Published : 02 Feb 2026, 10:20 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে দেশজুড়ে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সাড়ে ৫০০টিতেই বিএনপির সম্পৃক্ত থাকার তথ্য দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার ঢাকার ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে এ সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংবাদ সম্মেলনে এ গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন টিআইবির শাহজাদা এম আকরাম ও মো. জুলকারনাইন।
এতে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন এবং রাষ্ট্র পরিচালনের নিরিখে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার-বিশ্লেষণ করার কথা বলেন তারা।
চব্বিশের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার অংশে প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।”

প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু এবং ৭ হাজার ৮২ জন আহতের তথ্য তুলে ধরা হয়।
এতে দাবি করা হয়, এর মধ্যে ৫৫০টি ঘটনায় বিএনপি সম্পৃক্ত, শতাংশের হিসেবে যেটি ৯১.৯ ভাগ। আর আওয়ামী লীগ ১২৪টি ঘটনায় (২০.৭ শতাংশ) এবং জামায়াতে ইসলামী ৪৬টি ঘটনায় (৭.৭ শতাংশ) সম্পৃক্ত ছিল।
সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের দখলে থাকা প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের ‘দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়’ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
এরমধ্যে পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি; সিলেটের কোয়ারি ও নদ-নদী থেকে পাথর লুটপাট; সেতু, বাজার, ঘাট, বালু মহাল ও জল মহালসহ বিভিন্ন ইজারা নিয়ন্ত্রণের ঘটনাগুলো প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
এসব ক্ষেত্রে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর না থাকা এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারাকে কারণ হিসেবে দেখছে টিআইবি।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ জায়গা ছিল।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ‘অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা’ থাকলেও নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার যে প্রবণতা সবসময় ছিল, সেটি অব্যাহত আছে বলে মনে করেন তিনি।
সুষ্ঠু বা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না–এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্ম¬- এই তিন শক্তির অপব্যবহার প্রকট হওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। যার ফলে বাস্তবে সমান প্রতিযোগিতাসহ কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, সেটি আমাদের দেখার বিষয়।”
নির্বাচনি সহিংসতা বিষয়ক এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে, এখন থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু না; তার পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সহিংসতার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এটি সরকার আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো বুঝবেন।”
গবেষণা প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
গবেষণায় নির্বাচন বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা ‘অগ্রগতি ও ঘাটতি’ পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানটি বলছে, নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর হেনস্তা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
তাদের ভাষ্য, তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
বছর হিসাবে ২০২৫ সালে ৪০১ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ নিহত হয়েছেন।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১ হাজার ৩৩৩ অস্ত্র এখনো নিখোঁজ; ডিপফেইক ও ভুল তথ্যের বাড়তি হুমকি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ফলে ‘উদ্বেগ সৃষ্টিকে’ সরকারের নির্বাচনি ব্যবস্থার ঘাটতি হিসেবে দেখছে টিআইবি।
গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে, “থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলায় দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মাত্র ৯-১০ শতায়শ পুলিশ সদস্য, যা সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ‘বড় ঘাটতি’ হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়া মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘সংশয় ও মতবিরোধের’ কথা তুলে ধরে টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, “জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলোর পক্ষ থেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে।”
প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ‘অনুপযোগী’ হিসেবেও দেখছে সংস্থাটি।
এমনকি ইসির প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার অনেকগুলোই 'নামসর্বস্ব' বা ‘সক্ষমতাহীন’ বলেও অভিযোগ তাদের।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো মেয়াদেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নাজুক’ থাকার দাবি করে টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, আন্দোলন, লুটপাট, অরাজকতা অব্যাহত রয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে দুই মাস করে বাড়িয়ে চলতি ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত করা হয়েছে। তবুও ‘মব' করে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনার ‘আশংকাজনক বৃদ্ধি’, 'মব' তৈরি করে দাবি আদায়ের প্রবণতা - অনেকক্ষেত্রে বলপূর্বক দাবি আদায়ে সাফল্য, সরকারের পক্ষ থেকে মবকে মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কৌশল বা পদক্ষেপের দৃশ্যমান ব্যর্থতা, এমনকি নিষ্ক্রিয়তা ও তোষণমূলক অবস্থানের কারণে অতি-ক্ষমতায়নকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা খাতে ‘ঘাটতি’ হিসেবে দেখছে টিআইবি।
আন্দোলন দমন করতে পুলিশের কার্যক্রমে বৈষম্যের কথা তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো পক্ষের প্রতি নমনীয় আচরণ, কোনো পক্ষের ওপর নির্যাতন দেখা গেছে।
এর বাইরে ‘ঢালাওভাবে’ মামলার আসামি হিসেবে নাম দেওয়া, গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ বাড়লে গ্রেপ্তার বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি।
বিচারবহির্ভূত হত্যা, কারা হেফাজতে এবং সেনাবহিনীর হেফাজতে মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে টিআইবি।