Published : 20 Jan 2026, 01:41 AM
“ভোটের সাথে গণভোট হবে শুনছি। কিন্তু কীভাবে হবে, কী ভোট দেব, কী ভোট দিলে কী হবে কিছুই জানি না।”
গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করলে এমন উত্তর দিলেন ঢাকার মহাখালী এলাকার চা দোকানি শান্ত আহমেদ রতন।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্য। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে শান্তর মতই ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষ।
অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য গণভোটের বিষয়ে মানুষকে বোঝাতে বেশ বড় আয়োজন করেছে। তবে সুনির্দিষ্ট করে বললে, এই প্রচার হচ্ছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, যা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভিডিও বার্তা দিয়ে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “নতুন বাংলাদেশ গড়ার চাবি এখন আপনার হাতে। ‘হ্যাঁ’ তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।
“হ্যাঁ তে আপনি নিজে সিল দেন। আপনার পরিচিত সবাইকে সিল দিতে উদ্বুদ্ধ করুন এবং তাদেরকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসুন। দেশ পাল্টে দেন।”
কিন্তু জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক সরাসরিই বলেছেন, সরকার গণভোটে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রচার চালাতে পারে না; এটা করে সরকার ‘ভুল’ করছে।
আর অতীতের গণভোটগুলোতেও সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বলে যে দাবি সরকারের তরফে তোলা হচ্ছে, তাও ‘সঠিক নয়’ বলে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের ভাষ্য।

গণভোটের যে চার প্রশ্ন
স্বাধীনতার পর দেশে চতুর্থবারের মত গণভোট হতে যাচ্ছে, যেখানে দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের সঙ্গে প্রবাসের লাখ দশেক ভোটার তাদের রায় দেবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর জনগণের মতামত নিতে এই গণভোট। জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য একটি ব্যালটের বাইরে গণভোটের জন্য একটি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
সেখানে লেখা থাকবে: “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
এরপর ওই ব্যালটে চারটি প্রশ্ন থাকবে।
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।”
এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।
বুঝতে পারছে না সাধারণ মানুষ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর গণভোটের বাকি আর তিন সপ্তাহের মত। কিন্তু গণভোটের ওইসব প্রশ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই।
গণভোট আয়োজন হবে বলে শুনলেও বেশি কিছু জানেন না একটি বেসরকারি কোম্পানির গাড়িচালক মো. রাসেল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নে তিনি বললেন, “ভোট গণভোট রাজনীতির বিষয়, আমরা সাধারণ মানুষ এইডি কী তা বুঝি না। ফেইসবুকে দেখি আন্দোলনের পক্ষে ভোটের লগে গণভোট হইব, কিন্তু ভোট দিলে কী হইব তা জানি না। ওই ভোট কেমনে দিমু হেইডাও জানি না।”
গণভোট কী, কীভাবে হবে, কোন ভোট দিলে কী হবে-সেসব বিষয়ে কিছুই জানেন না আরেক চা দোকানি মোজাম্মেল শেখ।
গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করলে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “ভুট হইব তা জানি, গণভুট আবার কী?”
গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করতেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী হিসাবে কর্মরত জবান আলী।
“ভুট কি হইব? দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে ভুট হয় কি-না তাই এখনতরি বুঝা যাইতাসে না। গণভুট, গণভুট শুনি; কিন্তু হেইডা কেমনে সেগুলো আমাগো কেউ কয় নাই, তাই আমরাও হেইডি জানি না।”
তার পাশ থেকে আরেক নিরাপত্তাকর্মী মো. বদর মিয়া গণভোট নিয়ে বললেন, “হেইডি আমরা বুঝিও না, জানিও না। হেইড লইয়া মাথাব্যথ্যাও আমগো নাই। এমপি ইলেকশন লইয়াই আসে পাবলিক, হ্যারা চিনে মার্কা।”
কেবল যে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ গণভোট নিয়ে অবগত নন, তা নয়। শিক্ষিত ও পেশাজীবী অনেকের মধ্যেও গণভোটের প্রশ্ন নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
একটি সিএ ফার্মে কর্মরত আব্দুল্লাহ আল মোবারক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “শুনেছি গণভোট হবে, সংস্কারের বিষয়ে। কিন্তু বিষয়গুলো আমার কাছে পরিষ্কার না। মানুষ তো প্রশ্নগুলো বুঝবেই না।”
একটি পবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অপূর্ব রহমান বললেন, ‘জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাস্তব’ করতে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ তে ভোট দেওয়া দরকার। কিন্তু গণভোটে কী প্রশ্ন থাকবে জিজ্ঞেস করলে তিনি আর বলতে পারলেন না।
বেসরকারি চাকুরে সাদিক আব্দুল্লাহ গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ‘শুনেছেন’। তবে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিলে দেশের কী কী সংস্কার হবে, আর ‘না’ ভোট জিতে গেলে কী হবে, সেসব বিষয় তিনি জানেন না।
রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খণ্ডকালীন কর্মী সামিহা তাবাস্সুম বললেন, “শুনেছি দলগুলো ৪০টার মত প্রস্তাব ঠিক করেছে। কিন্তু তার ওপর কীভাবে গণভোট হবে বা ভোটাররা কীভাবে ভোট দেবে তা জানি না।”

সরকার কী করছে
গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে জোরেশোরে প্রচার শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ফেইসবুকে প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল পেইজে 'হ্যাঁ' ভোট দিতে উৎসাহ দিয়ে বিভিন্ন ফটোকার্ড শেয়ার করা হচ্ছে। ভিডিও চিত্রেও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ওই ভিডিওচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য, গুম কমিশনের সদস্যের কথায় তুলে ধরা হচ্ছে 'হ্যাঁ' ভোট কেন দিতে হবে সেই ব্যাখ্যা।
‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না–এমন প্রচারও চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এনজিওগুলোকেও গণভোটের প্রচার চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ব্যাংক ও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণভোটে 'হ্যা' ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাজীবীরা অনেকেই প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োজিত থাকবেন।
দেশের বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট নিয়ে সরকারের তরফে প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ।
সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভিডিওবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “গণভোটে আপনি হ্যাঁ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। গণভোটে হ্যাঁ ভোট মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে। সরকার ইচ্ছামত সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে।
“বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিরা নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।”
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে “সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। ক্ষমতার ভারসম্য রক্ষায় পার্লামেন্টে একটি উচ্চ কক্ষ গঠিতে হবে। আপনার মৌলিক অধিকার আরো সুরক্ষিত হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে।
“দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমত ক্ষমা করতে পারবেন না। সব ক্ষমতা একজন প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে না। এবং এরকম আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এর রয়েছে।”
জাতির উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের সকলের প্রতি আহ্বান জানাই আগামী নির্বাচনে গণভোটে অংশ নেন। রাষ্ট্রকে আপনার প্রত্যাশা মত গড়ে তোলার জন্য হ্যা-তে সিল দেন।”
নির্বাচন কমিশন কী করছে?
গণভোট নিয়ে মানুষকে জানাতে সারাদেশে ব্যানার ও লিফলেট দিয়ে প্রচার চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, গণভোটের প্রচারে সব মিলিয়ে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি লিফলেট বিতরণ ও ছোট -বড় ব্যানার থাকছে। গণভোটের প্রচারে প্রায় ৮০ লাখ লিফলেট ছাপানো হয়েছে এবং লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে।
“এছাড়া রিটার্নিং অফিসারের অফিসের সামনে এবং জনবহুল স্থানে প্রদর্শনের বড় সাইজের প্রায় ১৫ হাজার বড় ব্যানার এবং ভোট কেন্দ্রের সামনে স্থাপনের জন্য ছোট আকারের ৪৩ হাজার ব্যানার প্রস্তুত হচ্ছে।”
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই সনদে সই করা জামায়াতে ইসলামী 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচারে চালালেও বিএনপি সরাসরিই বলেছে, গণভোটের প্রচারণা চালানো তাদের দায়িত্ব না।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “জনগণের দায়িত্ব ভোট দেওয়া, 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দেওয়া। জনগণ যা করে তাই হবে।"
আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণে বা বিশেষ কোনো ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার চালানো ‘উচিত নয়’।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নেতারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলী এবং ডিসি, এসপিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রদানও জনমতকে প্রভাবিত করা ও সরকারের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করছে যা নৈতিক ও আইনিভাবেও সঠিক নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে গণভোটই আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, ইতোপূর্বে দেশে যে তিনটি গণভোট হয়েছে সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটে অংশগ্রহণের জন্য কেবলমাত্র জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট কোনটার পক্ষেই সরকারের প্রচার ছিল না।
“কিন্তু এবারে গণভোটে সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ ভোট না দিলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে’ এহেন প্রচার সরকারের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করছে।”
বিশ্লেষকরাও বলছেন, গণভোট নিয়ে সরকার একটি পক্ষ নিয়ে ফেলায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফ্ল্ডি’ থাকছে না।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরাসরি আপনি ‘হ্যা’-তে ভোট দেন–এ কথা বলাটা ঠিক না। যেহেতু এটা নিরপেক্ষ নির্বাচন, সবসময় নিরপেক্ষ হয়। ভোট দেওয়ার আগে জনগণের জানার রাইট আছে যে আমি ‘হ্যাঁ’ বললে কীসের জন্য বলব? ‘না’ বললেই বা কেন আমি ‘না’ বলছি? কিন্তু সেসব না জানায় যেটা হচ্ছে, পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যা বলবে তারা সেই দিকেই ভোটটা দেবে।”
রাজনীতি বিশ্লেষক সাব্বীর আহমেদও মনে করছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকারের প্রচার চালানো ‘নৈতিক জায়গা থেকে সঠিক নয়’।
“তারা (সরকার) বলতে পারে যে আপনারা গণভোট দিতে আসুন। পুরো সরকার এবং রাজনৈতিক দল সবারই নিরপেক্ষ থাকা উচিত।”

সরকার কী বলছে?
গণভোটে সরকারের পক্ষ নিতে কোনো সমস্যা দেখছেন না প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট নিয়ে সরকারের তরফে প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ।
শনিবার রাজধানীর বিয়াম অডিটরিয়ামে গণভোট নিয়ে ঢাকা বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “১৯৭২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকার 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে অর্থাৎ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। ২০১৬ সালে ব্রিটেনের কথা আপনারা জানেন। তার মানেটা কি? তার মানে হচ্ছে সরকার যেটা করছেন সেটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ পদ্ধতির বাইরে কিছু নয়।
“ব্রেক্সিটে সরকার অবস্থান নিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেতরে রাখার জন্য, জনগণ ভোট দিয়েছে না এর জন্য। পরবর্তীতে সরকার তা মেনে নিয়ে সেইভাবেই কাজ করেছে। কিন্তু সরকার যে অবস্থানটা নিল সেটা তো বাস্তবতা।”
সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতি থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। দেশে যতবার গণভোট হয়েছে ‘প্রতিবারই’ সরকার একটা পক্ষ নিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, “আমরা যে গণভোটের পক্ষে যে প্রচার চালাচ্ছি এটা সংস্কারের প্রতি যে আমাদের কমিটমেন্ট, সেই কমিটমেন্ট থেকেই করা হয়েছে। আমরা প্রথম থেকে বলেছি আমরা চাই বাংলাদেশে অনেক সংস্কার হোক। যেটা আমাদের পক্ষে করার কথা সেগুলো আমরা করছি।
"যেই সংস্কারটা আমরা করতে পারব না, কারণ যেটার জন্য সংবিধান পরিবর্তন লাগে, সেটা আমরা গণভোটে দিয়েছি, আমরা লোকের কাছে আপিল করছি। আমরা তো প্রথম থেকে কোনো ভান-ভনিতা করছি না। আমরা সংস্কারের পক্ষে।"
তিনিও দাবি করেন, এর আগে বাংলাদেশে যত গণভোট হয়েছে, ‘সবসময়’ সরকার একটা পক্ষ নিয়েছে।
সংস্কার গণভুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল মন্তব্য করে আসিফ নজরুল বলেন, "এখন আমরা এখানে সংস্কারের পক্ষে বলছি আমরা কি সরকারে থাকব? আমরা তো থাকব না। আমরা সংস্কারের পক্ষে বলছি। এখন আপনি আইনের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
"কিন্তু আইনের ইন্টারপ্রিটেশন একটা অনেক বড় ব্যাখ্যা হচ্ছে আল্টিমেট আপনার উদ্দেশ্যটা কি? উদ্দেশ্য কি জনকল্যাণ, জনগণের স্বার্থ, রাষ্ট্রের স্বার্থ। আমরা সেটার পক্ষে দাঁড়িয়েছি। আমরা কিন্তু কোনো দলের পক্ষে দাঁড়াই নাই। কারণ আপনি দেখবেন সব দল সংস্কারের কথা বলেছে। যারা এই সংলাপে অংশ নিচ্ছে সবাই সংস্কারের কথা বলেছে।”
গণভোটে 'হ্যা'-এর পক্ষে বলার অধিকার যেমন সবার আছে, তেমনি 'না'-এর পক্ষে বলার অধিকারও যে সবার আছে, সে কথা স্বীকার করলেও ‘কিন্তু’ রেখে দিয়েছেন আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, "এখন আপনি যদি মনে করেন আপনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে চান; দেশে বৈষম্য, তারপরে নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন আগের মতই অব্যাহত থাকুক, আমার কোন সমস্যা নাই; আপনি বলেন আমি 'না'-এর পক্ষে আছি, সমস্যা নাই।
"কিন্তু কাউকে এই প্রচারণা থেকে বিরত রাখার কোন অধিকার আমাদের নাই, কোনো ইচ্ছা আমাদের নাই। আমরা মনে করি যে এটা মানুষের বিবেক বোধের ব্যাপার। ১৫ বছর আপনারা দেখেছেন শাসনতান্ত্রিক সংস্কার না হলে কী অবস্থা হতে পারে। এটা আপনাদের ব্যাপার।"
সরকার ‘হ্যাঁ’-ভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারে?
সরকার, অনেক রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা এখন সরব গণভোটের প্রচারে; হ্যাঁ-এর পক্ষে তারা ভোট চাইছেন। অথচ গণভোটে কোনো দল নেই, প্রার্থীও নেই। গণভোটের আলাদা আচরণবিধিও নেই।
১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা সময় শুরু হবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পরদিন ২২ জানুয়ারি।
গণভোট অধ্যাদেশের (অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি) ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, আচরণবিধি মূলত সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ও দলের জন্য। গণভোটে কোনো প্রার্থী নেই, রাজনৈতিক দলও নেই।
“তারপরও আমরা বলব-পলিটিক্যাল পার্টিরা প্রকাশ্যে ২১ জানুয়ারির আগে (হ্যাঁ/না) এটা না করাটা ভালো, এটাই উচিত। আগাম প্রচারণা সমীচীন না।”
সরকার এক্ষেত্রে পক্ষ নিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “সরকার অনেক কষ্ট করে দেশের স্বার্থে, ভবিষ্যতের স্বার্থে সংস্কারের কাজটা করেছে। তারাই জুলাই সনদ বানিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে বললে আমি এটাকে অসঙ্গত মনে করব না।”
তবে রিটার্নিং অফিসার কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারেন না বলে এই নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য।
“সংসদ ও গণভোটের ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার নিরপেক্ষ থাকবেন-এটাই নিয়ম। ভায়োলেট করলে আমরা দেখব। গণভোটের জন্য তো আমরাও প্রচার করছি। গণভোটের বিষয়টি প্রচার করতে পারবে; কিন্তু পক্ষে বা বিপক্ষে অভিমত জানাতে পারবে না; কোনো পক্ষাবলম্বন করতে পারবে না।”
নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিমও বলছেন, সরকার ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাতে পারবে না–এমন কোনো আইনি বিধিনিষেধ নেই। তবে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এর সঙ্গে ‘না জড়ালেই ভালো হত’।
“যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংযুক্ত, তারা যেন ক্যাম্পেইন না করে। ধরেন একজন রিটার্নিং অফিসার অথবা একজন সরকারি অফিসার, উনি তো এটা কন্ডাক্ট করবেন। অথবা একজন প্রিজাইডিং অফিসার, একটা স্কুলের ধরেন শিক্ষক বা কলেজের অধ্যাপক; উনি যদি ক্যাম্পেইন করেন, তার মানে কি উনি কি ভোট কেন্দ্রে গিয়েও ক্যাম্পেইন করবেন? মানুষকে বলবেন যে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দেন?”
তবে অতীতে প্রতিটি গণভোটে সরকার কোনো একটি পক্ষ নিয়েছে-আইন উপদেষ্টার এমন দাবির সঙ্গে একমত নন সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৯১ সালের গণভোটের ক্ষেত্রে কথাটি বেঠিক। ওই গণভোটে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সরকার (সংবিধান অনুযায়ী) এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা (অপারেশনাল সরকার) ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এবারের সরকারের মত একপক্ষে অবস্থান নেয়নি। তারা বিষয়টি জনমতের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
তার ভাষ্য, ১৯৯১ সালের গণভোটের সময় সরকারের দুটো কৌশলগত অংশ ছিল, একটি অরাজনৈতিক (প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমেদ নেতৃত্বাধীন)। অপরটি রাজনৈতিক (খালেদা জিয়া এবং তার মন্ত্রিসভা)।
“এবারতো পুরো সরকারটাই অরাজনৈতিক এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের মত। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ গণভোট নিয়ে টু শব্দটিও করেননি।”
সেই সময় মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “আমি গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, স্কুল, কলেজে হাজার খানেক উদ্বুদ্ধকরণ সভা করেছি।
“আমার বক্তব্য ছিল, আপনারা দয়া করে ভোট কেন্দ্রে আসবেন এবং যে পক্ষে ইচ্ছা হয়, সে পক্ষে ভোট দেবেন। ভোট কোন পক্ষে দেবেন, সে বিষয়ে আপনি স্বাধীন। সে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আপনার। এ বিষয়ে সরকারের, নির্বাচন কমিশনের এবং আমার কোনো বক্তব্য নেই।
“আমার আবেদন, আপনারা কষ্ট করে ভোট কেন্দ্রে আসবেন এবং আপনার মতামতটা স্বাধীনভাবে দিয়ে যাবেন। আমরা সন্ধ্যায় আপনাদের মতামতের যোগফল জানিয়ে দেব এবং নির্বাচন কমিশনে পাঠাব।”