প্রেতাত্মা বা অপচ্ছায়া) অপচ্ছায়ার সামনে এবং উচ্চারণ করে, 'মিষ্টি হেলেন, তোমার একটি চুম্বনে আমাকে অমর করে দাও।' এবং পরবর্তী সংলাপ, 'লাস্যময় সহস্র তারকাখচিত সজ্জায় তুমি তো সান্ধ্য-সমীরণের চেয়ে সুন্দর।' লক্ষ্য করা যায় সে বলে না 'সান্ধ্য-গগন', বলে 'সান্ধ্য-সমীরণ।' 'এই 'সমীরণ' আসলে কোপার্নিকীয় শূন্যতার অনুভব সৃষ্টি করে, সীমাহীন শূন্যতা যা রেনেসাঁর বিস্ময়কর তথ্য: আইনস্টাইন সত্ত্বেও, যে-শূন্যতায় আমরা এখনো বিশ্বাস করি, যে-শূন্যতা টলেমীয় সূত্রকে উচ্ছেদ করেছে; যে-শূন্যতা দান্তের মিলনান্তক নাট্যত্রয়ীকে অনুশাসন করে।
কিন্তু মারলোর করুণ পরিণতিতে ফেরা যাক। ষোলো শতাব্দীর শেষার্ধে স্পেন-এর প্ররোচনায় ইংল্যান্ডে ক্যাথলিক অভ্যুত্থানের ভয় ছিল। সেই সাথে লন্ডন শহরে দাঙ্গা শুরু হয়। বেশ কিছু ফ্লেমিশ এবং ফরাসি শিল্পী তখন লন্ডনে এসেছিল যাদের দোষারোপ করা হচ্ছিল এই বলে যে তারা 'পিতৃহীন শিশুদের আহার কেড়ে খাচ্ছে।' এইসব বিদেশিদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চালানো হচ্ছিল যার ফলে গণহত্যার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ঠিক সেই সময়ে রাষ্ট্র, যাকে আমরা বলি গুপ্তচর বিভাগ, এমন একটি বিভাগের প্রবর্তন করে। মারলো ছিলেন সেই বিভাগেরই একজন সদস্য। এই বিভাগ ক্যাথলিক এবং পিউরিটানদের হয়রানি করত। নাট্যকার টমাস কিডকে গ্রেফতার করা হয়েছিল যার বাসা থেকে বেশকিছু কাগজপত্র জব্দ করা হয়। এই কাগজপত্রের মধ্যে প্রায় বিশটির মতো নব্যতান্ত্রিক বা খারেজি গবেষণা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় যাদের মধ্যে কয়েকটি ছিল বেশ কুৎসামূলক। যেমন একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল যে যিশু সমকামী ছিলেন। শুধু তাই নয় বই পত্রে সমকামিতাকে সমর্থনও করা হয়েছিল। অপর একটি গবেষণায় ব্যক্ত হয়েছিল যে খ্রিষ্ট আসলে মানুষ, কখনোই ঈশ্বর ও মানুষ উভয়ই নন। অপর একটি গবেষণায় স্যার ওয়াল্টার র‌্যালে কর্তৃক আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত তামাকের স্তুতিও ছিল। র‌্যালের এই বৃত্তে মারলোও সংযুক্ত ছিলেন। র‌্যালে ছিলেন একাধারে জলদস্যু এবং ঐতিহাসিক। পরবর্তীতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। র‌্যালের বাসায় 'স্কুল অব নাইট' বলে একটি অশুভ সমাবেশ হতো।
মারলোর চরিত্রগুলো, বিশেষত যেসব চরিত্রের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ছিল, সেগুলো মূলত মারলোরই অণুবীক্ষণ। তারা নিরীশ্বরবাদী, যেমন ট্যাম্বারলেইন কোরান পুড়িয়ে দেয় এবং আলেকজান্ডার-এর মতো বিশ্ব জয় করে, যার ইচ্ছা হয় স্বর্গকেও তার অধীনস্ত করা। ফলে সে তার গোলন্দাজ বাহিনীকে নির্দেশ দেয় আকাশের দিকে কামান তাক করতে এবং শূন্যে কালো ব্যানার টাঙিয়ে ঈশ্বরের মৃত্যু ঘোষণা করতে। ডক্টর ফস্টাস আসলে রেনেসাঁ কাঙ্ক্ষার প্রতিনিধি যার ইচ্ছা সর্বজ্ঞ হওয়া। ফস্টাস প্রকৃতির বই পড়ে নৈতিকতার সন্ধানে নয় যেমনটা মধ্যযুগে প্রাণী ও উদ্ভিদবিদ্যা বা জীবজন্তু সম্পর্কে নীতিকথা সম্বলিত গল্পসংকলনে করা হয়েছে। সে এইসব বিদ্যা অর্জন করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যৌগিক উপাদান সংগ্রহের ইচ্ছায়। মারলোর 'জু অব মল্টা' লালসার অনুবীক্ষণ।
কিড-এর পাণ্ডুলিপি পুলিশ যাচাই করে দেখে তাঁর ওপর নিপীড়ন চালায়। মনে রাখতে হবে নিপীড়ন বর্তমান যুগের উদ্ভব নয়। ফলে কিড স্বাভাবিকভাবেই স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন, কারণ তাঁর জীবন ঝুঁকির মধ্যে ছিল। কিন্তু স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেন এসব পাণ্ডুলিপি তাঁর নয়, মারলোর রচনা যার সাথে তিনি এক ঘরে বসবাস করতেন যখন দু'জনে মিলে যৌথভাবে নাটক সংশোধন ও পরিমার্জন করতেন। স্টার চেম্বার নামে একটি ট্রাইবুনাল এজাতীয় অপরাধের বিচার করত। মারলোকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই ট্রাইবুনালে হাজির হতে বলা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ঈশ্বর ও ধর্মের প্রতি কটাক্ষ এবং নাস্তিকতার অভিযোগ আনা হয়। এই মামলার শুনানির দুদিন আগে ডেটফোর্ড সরাইখানায় মারলোর খুন হওয়া মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়।
দেখা যায় গুপ্তচর বিভাগের চারজন কর্মকর্তা ঐদিন ঐ সরাইখানায় গিয়ে দুপুরের খাবার খায়, বিশ্রাম নেয়, বাগানে হাঁটাহাঁটি করে, দাবা বা গুটি খেলা বা ঐ জাতীয় কিছু খেলাধুলা করে এবং খাবারের দাম মেটানো নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। মারলো এই সময়ে তাঁর চাকু বের করেন (ঐ সময়ে চাকু ব্যবহারের বেশ প্রচলন ছিল) এবং কোনোভাবে এ চাকুর দ্বারাই চোখে আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ক্যালভিন হফম্যান-এর যুক্তি অনুযায়ী যে ব্যক্তিটি ঐদিন মারা যায় সে আসলে মারলো নন, বরং বাকি তিনজনের মধ্যে একজন। ঐ যুগে মানুষকে শনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না, হাতের ছাপ নেয়া অজানা ছিল এবং ফলে একজন ব্যক্তিকে আরেকজন বলে চালিয়ে দেয়া সহজ ছিল। প্রসঙ্গক্রমে মারলো তাঁর বন্ধুদের তদানীন্তন স্বাধীন স্কটল্যান্ডে পালিয়ে যাবার কথা বলেছিলেন। হফম্যান-এর মতে মারলো স্বয়ং ঐ মৃত ব্যক্তিকে নিজ নামে চালিয়ে স্কটল্যান্ডে পালিয়ে যান। সেখান থেকেই তাঁর বন্ধু অভিনেতা-প্রযোজক উইলিয়ম শেকসপিয়রকে তাঁর নাটকের পাণ্ডুলিপি পাঠান যা বর্তমানে শেকসপিয়র-এর নামে প্রচলিত। তিনি স্কটল্যান্ড থেকে ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, ওথেলো, অ্যানটনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্টা ইত্যাদি নাটকের পাণ্ডুলিপি শেকসপিয়রকে পাঠিয়ে ছিলেন। এই তত্ত্বানুযায়ী, শেকসপিয়র-এর মৃত্যুর চার বা পাঁচ বছর আগে মারলোর মৃত্যু হয়। শেকসপিয়র তাঁর নাট্যশালা বিক্রি করে যখন নিজ গ্রাম স্ট্যাটফোর্ডে অবসরে যান তখন এইসব পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে একজন ধনী ব্যক্তি হিসেবে জীবন-যাপন করতে শুরু করেন। তখন তাঁর প্রধান বিনোদন ছিল প্রতিবেশীদের সাথে মামলাবাজি করা। এভাবেই ১৬১৬ সালে লন্ডন থেকে সাক্ষাতে আসা এক অভিনেতার সাথে মদ্যপানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
উপরোক্ত তথ্য ও তত্ত্বের বিরুদ্ধে আমার বক্তব্য হলো : যদিও মারলো খুব বড় কবি ছিলেন এবং তাঁর রচিত অনেক পংক্তিমালাই শেকসপিয়রের সমতুল্য এবং মারলোর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অনেক সমৃদ্ধ পংক্তিই শেকসপিয়র-এর সাহিত্যকর্মের চাপে হারিয়ে গেছে, তবুও দুজনের ভেতর পার্থক্যও অনেক। শেকসপিয়র-এর প্রশংসায় কোলরিজ স্পিনোজার শব্দকোষ ধার করেছেন। তিনি বলেছেন শেকসপিয়র ছিলেন স্পিনোজা যাকে বলতেন 'ন্যাচুরা ন্যাচুর‌্যানস', অর্থাৎ সৃজনশীল প্রকৃতি। এটি এমন একটি শক্তি যা পৃথিবীর সকল বস্তুকে ধারণ করতে সক্ষম, যেমন পাথরের নিচে চাপাপড়া মৃত কোনো কিছু, কিংবা উদ্ভিদের গভীরে সুপ্ত কিছু, প্রাণীর ভেতরে প্রোথিত স্বপ্ন যা তাৎক্ষণিক জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে এবং পৌঁছে দেয় এক সজ্ঞান অনুভূতিতে কিংবা মানুষের অপরাপর সচেতনতায়। একেই বলা যায় 'ন্যাচুরা ন্যাচুর‌্যানস'।
হ্যাজলিট বলেছেন, বিশ্বের সমগ্র মানবকুলের সন্ধান মিলবে শেকসপিয়র-এ। অর্থাৎ নিজেকে বহুতে পরিণত করার অপূর্ব ক্ষমতা শেকসপিয়র-এর ছিল। শেকসপিয়রকে স্মরণ করার অর্থ একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্মরণ করা। অপর দিকে মারলোর সাহিত্যকর্মে আমরা সবসময়ই পাই একক কেন্দ্রীয় চরিত্র : বিজেতা ট্যাম্বারলেইন; লোভী বারাবাস ; বিজ্ঞানমনস্ক ফস্টাস। অন্যান্য চরিত্রগুলো শুধুমাত্র অতিরিক্ত, প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু শেকসপিয়র-এ সকল চরিত্রই সমভাবে দৃশ্যমান, এমনকি আনুষঙ্গিক চরিত্রও। সেই যে ওষুধ প্রস্তুতকারী যে রোমিওর কাছে বিষ বিক্রি করে সেও বলে, 'মন নয়, আমার দারিদ্র্য আমাকে রাজি করিয়েছে' এই গরল বিক্রি করতে। শুধু এই বাক্যাবলিই তাকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে আর এখানেই শেকসপিয়র মারলোকে ছাড়িয়ে গেছেন।
ফ্র্যাঙ্ক হ্যারিসকে লেখা এক চিঠিতে বার্নার্ড শ' লিখেছিলেন, 'শেকসপিয়র-এর মতোই আমি সাধারণ এবং অস্তিত্বহীন।' আর এখানেই আমরা পরিচিত হই সত্যিকারের শেকসপিয়র রহস্যের সাথে : আমাদের কাছে তিনি বিশ্বের সবচাইতে দৃশ্যমান ব্যক্তিদের একজন কিন্তু নিশ্চিতভাবে তাঁর সমসাময়িকদের কাছে তিনি ছিলেন অদৃশ্য। এখানে সের্বান্তেস-এর বিষয়টি পুনরুত্থাপিত হয়। লোপে দে ভেগা লিখেছেন, 'মিগেল দে সের্বান্তেসকে প্রশংসা করার মতো নির্বোধ কেউ নেই।' গ্রাসিয়ান তাঁর 'Agudeja y arte de ingenio'তে (উইট অ্যান্ড দ্য আর্ট অব জিনিয়াস) কিহোতে-এর ভেতর উল্লেখ করার মতো একটিও উদ্ভাবন-চাতুর্যের সন্ধান পাননি। কেবেদো তাঁর এক বীরগাথায় তাৎক্ষণিকভাবে দন কিহোতে-এর মেদহীনতার ইঙ্গিত দিয়েছেন মাত্র। এতেই বোঝা যায় তাঁর সমসাময়িকদের কাছে সের্বান্তেস ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। এমন কি লেপান্ত যুদ্ধে তাঁর সামরিক কর্মকাণ্ড এমন দারুণভাবে বিস্মৃত হয়েছিল যে তিনি নিজেই জনগণকে স্মরণ করাতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ঐ যুদ্ধে তিনি একটি বাহু হারিয়েছিলেন।


চিত্রকর্ম: ক্রিস ওফেলির আঁকা ওথেলো
তাঁর 'মিষ্টি সনেট'-এর এক দুর্বোধ্য প্রশংসা ব্যতিরেকে শেকসপিয়রকে সমসাময়িকরা তেমন পাত্তা দিয়েছিল বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হলো, সম্ভবত শেকসপিয়র নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন প্রাথমিকভাবে নাটক রচনায়। তাঁর সনেটসমূহ এবং অনিয়মিত কবিতা রচনা, যেমন 'দ্যা ফিনিক্স অ্যান্ড দ্য টার্টল' অথবা 'দ্যা প্যাশোনেট পিলগ্রিম' ছিল তাঁর গৌণ কর্মকাণ্ড। প্রতিটি যুগে কোনো না কোনো সাহিত্য শাখা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। আজকের যুগে যে লেখক উপন্যাস লেখেননি তাঁকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় কখন তিনি সেটি লিখবেন। (আমাকে সীমাহীনভাবে এই প্রশ্ন করা হয়ে থাকে।) শেকসপিয়র-এর যুগে সাহিত্যকর্মের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ প্রদর্শনের বিষয় ছিল বিশাল মহাকাব্য রচনা। এই ধারণা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল যখন আমরা ভলতেয়ারকে পেয়েছি। যদিও মহাকাব্যের মেধা তাঁর ছিল না, তিনি মহাকাব্য রচনা করেছিলেন সমসাময়িকদের কাছে নিজেকে সত্যি অর্থে পণ্ডিত বলে হাজির করতে।
আমাদের যুগে চলচ্চিত্রের কথাই ভাবুন। চলচ্চিত্রের বিষয়টি মনে এলেই আমরা সবসময় নায়ক-নায়িকাদের কথা ভাবি। আমি স্বয়ং প্রাচীনপন্থীদের মতো মিরিয়াম হপকিন্স এবং ক্যাথরিন হেপবার্ন-এর কথা স্মরণ করি, যদিও সাম্প্রতিক অনেকেরই নাম এর মধ্যে যোগ করা যায়। চলচ্চিত্রের সাথে নির্দেশকদের কথাও মনে উঠে আসে। যেমন আমার স্মরণ হয় জোসেফ ফন স্টার্নবার্গ-এর কথা যাঁকে আমি সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্দেশক বলে বিবেচনা করি। বা অতি সাম্প্রতিক কালের অরসন ওয়েলস বা হিচককের কথাও বলা যায়। এঁদের মাঝে আপনি আরো অনেক নাম ঢোকাতে পারবেন। কিন্তু আমরা কখনো চিত্রনাট্য লেখকের কথা ভাবি না। 'দ্যা ড্র্যাগনেট', 'আন্ডারওয়ার্ল্ড', 'স্পেকটার অব দ্য রোজ' নির্দেশক সার টমাস ব্রাউন-এর কথা আমি সবসময়ই মনে করি। কিন্তু এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রশংসিত চিত্রনাট্য রচয়িতা বেন হেকটকে আমার মনে পড়েছে মাত্র কদিন আগে তাঁর মৃত্যুর কারণে।
ঠিক এমনটাই ঘটেছে শেকসপিয়র-এর যুগে নাটকের ব্যাপারে। নাটক তখন অভিনয় কোম্পানির মালিকানায় থাকত, রচয়িতার নয়। প্রতিটি মঞ্চায়নের সময় যুগের হাওয়ার সাথে মিলিয়ে নতুন দৃশ্য সংযোজন হতো। বেন জনসন যখন গভীর আবেগের সাথে তাঁর নাট্যসমগ্র 'সাহিত্যকর্ম' নামে প্রকাশ করেন তখন সবাই হাসি-ঠাট্টা করেছিল। 'এ আবার কেমন সাহিত্যকর্ম ?' সবাই প্রশ্ন করেছে। 'এত শুধু বিয়োগান্তক আর মিলনান্তক নাটক।' 'সাহিত্যকর্ম' তো গীতিকবিতা বা মহাকাব্য অথবা শোকগাথা, নাটক কখনোই তা নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শেকসপিয়রকে তাঁর সমসাময়িকরা শ্রদ্ধা জানায় নি। তিনি লিখেছিলেন অভিনেতাদের জন্যে।
আর একটি রহস্য রয়েছে। শেকসপিয়র নাট্যশালা বিক্রি করে তাঁর গ্রামের বাড়িতে অবসর জীবন কাটাতে কেন গেলেন এবং কেনই বা তাঁর রচিত বর্তমান যুগের মানবসমাজের দ্যুৎতিময় সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হলেন ? মহান লেখক ডি কুইন্সি এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে : শেকসপিয়র-এর কাছে প্রকাশনার অর্থ মুদ্রণ ছিল না। শেকসপিয়র নাটক পড়ার জন্য লেখেন নি, অভিনীত হবার জন্যে লিখেছেন। নাটক ক্রমাগত মঞ্চায়িত হয়েছে এবং সেটাই তাঁর জন্যে যথেষ্ট ছিল। অপর এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হলো, অভিনয়-মঞ্চের তাৎক্ষণিক উদ্দীপনার প্রয়োজন ছিল শেকসপিয়র-এর। অর্থাৎ যখন তিনি হ্যামলেট বা ম্যাকবেথ রচনা করেছেন তখন তিনি তাঁর সংলাপের বাক্যগুলো কোনো না কোনো অভিনেতার সাথে খাপখাইয়ে নিয়েছেন। কেউ একজন বলেছিলেন শেকসপিয়র-এর নাটকে কোনো অভিনেতার গান করার অর্থ সেই অভিনেতা বাস্তবেও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে এবং গান করতে জানত। এই পারিপার্শ্বিক উদ্দীপনা শেকসপিয়র-এর প্রয়োজন ছিল। গ্যেটে অনেক পরে বলেছেন সব কাব্যই পারিপার্শ্বিকের ফলশ্রুতি। অভিনেতা বা মঞ্চ দ্বারা উদ্দীপিত না হলে শেকসপিয়র লেখার প্রয়োজন অনুভব করতেন না। আমার মতে এটিই সবচাইতে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। গ্রাউসাক বলেছেন, অনেক লেখকই আছেন যাঁরা সাহিত্যকর্মের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। তাঁরা সাহিত্যকর্মকে অসাড়ত্বের আধার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাহিত্যের লোক হয়ে স্বয়ং সাহিত্যে বিশ্বাস করেননি। কিন্তু গ্রাউসাক মনে করেন এই যে তাঁদের অবজ্ঞা এবং অবিশ্বাসের মানসিকতা এসবই শেকসপিয়র-এর নীরবতার সাথে কোনোক্রমেই তুলনীয় নয়। শব্দের রাজা শেকসপিয়র প্রান্তিক বয়সকালে প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন তাঁর নিরবতার মাধ্যমে যে সাহিত্য নিরর্থক, এমন কি সেই নিরর্থকতার বক্তব্য কণ্ঠে উচ্চারণ পর্যন্ত করলেন না। একেই বলা যায় অতিমানবিকতা।
আমি আগেই বলেছি বেকন-এর পরিচ্ছন্ন ইতিহাস সচেতনতা ছিল। শেকসপিয়র অন্যদিকে তাঁর সকল চরিত্র তা সে হ্যামলেট-এর মতো ডেনীয়, ম্যাকবেথ-এর মতো স্কটল্যান্ডীয়, এবং গ্রিক, রোমান অথবা ইতালীয়ই হোক– সবাইকেই তিনি তাঁর সমসাময়িক রূপেই চিত্রি করেছেন। শেকসপিয়র মানবচরিত্রের বৈচিত্র্য ধরতে পেরেছিলেন কিন্তু যুগের পরিধিটা বুঝতে সক্ষম হননি। তাঁর কাছে ইতিহাসের অস্তিত্ব ছিল না, কিন্তু বেকন-এর কাছে ছিল।
শেকসপিয়র-এর জীবন দর্শন কী ছিল? বার্নার্ড 'শ শেকসপিয়র-এর বিশাল সাহিত্যকর্ম থেকে বিষয়টি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে শেকসপিয়র জীবনকে দেখেছেন দুর্বহ, অলীক এবং মায়া হিসেবে। এর পরিচয় মেলে এসব সংলাপের মাধ্যমে 'আমরা তো আসলে স্বপ্নের উপাদানে তৈরি', কিংবা জীবন তো 'এক নির্বোধের বলা গল্প।' জীবন তো ফাঁপা ধ্বনি আর উত্তেজনায় ভরপুর যার কোনো অর্থ নেই', কিংবা এরও আগে তিনি যখন মানুষকে অভিনেতার সাথে তুলনা করেন যার ভেতর দ্বৈত অভিনয়ের কথা লুকানো ছিল কারণ যে রাজা এই সংলাপ বলছে, সেই ম্যাকবেথও একজন অভিনেতা– বড়ই দুর্বল অভিনেতা: 'মঞ্চের ওপর শুধু-শুধু দাপা-দাপি করেই সময় কাটায় কিন্তু বক্তব্যের নেই কোনো সারবত্তা।' কিন্তু একথাও সম্ভবত সত্যি যে এসব কিছুতে শেকসপিয়র-এর কোনো প্রত্যয় ছিল না। এ তাঁর অভিনেতাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতি মাত্র। অন্য অর্থে, শেকসপিয়র-এর কাছে জীবন সম্ভবত নিরর্থক দুঃস্বপ্ন ছিল না, কিন্তু ম্যাকবেথ-এর কাছে ছিল যখন তার বোধোদয় হলো ভাগ্য এবং ডাইনিরা তাকে প্রতারণা করেছে।

এই পর্যায়ে আমরা শেকসপিয়র রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছি আর সেটি হলো সব সাহিত্যকর্মের রহস্যময়তা। বার্নার্ড শ'-র কাছে ফিরে যাই। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি বিশ্বাস করেন কি না বাইবেল পবিত্র আত্মার রচনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন পবিত্র আত্মা শুধু বাইবেলই রচনা করেননি, বিশ্বের সকল গ্রন্থই তাঁর রচনা। আমরা আজকাল পবিত্র আত্মার কথা আর বলি না। আমাদের এখন ভিন্ন পুরাণতত্ত্ব রয়েছে। আমরা বলি একজন লেখক অবচেতন মনে বা বলা যায় অবচেতন ও অবতেনতার যৌথ প্রভাবে তার লেখা লেখে। হোমার এবং মিলটন বাক্যলক্ষ্মীতে বিশ্বাস করতেন। যেমন হোমার বা হোমারজাতীয় কবিরা লিখেছেন : 'গেয়ে ওঠো ও কাব্যলক্ষ্মী অ্যাকিলিজ-এর রোষানল সংগীত।' এঁরা সবাই এক ধরনের শক্তিতে বিশ্বাস করতেন যাঁর আদেশে তাঁরা শ্রুতিলিখন লিখেছেন। মিল্টন তো সরাসরি পবিত্র আত্মার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা সবাই দৃঢ় বিশ্বাস করতেন তাঁদের লেখার ভেতরে লেখকের নিজ ইচ্ছার অতীত আরো অনেক কিছু রয়েছে। কিহোতে-এর শেষ পৃষ্ঠায় সের্বান্তেস বলছেন তাঁর মূল উদ্দেশ্য নারীসেবা বা বীরব্রতকে প্রশংসা করে লেখা গ্রন্থকে ব্যঙ্গ করা। এর দু'টি ব্যাখ্যা হতে পারে : আমরা ধরে নিতে পারি সের্বান্তেস একথা বলেছেন এটা বোঝানোর জন্য যে তাঁর অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল অথবা তিনি যা বলেছেন তা আক্ষরিক অর্থেই বলেছেন এবং তাঁর দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, অর্থাৎ সের্বান্তেস তাঁর অজান্তেই এমন একটি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন যা মানব সমাজ কখনো ভুলবে না। তিনি কিহোতে লিখেছেন তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে যা তিনি পার্সিলস-এ করেন নি। শেষোক্তটি রচনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল শুধুমাত্র সাহিত্য সৃষ্টি। এর মধ্যে তাঁর অন্তরের জটিলতা এবং গোপনীয়তা ছিল না। শেকসপিয়রও সম্ভবত মানসিক বিহ্বলতার সাহায্য পেয়েছেন– আসলে মানসিক বিভ্রান্তি বা বিহ্বলতা মহৎ শিল্প সৃষ্টির সহায়ক উপাদান। মহৎ শিল্প সৃষ্টির কাঙ্ক্ষা লেখককে আবিষ্ট করে, নিজেকে অতিমাত্রায় সতর্ক অবস্থানে নিয়ে যায়। সম্ভবত নান্দনিক সৃষ্টিকর্ম স্বপ্নাবিষ্ট করে এবং এই স্বপ্নে প্রবেশ তার ইচ্ছাধীন নয়। শেকসপিয়র-এর ক্ষেত্রে সম্ভবত ঠিক তাই ঘটেছিল।
আর একটা বিষয় হলো, শেকসপিয়র-এর সাহিত্যকর্ম তাঁর পাঠকদের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে কোলরিজ, হ্যাজলিট, গ্যোটে, হাইনে, ব্র্যাডলি এবং হুগো শেকসপিয়রকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং ভবিষ্যতের পাঠকরাও ঠিক এ কাজটিই করতে থাকবে। সম্ভবত একজন প্রতিভাবান লেখকের লেখার সংজ্ঞা হলো :প্রতিভাবান লেখকের লেখালেখি প্রতিটি প্রজন্মই সামান্য বা অসামান্যভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করে। বাইবেলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কেউ একজন বাইবেলকে বাদ্যযন্ত্রের সাথে তুলনা করেছে যার সুর বাঁধা অসীমের সাথে। আমরা শেকসপিয়র-এর সাহিত্যকর্ম পড়তে পারি, কিন্তু শত, হাজার বা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যতদিন অস্তিত্ব থাকবে সেই লক্ষ-কোটি বছর পরে কীভাবে পড়া হবে তা আমরা জানি না। কেবল এটুকু বলতে পারি শেকসপিয়র অসীম এবং শেকসপিয়র-রহস্য শুধুমাত্র বিশাল রহস্যের একটি অংশ। শিল্পকর্ম আসলে এক সীমাহীন রহস্যের সামান্য কণা আর সেই সীমাহীন রহস্যটি হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।

এলিয়ট ওয়েইনবার্গারের ইংরেজি তর্জমা অবলম্বনে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক