২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ভারতের বড় উত্থান, রপ্তানি বেড়েছে ৫৬ গুণ

ভারত সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ৩ লাখ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং ৫০ হাজার কোটি রুপির রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ভারতের বড় উত্থান, রপ্তানি বেড়েছে ৫৬ গুণ

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 21 Sep 2026, 01:07 AM

Updated : 21 Sep 2026, 01:08 AM

গত এক দশকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে ভারতে। একসময় আমদানিনির্ভর দেশটি এখন নিজেদের অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানিও করছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি রুপির তুলনায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

পাঁচ বছর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে এই উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ৬৪৩ কোটি রুপি। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল ৪৩ হাজার ৭৪৬ কোটি রুপি।

ভারত সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ৩ লাখ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং ৫০ হাজার কোটি রুপির রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের এই উত্থানের পেছনে ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়নীতি পরিবর্তন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর মত বিষয়গুলো কাজ করছে।

প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়েছে তিন গুণের বেশি

গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার কোটি রুপি।

নতুন সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও উন্নয়নে সরাসরি ব্যয় করা মূলধনি বরাদ্দও বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৯৪ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯৫ লাখ রুপি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি রুপিতে।

এই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মূলত সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হয়।

রপ্তানি বেড়েছে কতটা

ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চিত্র পাওয়া যায় রপ্তানির পরিসংখ্যানে।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারত মাত্র ৬৮৬ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি করেছিল। গত অর্থবছরে সেই রপ্তানি বেড়ে রেকর্ড ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে রপ্তানি বেড়েছে ৫৬ গুণেরও বেশি।

আগের অর্থবছরে প্রতিরক্ষা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৬২২ কোটি রুপি। সে হিসাবে এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ৮০টির বেশি দেশে যাচ্ছে।

রপ্তানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বেড়েছে। গত অর্থবছরে বেসরকারি সমরাস্ত্র কোম্পানিগুলো ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানির ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি ছিল ২১ হাজার ৭১ কোটি রুপি বা ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

সামগ্রিক উৎপাদনেও বেসরকারি খাতের অংশ বেড়ে ২৪ শতাংশে উঠেছে। বাকি প্রায় ৭৬ শতাংশ উৎপাদন এসেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলো থেকে।

যুদ্ধের সময় সরবরাহ নিশ্চিত করতেও বাড়ছে সক্ষমতা

টাইমস অব ইনডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের এই সম্প্রসারণ শুধু উৎপাদনের পরিসর বাড়ানোর বিষয় নয়। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সময় গোলাবারুদের চাহিদা দ্রুত পূরণ করা, ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো সহজ হতে পারে।

একই সঙ্গে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদের সামরিক সরঞ্জামের উন্নয়ন ও পরিবর্তন করার সুযোগও বাড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোয় যুদ্ধ সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করার গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে। নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতিতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প সক্রিয় থাকলে বিদেশ থেকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

দেশীয় নকশা ও উৎপাদনে ৬ লাখ কোটি রুপির অনুমোদন

ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিষদ দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নকশা করা এবং ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তৈরি ৬ লাখ কোটি রুপির বেশি মূল্যের বিভিন্ন সমরাস্ত্র কেনার অনুমোদন দিয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি প্রকল্প হল ৬২ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে ৯৭টি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান এবং প্রায় ৬২ হাজার ৭০০ কোটি রুপি ব্যয়ে ১৫৬টি এলসিএইচ প্রচণ্ড হালকা যুদ্ধ বিমান ও হেলিকপ্টার কেনা।

এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু সামরিক বাহিনীর সরঞ্জামের চাহিদা পূরণ করা নয়, দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো।

২০১৬ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয় নীতিতে দেশীয় উৎপাদনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পদ্ধতিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নকশা, উন্নয়ন ও উৎপাদনে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়ানো হয়।

স্টার্টআপ ও ছোট কোম্পানিকে উৎসাহ

প্রতিরক্ষা খাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করছে ভারত।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত উদ্ভাবনভিত্তিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে ৬৭৬টি নতুন কোম্পানি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উদ্ভাবককে।

এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের ৫৫১টি নকশা ও উন্নয়ন চুক্তি হয়েছে। এ কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে ৪৯৮ কোটি ৭৮ লাখ রুপি।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৭৫০ কোটি রুপির একটি পৃথক কর্মসূচি অনুমোদন করা হয়।

প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলের আওতায় প্রতিটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি রুপি পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৩৩৪ কোটি রুপি ব্যয়ে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন ছিল। পাশাপাশি উন্নত ও উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য আরও ৫০০ কোটি রুপির তহবিল অনুমোদন করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৩৪টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় ২ হাজার ১৮০টি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি সই হয়েছে এবং শিল্পখাতে ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৭৮০টির বেশি মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করা হয়েছে।

দেশীয়ভাবে সংগ্রহের জন্য ১০টি তালিকায় ৫ হাজার ৫২১টি পণ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পণ্য এখন সামরিক বাহিনীকে দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করার কথা।

ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের একটি অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে ৪১ হাজারের বেশি সরবরাহকারী ও ২ লাখ ৭০ হাজার পণ্য যুক্ত হয়েছে।

প্রতিরক্ষা গবেষণায় বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি

ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দও বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ রুপি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ১০০ কোটি ২৫ লাখ রুপি, প্রবৃদ্ধি ১১২ শতাংশের বেশি।

২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের ২৫ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নতুন উদ্যোগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

সরকারি পরীক্ষাগারগুলোকেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার ২৪টি পরীক্ষাগারের বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহার করে নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে নির্মাতা ও নতুন কোম্পানিগুলো।

গোলাবারুদের ৯১ শতাংশই দেশীয়

ভারতের স্থলবাহিনীর গোলাবারুদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেশীয় সক্ষমতা বেড়েছে। বাহিনীর মজুদে থাকা ১৭৫ ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ১৫৯ ধরনের উৎপাদন এখন ভারতেই করা হচ্ছে। ফলে গোলাবারুদের ক্ষেত্রে দেশীয়ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণতার হার প্রায় ৯১ শতাংশে পৌঁছেছে।

এসব পরিবর্তনের ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা খাত এখন নকশা, গবেষণা, পরীক্ষা, উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন ও রপ্তানিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসছে।

টাইমস অব ইনডিয়া লিখেছে, দেশীয় সক্ষমতা বাড়লেও আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়। প্রতিটি উপাদান দেশে তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। কিন্তু আমদানিনির্ভরতা কমলে সংকটের সময় খুচরা যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও কারিগরি সহায়তার জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি কমতে পারে।