Published : 01 Feb 2026, 11:27 AM
কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি পেয়েছেন একই আসনের প্রার্থী হাসান আহমেদ। তবে মোবাশ্বের আলমের ভোট করতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এ আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিলের অনুমতির আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
এ ছাড়া কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিলের অনুমতির আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারকের আপিল বিভাগ রোববার এসব আদেশ দেয়।
কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দিলে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারীরা বিরোধিতা করছিলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে তার প্রার্থিতা টিকে যায়।
তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে আপিলে প্রার্থিতা বাতিল হয় বিএনপির প্রার্থী গফুর ভঁইয়ার।
বিএনপির সাবেক এ এমপির প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছিলেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) প্রার্থী কাজি নুরে আলম ছিদ্দিকি।
গেল ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় নির্বাচন ভবনে উভয় পক্ষের আপিল শুনানি শেষে গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয় ইসি।
এরপর ২১ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন। শুনানি নিয়ে ২২ জানুয়ারি হাই কোর্ট রিট সরাসরি খারিজ করে দেয়।
প্রার্থিতা ফিরে পেতে হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে গফুর ভূঁইয়া লিভ টু আপিল করেন। গত সপ্তাহে শুনানি হয়।
এদিকে মোবাশ্বেরের মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল করেন ঋণ খেলাপের অভিযোগ ও দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়ার কারণ দেখিয়ে।
আর গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের দিনই মোবাশ্বের আলমকে বিএনপি মহাসচিব স্বাক্ষরিত দলীয় প্রত্যয়নপত্রে কুমিল্লা-১০ আসনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
মোবাশ্বের রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সেটি নামঞ্জুর করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন।
রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে ২৫ জানুয়ারি হাই কোর্ট রুল দিয়ে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে তাকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তিনি ইতোমধ্যে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। হাই কোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে একই আসনের প্রার্থী হাসান আহমেদ আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন।
মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী জনাব মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া উনার নির্বাচন কমিশনে আপিল না মঞ্জুর হওয়ার পরে আমরা উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করি। সেই রিট পিটিশন হাই কোর্ট ডিভিশন শুনানি অন্তে মঞ্জুর করেছিলেন। থার্ড পার্টি পরবর্তীতে গিয়ে সেটার বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল শুনানি হয়। আপিল শুনানির পর আজকে আদেশের জন্য ছিল।
“আপিল বিভাগ এই আপিলটি প্রাথমিকভাবে লিভ গ্র্যান্ট করেছেন একটি গ্রাউন্ডে। লিভ গ্র্যান্ট করার পরে বলেছেন যে, কুমিল্লা-১০ আসনের নির্বাচন এজ ইউজুয়ালি চলবে। অর্থাৎ মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া- তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
“কিন্তু উনার নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে আপিল বিভাগে যে আপিলটা দায়ের হবে পরবর্তীতে, যেহেতু লিভ গ্র্যান্ট হল; সেই আপিলের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করবে উনার নির্বাচনে জেতার পরে এই জেতার রেজাল্টটা আসলে টিকবে কি টিকবে না।”
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “অপর প্রার্থী জনাব গফুর ভূঁইয়ার যে আপিলটা ছিল, হাই কোর্ট ডিভিশনও রিট পিটিশন নামঞ্জুর করেছেন এবং আপিল বিভাগেও আপিলটিও নামঞ্জুর হয়েছে। ফলে গফুর ভূঁইয়া নির্বাচন করতে পারছেন না।
“এই দুটো ম্যাটার যেহেতু একই কুমিল্লা-১০ আসনের এবং এই দুটো একটা পর্যায়ে আসলে একসাথেই শুনানি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার নির্বাচন করতে আর কোনো বাধা থাকলো না। তবে আমাদের আপিলটি নিষ্পত্তি করার একটি বাধ্যবাধকতা থাকল।”
এদিকে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। রিটার্নিং কর্মকর্তার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছিলেন একই আসনের এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের মিলনায়তনে শুনানি শেষে গত ১৭ জানুয়ারি হাসনাত আবদুল্লাহর আপিল মঞ্জুর করে ইসি। সেই সঙ্গে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
ইসির এ সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। শুনানি নিয়ে ২১ জানুয়ারি হাই কোর্ট রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে আদেশ দেন।
হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল আপিল বিভাগে আবেদন করেন। ২৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগ শুনানি ২৮ জানুয়ারি (বুধবার) পর্যন্ত মুলতবি করেন। এর মধ্যে হাই কোর্টের আদেশের প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে তিনি নিয়মিত লিভ টু আপিল করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহর আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সেই লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছে। এর ফলে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
“তার প্রার্থিতা বাতিলের যে আদেশ নির্বাচন কমিশন নিয়েছিল এবং মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগ বহাল রেখেছিল, সেটিই মহামান্য আপিল বিভাগ বহাল রাখলেন।
“এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যারা ঋণখেলাপি, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না—এই আইনি বিষয়টিই আবারও মহামান্য আপিল বিভাগের দ্বারা একটি নজির স্থাপিত হল।”
আদেশের পর হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আমি এটা দেখছি না। আমি দেখছি এটা ঋণখেলাপি এবং ব্যাংক ডাকাতদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এবং সাধারণ জনগণের একটা যুদ্ধ।
“আমি এই যুদ্ধটা শুরু করেছি এবং এটার মধ্য দিয়ে পুরো বাংলাদেশ এটা বার্তা পেয়েছে, যদি আপনি ন্যায়ের পথে থাকেন, আপনি আইনের পথে থাকেন, ব্যাংক ডাকাত এবং ঋণখেলাপীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, দিন শেষে বাংলাদেশ এবং জনগণের বিজয় হবে।”
তিনি বলেন, “আপনি দেখেন একটা মানুষ ১৩০ কোটি টাকারও বেশি হচ্ছে ঋণখেলাপি। ২০০৪-০৫ এ ১৩০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে সে ২০২৬ সালে এসেছে, সে ঋণ পরিশোধ করে নাই। সে বারবার আপনার হাই কোর্টকে ব্যবহার করে, কোর্টকে ব্যবহার করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করে।
“বিষয়টি এমন না যে তার প্রথমবারই প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। একই ঘটনার কারণে সে ২০০৮ সালেও নির্বাচন করতে পারেনি।”