ফের্নান্দো পেসোয়ার অন্তর্ধান নাটিকা: শূন্যতার কণ্ঠস্বর

জ্যোতির্ময় নন্দী
Published : 19 July 2022, 06:57 AM
Updated : 19 July 2022, 06:57 AM


মূল: অ্যাডাম কির্শ
বাংলা তর্জমা: জ্যোতির্ময় নন্দী

নাম থেকে যদি কোনো লেখকের পালিয়ে যাওয়ার পরিচয় পাওয়া যায়, তবে তিনি হলেন ফার্নান্দো পেসোয়া। পর্তুগিজ ভাষায় পেসোয়া (Pessoa) মানে হল 'ব্যক্তি', এবং সবচেয়ে কম যে-জিনিসটি পেসোয়া জীবনে চেয়েছেন, সেটা হল ব্যক্তিমানুষ হয়ে ওঠা। কবিতা এবং গদ্য উভয় ক্ষেত্রেই পেসোয়া অস্বীকার করেছেন কোনো ধরনের ব্যক্তি হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা। তিনি একটি কবিতায় লিখেছেন, "আমি নিজেকে চিনতে শুরু করেছি। আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমি যা হতে চাই এবং অন্যরা আমাকে যা বানিয়েছে, আমি তার মধ্যেকার ব্যবধান।… ওটা আমি, সময়কাল।"

তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ' অস্থিরতার পুস্তক' (দি বুক অফ ডিসকোয়াইয়েট) হল সূক্তি আর স্মৃতিচারণের একটি কোলাজ, যা তিনি বছরের পর বছর ধরে লিখে গেছেন একটি উপন্যাসতুল্য দিনলিপির আকারে, কিন্তু কখনও শেষ করেননি, প্রকাশ করেছেন আরো কম। এ বইয়ে পেসোয়া বার বার একই থিমে ফিরে আসেন: "এসব ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোগবিচ্ছিন্ন অভিব্যক্তির মধ্যে দিয়ে আমি আমার ঘটনাবিহীন আত্মজীবনীর, আমার জীবনহীন ইতিহাসের উদাসীন কথক। এগুলি আমার স্বীকারোক্তি এবং আমি যদি সেগুলিতে কিছু না বলি, তবে সেটা আমার বলার কিছু নেই বলেই।"

এটা একটা সৃজনশীল কাজের আপোষহীন ভিত্তি বলে মনে হতে পারে, যেটাকে এখন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বলে বিবেচনা করা হয়। একজন লেখক যদি কিছুই না হন, কিছুই না করেন, এবং তাঁর বলার মতো কিছুই না থাকে, তাহলে তিনি কী নিয়ে লিখতে পারেন? কিন্তু প্রায় কিছুই না থেকে বিস্ফোরিত হয়ে বিগ ব্যাং যেমন একটা মহাবিশ্ব তৈরি করেছে, একইভাবে দেখা গেছে, পেসোয়ার কল্পনার বিস্তারশক্তির জন্যেও কাঁচামালের প্রয়োজন ছিল খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিককার জ্যাকোমো লিওপার্দি থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর স্যামুয়েল বেকেট পর্যন্ত ইউরোপীয় লেখকদের একটি বিশিষ্ট ধারার অন্তর্গত, যাদের জন্য শূন্যতা ছিল একটি জাদুঘরের মতো। সমস্ত কৃতিত্বের চ‚ড়ান্ত নিরর্থকতা, একাকিত্বের প্রতি মুগ্ধতা, দুঃখ যেভাবে বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিকে বিভিন্ন রঙ দেয়– এসব প্রিয় বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি লাভের জন্যে পেসোয়াকে উচ্চমূল্য দিতে হয়েছিল, তবে অন্য কোনো উপায়ে এগুলো পাওয়াও তো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি লিখেছেন, "একজনের ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে তবেই খুঁজে নিতে হয়– বিশ্বাস নিজেই নিয়তির সেই চেতনায় অবদান রাখে।"

পেসোয়ার জীবনের কথা সংক্ষেপে বলা যাক। তিনি ১৮৮৮-তে লিসবনে জন্মগ্রহণ করেন, এবং তাঁর সৎবাবা ডারবানে পর্তুগিজ কনসাল নিযুক্ত হলে সাত বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান। সেখানে তিনি ইংরেজিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন, স্কুলে নিজের লেখা রচনাগুলোর জন্য পুরস্কার জেতেন, এবং সারা জীবন ইংরেজিতে পদ্য লেখেন। ১৯০৫ সালে তিনি লিসবনে ফিরে আসেন, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য। তবে দুবছরের মাথায় এক ছাত্র ধর্মঘটে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেলে পেসোয়া বিশ^বিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে দেন।

নিজের বাকি জীবনের জন্য তিনি আত্মনিবেদিতভাবে নিয়োজিত হন পড়াশোনা আর লেখালেখির কাজে। খাওয়াপরার খরচ চালানোর জন্যে তিনি ব্যবসায়িক চিঠিপত্রের একজন ফ্রিল্যান্স অনুবাদক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি কখনোই বিয়ে করেননি, এবং জীবনীকাররা যখন তাঁর যৌনজীবন সম্পর্কে নানা অনুমান করার চেষ্টা করেছেন, বাস্তবে সম্ভবত কোনোরকমের যৌন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাঁর সারা জীবন কেটেছে। একটা কবিতায় তিনি লিখেছেন, "আমি কখনই তেমন কেউ ছিলাম না, যে প্রেমে বা বন্ধুত্বে / একটি লিঙ্গকে অন্যটির চেয়ে বেশি পছন্দ করেছে।" তিনি একটি বিখ্যাত সাময়িকী অর্ফিউ-সহ বেশ কয়েকটি সাহিত্যিক উদ্যোগের সাথে জড়িত ছিলেন। অর্ফিউ ম্যাগাজিনটির সাকুল্যে মাত্র দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু তারপরও এটাকে পর্তুগালে আধুনিকতার প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। নিজের জীবদ্দশায় তিনি মাত্র একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। 'বার্তা' নামের এ বইটি হল পর্তুগিজ ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত কবিতাবলীর সংকলন, যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। লিসবনের সাহিত্য জগতে তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু ১৯৩৫-এ যখন তিনি মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে মারা যান, তখনও তাঁর বলার মতো কোনো বড় অর্জন ছিল না। মনে হতে পারে যে, তাঁর ইতিহাস এক 'জীবনীবিহীন ইতিহাস"।

কিন্তু পেসোয়ার একটি অসাধারণ পরজীবন পাওয়ার ছিল, যেমনটা তিনি তাঁর 'যদি আমি তরুণ বয়সেই মরে যাই' নামের কবিতায় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: "শিকড় মাটিতে লুকিয়ে থাকতে পারে / কিন্তু তাদের ফুলগুলি ফোটে খোলা হাওয়ায় যাতে সবাই দেখতে পায়। / এটাও নিশ্চয় তাই হবে. কিছুতেই তাকে ঠেকানো যাবে না।" তিনি মারা যাওয়ার সময় তাঁর জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল একটি বড় ট্রাঙ্ক, যেটার মধ্যে ছিল পঁচিশ হাজারেরও বেশি হাতে লেখা পৃষ্ঠা, যা একটি সম্পূর্ণ জীবনকালের প্রায় উন্মাদতুল্য উৎপাদনশীলতার ফসল। তাঁর রচনাবলীর নেতৃস্থানীয় ইংরেজি অনুবাদকদের অন্যতম রিচার্ড জেনিথ যেমনটা বলেছেন: পেসোয়া লিখেছেন "আলগা কাগজে, নোটবইয়ে, যেখানে কাজ করতেন সেই ফার্মের খাতাপত্রে, চিঠির পেছনে, খামে বা হাতের নাগালে পাওয়া যেকোনো ছেঁড়া কাগজের টুকরায়"।

পেসোয়ার লেখা কাগজপত্রের এই প্যাঁটরা বর্তমানেন পর্তুগালের জাতীয পাঠাগারে রয়েছে, যেখানে তাঁকে শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ পর্তুগিজ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে যথেষ্ট সর্বোৎকৃষ্ট মানের সৃষ্টিকর্ম রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সম্ভবত সেদেশের জাতীয় মহাকাব্য 'লুসিয়াদগণ'-এর রচয়িতা, ষোড়শ শতাব্দীর লুইস ডি ক্যামোয়েসের পর পেসোয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। কাগজপত্রগুলির মধ্যে এমন শত শত লেখা ছিল, যেগুলো দিয়ে 'অস্থিরতার পুস্তক' তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ক্রম মেনে নয়। পর পর আসা সম্পাদকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটাকে দেখার। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় পেসোয়ার মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর, ১৯৮২ সালে। মার্গারেট জুল কস্তা কৃত ও নতুন প্রকাশিত একটি ইংরেজি অনুবাদের নাম 'দি বুক অফ ডিসকোয়ায়েট: দ্য কমপ্লিট এডিশন' (নিউ ডিরেকশানস)। জেরোনিমো পিজারোর একটি পর্তুগিজ সংস্করণের উপর ভিত্তি করে এ বইটি ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল প্রথম সংস্করণ, যেখানে সমস্ত লেখাকে পেসোয়ার দেয়া তারিখ এবং অন্যান্য সূত্র থেকে যতটা ভালোভাবে পারা যায় কালানুক্রমিকভাবে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

পেসোয়া আর্কাইভের আকার এবং বিশৃঙ্খলতা ছাড়াও, জটিলতার আরেকটি বিভ্রান্তিকর স্তর রয়েছে: এটি, এক অর্থে, অনেক লেখকের কাজ। তাঁর পাণ্ডুলিপিতে, এমনকি ব্যক্তিগত চিঠিপত্রেও, পেসোয়া তাঁর সেরা অনেকগুলো লেখারই কৃতিত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন 'অল্টার ইগো' বা 'পরিবর্তিত অহং'-কে, যেগুলোকে তিনি বলেছেন 'ভিন্ননাম' । পণ্ডিতদরা এগুলোর মধ্যে থেকে বায়াত্তরটাকে সারণিভুক্ত করেছেন। উদ্ভাবিত নামগুলির প্রতি তাঁর ভালবাসা শুরু হয় অতিশৈশবেই: ছয় বছর বয়সে তিনি ফরাসি শেভালিয়ে দ্য পা নামে চিঠি লিখতেন, এবং শিগগিরই তিনি আলেকজান্ডার সার্চ এবং চার্লস রবার্ট অ্যানন প্রভৃতি ইংরেজি নামের পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু নিজের অনেক পরিপক্ক কাজে তিনি প্রধান যে-ভিন্ননামগুলো ব্যবহার করেছেন, সেগুলো ছিল সাংকেতিক মস্করার মতো নামগুলোর চেয়ে অনেক বেশিকিছু। তারা ছিল সম্পূর্ণরূপে পরিস্ফ‚টিত করে তোলা চরিত্র, তাদের নিজস্ব জীবনী, দর্শন এবং সাহিত্য শৈলীতে সমৃদ্ধ। পেসোয়া এমনকি তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্ধিতা থাকার কথাও কল্পনা করেছেন, এবং তাদেরকে একে অপরের কাজে মন্তব্য করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি যেমনটা দাবি করতে পছন্দ করতেন সত্যিই যদি সেরকম শূন্যগর্ভ হন, সেই শূন্যতা কিন্তু সবকিছুর অনুপস্থিতিজনিত নয়, বরং একটি মঞ্চে জায়গা করে দেয়ার জন্যে তৈরি শূন্যতা, যে-মঞ্চে তাঁর কল্পিত সত্তাগুলো মিলিত হতে এবং মিথস্ক্রিয়া করতে পারে।

পেসোয়ার কবিতায় তিনটি ভিন্ননাম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিজের নাম স্বাক্ষরিত কবিতা ছাড়াও তিনি লিখেছেন প্রকৃতির শিক্ষাদীক্ষাহীন সন্তান আলবের্তো কায়েইরো হিসেবে, ধ্রুপদী ফর্ম আর থিমের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন বিষণ্ণ ডাক্তার হিকার্দো হেইস হিসেবে, এবং ওয়াল্ট হুইটম্যানের ভক্ত একজন নৌ প্রকৌশলী ও বিশ্ব পর্যটক আলভারো জি কাম্পোস হিসেবে। পেসোয়া তাঁর নিজের জন্মতারিখের সঙ্গে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এদের প্রত্যেকের একটা করে জন্মতারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, এবং তাদের ব্যাপারে রচিত পুরাকাহিনিগুলো ছিল পরস্পর বিজড়িত। পেসোয়া একবার একটি অনুচ্ছেদ লিখেছিলেন, যেখানে কাম্পোস বুঝিয়ে বলছে কীভাবে কায়েইরোর একটি লেখার পাঠ শুনে হেইসের মধ্যে মৌলিক রূপান্তর এসেছিল।

সাধারণত আমরা আশা করি যে, গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একটি স্বতন্ত্র শৈলী থাকবে, লেখার এমন একটি পদ্ধতি থাকবে যা থেকে তাদের শনাক্ত করা যাবে, যেভাবে তুলির আঁচড় থেকে একজন চিত্রশিল্পীকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু তার নিজের সত্তার উপবিভাগগুলো পেসোয়াকে একইসঙ্গে কমপক্ষে চারটি শৈলী ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। স্বনামে লেখা কবিতাগুলোতে পেসোয়ার ভাষা বাহুল্যবর্জিত, দার্শনিক, আবেগপ্রবণ:

আমি ভাবি নীরব পুকুরটার কথা
যার জল আলোড়িত হয় হাওয়ায়।
আমি কি সবকিছু নিয়ে ভাবছি,
নাকি সবকিছু আমাকে ভুলে গেছে?
এদিকে সুশৃঙ্খল স্তবকগুলিতে জীবন এবং প্রেমের ক্ষণস্থায়ীতায় মগ্ন হেইসকে শোনাচ্ছে হোরাস বা কাতুলাসের মতো:
প্রতিটি চুম্বন যেন
বিদায়চুম্বন, সেভাবেই
চলো সপ্রেম চুমু খাই, আমার ক্লোয়ি।

বিপরীত চরমবিন্দুতে উত্তেজনাকর ভবিষ্যবাদী কাম্পোস জয়গান গাইছে ক্ষমতার আর আধুনিকতার গতির:

অতিবিস্ময়কর অনুভূতির সর্বেশ্বরবাদী ক্রোধে
আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় ফুঁসছে এবং আমার সমস্ত রোমকূপ থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।
যে সবকিছুই কিন্তু একটি গতি, একটি শক্তি, একটি ঐশ্বরিক রেখা
তার নিজের থেকে এবং দিকে, ধৃত এবং উন্মাদ গতির ক্ষিপ্ততা গুঞ্জনরত।

আর তারপরে রয়েছে কায়েইরো, যে তার কুড়ি থেকে তিরিশ বছরের মাঝামাঝি বয়সে য²ারোগে মারা গেছে বলে জানা যায়। অন্যন্য ভিন্ননামীয়দের 'গুরু' হিসেবে সম্মানিত কায়েইরো এমন সরলভাষী কবিতা লিখেছেন, যেখানে বিমূর্ত চিন্তাভাবনাকে পরিহার করে এবং প্রায় জেন্ জ্ঞানের চেতনায় প্রাকৃতিক জগতের সাথে লগ্ন থাকা হয়েছে:

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ভালো নেই
কিন্তু স্বাভাবিক অহংবোধ আছে ফুলদের মতো
এবং সেসব নদীর মতো যারা নিজেদের পথ অনুসরণ করে
শুধুমাত্র নিজেদের বিকাশ আর প্রবহমানতায়
অজান্তেই মগ্ন হয়ে গিয়ে।

অনেক পাঠকের কাছে পেসোয়ার আবেদনের একটি বড় অংশ হল তাঁর সৃষ্ট ভিন্ন ভিন্ন জটিল পুরাকাহিনিসহ ভিন্ন নামগুলো। আবার অন্যান্য পাঠকরা এগুলোকে একটা অপ্রয়োজনীয় এবং কষ্টকৃত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তবে যেসব উপাদানের জন্যে পেসোয়াকে সর্বোচ্চ আধুনিকতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, ভিন্ননামগুলো নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে একটি। এটি ছিল এমন এক কবি প্রজন্ম যারা অস্কার ওয়াইল্ডকে 'মুখোশের সত্য' বলে মনে করতেন। জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক থাকাকালে টি.এস. এলিয়ট যতটা এলিয়টীয় ছিলেন, তার চেয়ে বেশি আর কখনোই ছিলেন না, এবং তাঁর সাথে পেসোয়ার একটা বিশেষ আত্মীয়তা রয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জন্ম নেয়া এ দুই কবিই ছিলেন ড্যান্ডিবাদ বা ফুলবাবু সংস্কৃতির অনুরাগী, সাধারণের প্রতি একটা অবজ্ঞার মনোভাবসম্পন্ন, নীতিগতভাবে নৈর্ব্যক্তিকতার সাথে সংযুক্ত, এবং অসুখী মনোভাবকে লালন করার প্রবণতাসম্পন্ন।

পেসোয়া অবশ্য মুখোশের বাইরে গিয়ে একধরণের স্বেচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। 'অস্থিরতার পুস্তক'-এ 'কিভাবে অধিদৈবের স্বপ্ন দেথা যায়' শীর্ষক একটি বিভাগে তিনি চেতনা দ্রব করার একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, যা কঠোরতার দিক থেকে স্ব-সম্মোহনের নিয়মাবলী বা একগুচ্ছ ধর্মীয় অনুশীলনের মতোই। প্রথমেই আসে উপন্যাস পাঠের কথা, যা আপনাকে বাস্তবের চেয়ে কাল্পনিক জগতের বিষয়ে বেশি যত্ন নিতে প্রশিক্ষণ দেয়। তারপর আসে আপনি যা কল্পনা করেন তা শারীরিকভাবে অনুভব করার ক্ষমতার কথা। উদাহরণস্বরূপ, "তার উপন্যাসে তেমন একটি মুহূর্তের সৃষ্টি হলে তখন ইন্দ্রিয়বাদীর একটি বীর্যপাতের অনুভব পেতে" সক্ষম হওয়া উচিত। আরো বেশ কয়েকটি ধাপের পর অবশেষে এল সেই ধাপ, পেসোয়া যাকে বলেছেন 'স্বপ্ন দেখার সর্বোচ্চ ধাপ'। "একেকটি চরিত্রের ছাঁচ তৈরি করার পর আমরা সেগুলোতে একইসঙ্গে বাঁচতে থাকি– আমরা হলাম যৌথভাবে এবং মিথস্ক্রিয়ভাবে সেই সবগুলো সত্তা।" অবশ্যই, এটাই তিনি অর্জন করেছিলেন, এবং যদি এটাকে একদিকে আত্ম-অস্বীকৃতির মতো শোনায় তো অন্যদিকে এটা আত্ম-পূজনের অনুরূপ। "আমি ঈশ্বর," এই বলে লেখাটার ইতি টানা হয়েছে। সর্বোপরি, যদি আপনার কল্পনা এত শক্তিশালী হয় যে এটা বিশ্বকে জনপূর্ণ করতে পারে, তাহলে তো প্রকৃত মানুষের অস্তিত্বের কোনো প্রয়োজনই নেই।

এধরনের সলিপিসিজম, অর্থাৎ শুধু স্বীয় সত্তার অস্তিত্বেই বিশ্বাস করা যায় এ মতবাদ, পেসোয়ার জন্য একটি বিরাট প্রলোভন ছিল, যেমনটা তাঁর 'অস্থিরতার পুস্তক'-এ প্রকাশ পেয়েছে। বইটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি যে উপাদানগুলি চিহ্নিত করেছিলেন তা দুটি দফায় লেখা হয়েছিল, প্রতিটি তার নিজস্ব ভিন্ননাম সহ, তবে তাঁর কবিতায় আধিপত্য বিস্তারী সেই চারটি চরিত্র বাদে। তিনি ১৯১৩ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত প্রথম দফায় করা কাজটির কৃতিত্ব দেন ভিসেঞ্চে গ্যাজেস-কে, যাকে তিনি একটি পরিচায়ক চরিত্রচিত্রণে বর্ণনা করেছেন "তিরিশের ঘরের একজন মানুষ, রোগাপাতলা, মোটামুটি লম্বা, বসা অবস্থায় খুবই কুঁজো হয়ে থাকে তবে দাঁড়ানো অবস্থায় অতটা নয়, এবং পোশাক পরেন আংশিক অনাত্মসচেতন অবহেলার সাথে।" অনুচ্ছেদটিতে গ্যাজেসের কৃচ্ছতা, বিষণ্ণতা, বুদ্ধিমত্তা এবং আপাতদৃষ্টির তুচ্ছতা, অর্থাৎ যেসব গুণাবলী সে তার স্রষ্টার সাথে ভাগাভাগি করেছে সেগুলো, বর্ণনা করে যাওয়া হয়েছে। এইভাবে, পেসোয়া যখন তাঁর 'অস্থিরতার পুস্তক'-কে "অস্তিত্ববিহীন ব্যক্তির আত্মজীবনী" হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন তিনি একই সাথে একটি বাস্তব সত্য বলছেন (গ্যাজেসের মতো কেউ কখনো ছিল না) এবং একটি কাব্যিক স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন: তিনি নিজেও কখনও সেভাবে বেঁচে ছিলেন না, যেটাকে এ জগৎ একটা পূর্ণ জীবন বলে মনে করে।"

১৯২০-এর দশকে পেসোয়া বইটিকে একপাশে সরিয়ে রেখে কবিতার দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন এবং যাদুবিদ্যা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি এক জীবনব্যাপী মুগ্ধতায় নিমজ্জিত হন। ১৯২৯-এ যখন তিনি এ বইয়ে আবার ফিরে আসেন, যখন তিনি সেটার আরেক লেখককে কল্পনা করলেন। এবারকার লেখক হল বের্নার্দো সোয়ারিস, লিসবনের একটি ফ্যাব্রিক কোম্পানির একজন সহকারী হিসাবরক্ষক। সোয়ারিসও আধ্যাত্মিকভাবে পেসোয়ার অনুরূপ। প্রকৃতপক্ষে, পেসোয়া লিখেছিলেন যে সোয়ারিস শুধুমাত্র একটি 'অর্ধ-ভিন্ননাম', কারণ "তার ব্যক্তিত্ব, যদিও আমার নিজের নয়, আমার নিজের থেকে আলাদাও নয়, তবে সেটার সামান্য বিকৃতিমাত্র।" সোয়ারিস তার পূর্বসূরি গ্যাজেসের চেয়ে আরো সম্পূর্ণভাবে কল্পনা করা একটি চরিত্র। সে তার পড়শি এলাকা বাইশা, হুয়া দুস দৌরাদুরিসে তার কর্মস্থল এবং তার উপরিওয়ালা ভাস্কিসকে এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, যা বইটির দ্বিতীয় পর্বটিতে আরো বেশি উপন্যাসতুল্য অনুভূতি এনে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, রিচার্ড জেনিথ সম্পাদিত 'দা বুক অফ ডিসকোয়ায়েট'-এর পেঙ্গুইন ক্লাসিক সংস্করণে এসব অনুচ্ছেদের প্রতিটির শুরুতে একটা আনুক্রমিক সংখ্যা এবং ক্ষুদ্রাকৃতির একধরনের বর্ণনা যোগ দেয়া হয়েছে, যাতে পাঠকের কাহিনিতে প্রবেশের পথটা সুগম হয়।

নতুন সংস্করণের কালানুক্রমিক পদ্ধতিতে যেকোনো ধরনের থিমগত বা বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থনাকে বাদ দেয়া হয়েছে, এবং এর ফলাফল হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটা বই, যেটা তার পূর্ববর্তীটির তুলনায় কম অধিগম্য। আংশিকভাবে এর কারণ হল, সবচেয়ে দুর্বল উপাদান দিয়ে এটা শুরু করা হয়েছে সেই সময় থেকে, যখন পেসোয়া ছিলেন ১৮৯০-এর দশকের ফরাসি প্রতীকবাদ আর অবক্ষয় আন্দোলনে প্রভাবিত পঁচিশ বছর বয়সী এক তরুণ। (সে-সময়ে পর্তুগাল মনে হয় প্যারিস এবং লন্ডনের চেয়ে সাহিত্যের গড় মানে পিছিয়ে ছিল।) এ সংস্করণে প্রথম অন্তর্ভুক্ত লেখাটিতে বলা হয়েছে, "আমার আত্মা একটি লুকানো ঐকতান। আমি জানি না কোন্ বাদ্যযন্ত্র, কোন্ বেহালা নাকি বীণা, ঢোল নাকি তম্বুরা বাজছে আমার ভেতরে। আমি নিজেকে শুধু একটা সমন্বিত সঙ্গীত হিসেবেই জানি।"

অনুচ্ছেদটি এই পুষ্পল গদ্য কবিতার সুরটা স্থির করে দেয়, যেটার প্রধান্য দেখা যায় লেখাটার প্রথমাংশে। অন্তর্ভুক্ত কিছু লেখায় বিস্ময়কর শিরোনাম রয়েছে, যেমন 'হতাশার প্রার্থনাগীতি' বা 'পরিত্যাগের নন্দনতত্ত্ব'। অন্যগুলো গঠিত আকাশ আর ভূদৃশ্যের প্রতীতিবাদী রেখাচিত্র দিয়ে, যেমনটা দেখা যায় 'বৃষ্টির দিনে লেখাটিতে: "বাতাস লুকানো হলুদ রঙের, মলিন সাদার মধ্য দিয়ে দেখা ফ্যাকাশে হলুদের মতো।" সেখানে অর্ধেক কুমারী মেরি আর অর্ধেক বেল্ দাম্ সঁ মের্সি (নিষ্ঠুর সুন্দরী) গোছের নামহীন মহিলাদের সম্পর্কে বিকৃতকামী স্বপ্নচারণা রয়েছে: "তুমিই একমাত্র রূপ যা ক্লান্তি ছড়ায় না, কারণ তুমি আমাদের অনুভবে বদলে যাও, কারণ আমাদের আনন্দকে চুম্বন করার মধ্যে দিয়ে তুমি আমাদের দুঃখ আর ক্লান্তিকে কোল পেতে দাও, তুমি সেই আফিম যা আরাম দেয় আর সেই ঘুম যা আনে বিশ্রাম, এবং সেই মৃত্যু যা আমাদের হাত দুটো আমাদের বুকের উপর আলতো করে গুটিয়ে রাখে।"

'অস্থিরতার পুস্তক'-এ যদি সাকুল্যে শুধু এগুলোই থাকত, তবে এটা একটি আধুনিক সেরা কাজ হত না, বরং একটি টাইম ক্যাপসুলই হত।

তথাপি, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিককার অবক্ষয়ের কাল্ট থেকে আধুনিকতার প্রথম বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, এবং পেসোয়ার লেখায় ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতাব্দীতে রূপান্তরণ চিত্তাকর্ষকভাবে দৃশ্যমান। অবক্ষয়ের ভিত্তি ছিল সেই সময়কার মূল্যবোধের একটি উদ্ধত উল্টোযাত্রায়: কঠোর পরিশ্রম এবং নৈতিক নিষ্ঠার জায়গায়, অস্কার ওয়াইল্ড এবং ইয়োরিস-কার্ল হাইসম্যান্স-এর মতো লেখকরা কল্পনাপ্রসূত অলসতা এবং উত্তেজক কূটাভাসের মহিমা কীর্তন করছিলেন। তরুণ পেসোয়ার মনে এই বার্তাটি অনুরণিত হয়েছিল, যেহেতু এর সাহায্যে তাঁর নিজের দ্বিধা এবং প্রত্যাহারের প্রবণতাকে একটি শৈল্পিক গুণে পরিণত করা গিয়েছিল। ১৯১৫ সালে অন্তর্ভুক্ত এক লেখায় তিনি বলেছেন, "আমি কখনোই খুব বেশি চেষ্টা করি না। ভাগ্য যদি চায়, নিজে এসে আমাকে খুঁজে নিতে পারে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচেষ্টাগুলো কখনোই অন্যরা যে সাফল্য উপভোগ করে তার সাথে মিলবে না।"

তাঁর বয়স যত বেড়েছে, এবং বিশেষ করে চল্লিশের দশকে যখন তিনি 'অস্থিরতার পুস্তক'-এ ফিরে এলেন, তখন এই সাহিত্যিক শৈলীটিকে পেসোয়া আরো গুরুতর এবং ধারালো কিছুতে পরিণত করেছিলেন। এটি এক ধরনের আধিদৈবিক শূন্যতাবাদে পরিণত হয়েছিল, যেখানে শিল্পীকে এ মহান সত্যটি জানাতে হচ্ছিল যে, জগতে কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গ্যাজেসকে তার আলঙ্কারিক মহিমাসহ বাদ দেওয়ার এবং সম্পূর্ণ সোয়ারিসের মাধ্যমে কথা বলার সিদ্ধান্ত, যার কোনো ধরনের গ্লামার নেই। প্রকৃতপক্ষে, তার ভাড়া করা জীর্ণ কামরা এবং বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তিমূলক কাজকর্ম নিয়ে সোয়ারিস যতটা হতে পারে ততটাই সাধারণ একজন। সে এমন একধরনের মানুষ, যার দিক থেকে যেকোনো সুন্দরের পূজারী মুখ ফিরিয়ে নেবে, বা যাকে স্রেফ খেয়ালই করবে না। এলিয়ট তাঁর 'দি ওয়েস্ট ল্যান্ড'-এ লন্ডন সেতুর উপর দিয়ে সোয়ারিসের মতো লোকদের স্রোত প্রবাহিত হতে দেখেছিলেন এবং তাদের ইতোমধ্যেই মৃত বলে ধরে নিয়েছিলেন: "আমি ভাবতে পারিনি মৃত্যু এতগুলোকে খতম করে ফেলেছে।"

পেসোয়া তাঁর কাজে নিবেদিতভাবে যে প্রচেষ্টা এবং শৈল্পিকতা দিয়েছেন, তার সাথে এই উদাসীনতাকে মেলানো কঠিন। যদি কিছু করার কোনো মূল্য না থাকে, তাহলে পঁচিশ হাজারটি পৃষ্ঠা কেন লিখলেন? মাঝে মাঝে তিনি এমনও বলেছেন যে, চিন্তাভাবনা করা এবং লেখা হল কেবল সময় কাটানোর একটি উপায়মাত্র– এটা সেলাইয়ের কাজে হাতকে নিয়োজিত রাখার মতো মনকে নিযুক্ত রাখার একটা পন্থা, যেমনটা তিনি বলেছেন তাঁর 'নিরাবেগে' কবিতায়:

আমারও সূচিকর্ম আছে
এটা সেসময়কার যখন থেকে আমি চিন্তা করতে শুরু করেছি।
ফোঁড়ের পর ফোঁড় একটা সম্পূর্ণতাহীন সম্পূর্ণকে গড়ে তুলছে…
একটি বস্ত্র, এবং জানি না এটা পোশাক নাকি কিছুই না।

চিন্তাভাবনাকে যদি ক্রিয়াকলাপের নিছক অনুপস্থিতি বলে বিবেচনা করা হয়, তবে এটা জীবনের একটি প্রত্যাখ্যান করার মতোই দেখায় এবং 'অস্থিরতার পুস্তক' গড়ে তোলা হয়েছে একঘেয়েমি, অনুশোচনা এবং হতাশার অভিব্যক্তিগুলো দিয়ে। অবশ্য সেইসাথে পেসোয়া এ ব্যাপারেও নিশ্চিত যে, চিন্তা করাটা হল দুঃসাহসিক কাজগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, অন্য যেকোনো সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। যেহেতু আমাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং ধারণা ব্যতীত এ জগতে কখনোই আমাদের প্রবেশাধিকার নেই, তাই নির্ভুলভাবে বলতে গেলে, অবশ্যই বিশ্বে কর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। কোনোকিছু আপনি যখন কল্পনা করতে পারছেন, তখন তা বাস্তবে করবেন কেন? এভাবে, কেরানি সোয়ারিস চ‚ড়ান্ত অভিজাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়, যার কাছে কৃতিত্ব এবং মর্যাদার মতো জিনিসগুলির কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সে তার নিজের অবস্থান এগুলোর চেয়ে অসীম ঊর্ধ্বে বলে মনে করে। নীট্শের জরাথুস্ত্রের মতো সোয়ারিসও বলেছে, "মাপকাঠিতে একজন মানুষ যত উপরে উঠবে, তাকে তত বেশি জিনিস ত্যাগ করতে হবে। পাহাড়ের চূড়ায় কেবলমাত্র সেই লোকটার একা থাকারই জায়গা আছে।" লেখালেখি হল শ্রেষ্ঠত্বের কারণ এবং প্রমাণ দুটোই: "সাহিত্য… আমার কাছে মনে হয় সেই লক্ষ্য, যার দিকে মানুষের সমস্ত প্রয়াস পরিচালিত হওয়া উচিত।"

আত্মাবমাননা এবং আত্মোনয়নের মধ্যেকার দোলাচল নিয়ে 'অস্থিরতার পুস্তক' একটি বিশুদ্ধ উন্মাদ-হতাশাব্যঞ্জক মহাকাব্যের মতো মনে হতে পারে। পেসোয়ার এই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত কৃতিত্ব থেকে বোঝা গেছে কীভাবে সলিপিসিজম বা স্বীয় সত্তার বাইরে কোনোকিছুরই কোনো গুরুত্ব নেই এমন বিশ্বাসের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরণের দুঃখের শিকড় নিহিত থাকে, যাতে মনের যেসব অভিজ্ঞতা হচ্ছে সেগুলো মনকে কখনোই প্রভাবিত করতে না পারে। গ্রন্থিত সর্বশেষ লেখায় তিনি বলেছেন, "স্বাধীনতা হল বিচ্ছিন্নতার সম্ভাবনা। যদি তুমি একা থাকতে না পারো, তাহলে তুমি আজন্ম একজন দাস।" কিন্তু এমনকি পেসোয়াও শেষপর্যন্ত একা থাকতে পারেন না; তাঁকেও ভিন্ননাম ব্যবহার করে নিজের সব সঙ্গী বানিয়ে নিতে হয়, যাদেরকে তিনি সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন, যেটা প্রকৃত মানুষদের ক্ষেত্রে পারতেন না। শুধুমাত্র মৃত্যুই তাদেরকে, এবং তাঁকেও, তাঁর কল্পনার অতিশক্তিশালী খপ্পর থেকে মুক্ত করতে পারত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক