আফগানিস্তানের এ পরিণতির জন্য দায়ী কে?

মূল: পারভেজ হুদভয়; অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী
Published : 17 August 2021, 06:00 PM
Updated : 17 August 2021, 06:00 PM

পিবিএস নিউজ আওয়ার-এ দেওয়া তার শেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ঠিকই বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 'সত্যিই আফগানিস্তানে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে', এবং যথার্থই তিনি আফগানিস্তানে মার্কিনি অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু আফগান গণমাধ্যমকে দেওয়া দ্বিতীয় আর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি অস্বীকার করেন যে পাকিস্তান তালেবানদের পক্ষের কণ্ঠস্বর। এ কথাটিও কৌশলগতভাবে সত্য। কিন্তু কাউকে যদি তার নৈতিক কম্পাস দৃঢ় রাখতে হয়, তবে তাকে স্বীকার করতেই হবে যে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই আজকের পরিস্থিতি তৈরি করেনি। অন্যান্য দেশ, বিশেষত পাকিস্তানও, আজকের এ আফগান ট্র্যাজেডি বা বিষাদময় পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

চলুন, ফিরে যাই সেই সময়টায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্ভবত 'পারস্য উপসাগরের তপ্ত জলরাশি'র দিকে চোখ রাখছিল। ১৯৭০-এর দশকে 'পারস্য উপসাগরের তপ্ত জলরাশি' বাক্যবন্ধটি বলতে গেলে অহরহ ও সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছিল। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান দখলের পর বলা হয়েছিল যে এরপরই আক্রান্ত হবে পাকিস্তান। রোনাল্ড রিগ্যানের মতে, ঈশ্বরহীন, নাস্তিক কম্যুনিস্টদের 'শয়তানের সাম্রাজ্য' পৃথিবী বিজয়ে নেমেছিল এবং তাদের অবশ্যই থামাতে হবে। সহমত, বলেছিলেন জেনারেল জিয়াউল হক, নয়তো পাকিস্তান এবং ইসলাম মারাত্মকভাবে বিপণ্ণ  হবে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানও সোভিয়েত আগ্রাসনের মুখোমুখি হবার বিপদগ্রস্ত- এমন কথা ছিল আসলে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার। একটি পতনোন্মুখ অর্থনীতির সোভিয়েতদের পক্ষে আর কোথাও অগ্রসর হওয়াটা কঠিন ছিল, এমনকি উপকূল বরাবর ৮০০ কিলোমিটারের চেয়ে কম জায়গাতেও তাদের পক্ষে আর এগোনো সম্ভব ছিল না।

আর ইতিহাসের চূড়ান্ত কৌতুকটি দেখুন- যখন সেই একই 'ঈশ্বরহীন কম্যুনিস্ট'দের সামান্য পরিবর্তিত একটি শাখা অবশেষে সেই পারস্য উপসাগরের 'ঈপ্সিত জলরাশি'তে পৌঁছাতে পারল, তখন মাথার উপর কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়েনি। বরং একটি গভীর আগ্রহোন্মুখ ও ইচ্ছুক পাকিস্তান লাল গালিচা বিছিয়ে দিল যার ওপর দিয়ে হেঁটে চৈনিকেরা গোয়াডার পর্যন্ত নেমেছিল।

জেনারেল জিয়াউল হকের সে ভয়ানক ঘোষণাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে দেখা গেল যে ইসলাম কম্যুনিস্টদের কাছে ঠিকই নিরাপদ, যদিও উইঘুর মুসলিমরা নয়। রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ট্র্যাজেডির জন্য সম্যক দায়ী বটে, তবে পাকিস্তানও এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই নিষ্পাপ নয়।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন আসার পর, আমরা সবাই জানি যে কী ঘটেছিল। ইসলামাবাদের পাকিস্তানি দূতাবাস গোটা মুসলিম বিশ্ব থেকে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়োগ দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম, গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, প্রচুর অর্থায়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম পেয়ে, পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক জিহাদ পরিচালনায় সিআইএ-কে সাহায্য করেছিল। এ অভিযানের এক যুগ পরে, গোঁফ মোচরাতে মোচরাতে এবং সাংবাদিকদের সামনে প্রস্তুতি নিতে নিতে আইএসআই প্রধান জেনারেল হামিদ গুল সারা পৃথিবীর কাছে দম্ভ ভরে বলেছিলেন, তিনি এবং তার বাহিনীই সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়েছে।

এবার আমাদের একটু অনুমান করতে দিন যে পাকিস্তান যদি আমেরিকাকে তার শীতল যুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দিতে সঙ্গী হবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিত, তবে কী হতো? পাকিস্তান যদি প্রতিরোধকারী শক্তিগুলোকে তৈরি করা, অস্ত্র ও রসদ জোগানো এবং সংগঠিত হবার সুযোগ দেবার বদলে বিনা বাক্য ব্যয়ে সোভিয়েত আগ্রাসনকে চলতে দিত, তাহলে কী হতো? এমন 'কিন্তু…যদি…তবে' জাতীয় প্রশ্নমালা এ মুহূর্তে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন যখন কিনা আফগানিস্তানে প্রলয় মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে। সম্ভাব্য যা হতে পারত বা হত সেটা হলো: আজকের এই দশ থেকে বিশ লাখ মৃত মানুষ এবং ধ্বংসস্তুপের মত একটি দেশের বদলে আফগান কম্যুনিস্ট এবং ১৯৭৮ সালের এপ্রিলের 'সাউর বিপ্লবে'র বিপ্লবীরা পরবর্তী দুই-তিন বছরের মাথায় নিজেরাই নিজেদের ভেতর নানা কলহে ধ্বংস হয়ে যেতেন এবং বড়জোর সব পক্ষের সৈনিক মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষই না হয় মারা যেত।

'খালকা' এবং 'পারচাম' নামে দু'টো কম্যুনিস্ট পার্টিরই শহরগুলোর বাইরে তেমন কোন জনসমর্থন ছিল না এবং আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই রাষ্ট্রপতি দাউদের বিরুদ্ধে করা 'ক্যু দেতা'-র বিরোধী ছিলেন। এছাড়াও 'খালকা' এবং 'পারচাম' নামে দুই কম্যুনিস্ট পার্টিই পরষ্পরের ভেতরে পাগলের মত লড়াইয়ে মত্ত থাকতো। পারচামের ভেতর প্রধান হয়ে উঠেছিলেন উন্মাদ প্রকৃতির খুনি হাফিজুল্লাহ আমিন। পার্টির ভেতরে তার কর্তৃত্ব চলেছিল মাত্র তিন মাস।

তবে, আফগানিস্তানকে এমন পরিস্থিতিতে একা থাকতে দেওয়া হয়নি। 'খালকা' এবং 'পারচামে'র ভেতর ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, তখন মস্কো 'পারচাম' থেকে বারবাক কারমাল নামে এক নতুন নেতাকে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে এবং এভাবেই পতনোন্মুখ বিপ্লবকে সাহায্য করার নামে হস্তক্ষেপ করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের এ হস্তক্ষেপ লাল সংকেতের বাণী বয়ে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বসলো যে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু যে, এর পতন আরও অনেকের পতন ডেকে আনবে। তবে, বাস্তবে, আমেরিকা বুঝতে পেরেছিল যে রাশিয়া আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তার মসৃণ নিম্ন নাভিকেই উন্মুক্ত করেছে এবং আক্রমণের এই তো সময়। যুদ্ধ শুরু হলো।

১৯৮৫ সাল নাগাদ ক্লান্ত সোভিয়েতরা আফগানিস্তান ছাড়তে রাজি হলো। রিগান প্রশাসনের 'মন্দ লোকগুলো' (একবাল আহমেদের বয়ান অনুযায়ী) যাদের ভেতর ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব রিচার্ড পারলে মনে করলেন, আফগানিস্তানই সেই জায়গা যেখানে রুশদের ভাল মতো শিক্ষা দেওয়া যাবে। রিগান প্রশাসনের এ মন্দ লোকগুলোই হয়ে উঠলেন ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং তারপরই রাশিয়ার 'আলকাতরা মাখা শিশু' হিসেবে আফগানিস্তানের প্রলয় কাহিনীর চক্কর যেন সম্পূর্ণ হলো। ইতোমধ্যে, পাকিস্তান আফগানিস্তানের কারণে হুট করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা পৃথিবীর কাছে তার বর্ধিত গুরুত্ব এবং বিমান বোঝাই টাকা যা আসছিল, দুইটার-ই স্বাদ উপভোগ করতে শুরু করে। পাকিস্তানি জেনারেল জিয়া সুনির্দিষ্টভাবেই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা শুরুর জন্য সোভিয়েত আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেন।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের পরাজয়ের পর বিজয়গর্বে উদ্দীপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধ্বংসস্তুপ দেশটি থেকে বিদায় নিল। তাদের শীতল যুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী তো হেরেই গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাবেইনি যে মুজাহিদিনরা- যাদের কিনা রিগ্যান নিজে হোয়াইট হাউসে এত আগ্রহের সাথে স্বাগত জানিয়েছেন- দ্রুতই একটি প্রাণনাশী 'ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট' হিসেবে বিকশিত হবে। সেই ঘাতক বীজাণু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারকে গুঁড়িয়ে দেবে এবং আমেরিকাকে আবার তড়ি-ঘড়ি সে আফগানিস্তানেই ফিরতে হবে। আর জোরে ঘোষণা দিতে হবে যে আফগানিস্তানকে তারা 'সভ্য' করবে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে ব্যবহৃত সেই মুজাহিদিন চরমপন্থিদের তারা ধ্বংস করবে। কিন্তু আজ কুড়ি বছর পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তাদের লড়াইয়ের মনোবল হারিয়ে ফেলেছে এবং তার সুনাম টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পর রীতিমতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পশ্চাদাপসরণ করছে। অনেকেই হয়তো বলবেন যে ঠিক আছে। কেউ কেউ বলবেন যে প্রকৃতপক্ষে সামান্য হলেও ন্যায়বিচার হয়েছে।

কিন্তু আসলে কী হয়েছে? আফগানিস্তানকে এমন অশ্লীল তাড়াহুড়া করে পরিত্যাগ করাটা খোদ নরকের রাস্তাকেই খুলে দিচ্ছে। বড় শহরগুলোর পতনের সাথে সাথে আর এমনটা আশা করা ঠিক হবে না যে ১৯৯৬ সালের চেয়ে অবস্থা এতটুকু ভাল হবে যখন কাবুলের ল্যাম্প-পোস্টগুলো থেকে শবদেহগুলো ঝুলেছে, পুরুষদের বাধ্যতামূলকভাবে দাড়ি রাখতে হয়েছে এবং নামাজ পড়তে হয়েছে, নারীদের জোর করে বোরখার ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং মেয়েদের শিক্ষা স্তব্ধ করা হয়েছিল।

রাশিয়া এবং আমেরিকাই আফগানিস্তানের আজকের ট্র্যাজেডির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। তবে প্রবাদে যেমন বলে যে হাতিরা যখন মারামারি করে, তখন পায়ের নিচের ঘাস মথিত হয়। তবে পাকিস্তানকেও এতে পুরো দায়মুক্তি দেওয়া যায় না। জেনারেল মির্জা আসলাম বেগকে পরিকল্পনার মূল স্থপতি হিসেবে রেখে, পাকিস্তানের আফগান নীতি একমুখীভাবে ভারতের বিরুদ্ধে গভীর কৌশলগত লড়াইয়ের অভিমুখ খুঁজে ফিরেছে। দশকের পর দশক ধরে তালেবান নেতাদের, যোদ্ধা এবং তাদের পরিবারগুলোকে বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পাকিস্তানে আশ্রয়ের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। কাজেই আজ যদি আমরা সব দায় অস্বীকার করি তবে কেউ আমাদের বিশ্বাস করবে না।

আফগানিস্তানকে যদি কখনো একটি সভ্য দেশ হতে হয়, তবে অবশ্যই এই দেশটিকে মৌলিক ইসলামী মূল্যবোধের পাশাপাশি মতামতের স্বাধীনতা, নির্বাচন, ক্ষমতা বণ্টন এবং মানবাধিকারকে অনুমতি দেয় এমন একটি সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। বুনো চোখের মানুষেরা যারা জোর করে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা দেশটিকে একটি দূর্যোগ থেকে আর একটি দূর্যোগের দিকে নিয়ে যাবে।

আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানি তালেবান- যারা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের 'আর্মি পাবলিক স্কুল'-এ শিশুদের হত্যা করেছে- এরা পরষ্পর ভাবাদর্শিক ভ্রাতা। একজন যখন কাবুল দখল করে, অন্যজন ইসলামাবাদ দখল করতে যায় এবং নিজেকে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুখী রাখতে চায়। দ্বিতীয় আর একটি তালেবান সরকারের বদলে পাকিস্তানের দীর্ঘকালীন স্বার্থ আফগানিস্তানে একটি সংবিধান-ভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবার মাধ্যমেই রক্ষিত হবে।
(পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে নিবন্ধ আকারে প্রকাশ।)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক