আরবের পথে মোগল রাজকন্যার দুঃসাহসিক যাত্রা, ইতিহাসে উপেক্ষিত

গুলবদনের এই মক্কাযাত্রা একদিকে যেমন ছিল সাহসিকতা ও মহানুভবতার উদাহরণ, অন্যদিকে এটি ছিল এক ধরনের ‘বিদ্রোহ’।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Feb 2024, 09:46 AM
Updated : 16 Feb 2024, 09:46 AM

আজ থেকে ৪৪৮ বছর আগে, ১৫৭৬ সালের শরতের একদিন; মোগল  রাজ পরিবারের একদল নারী যাত্রা করেছিলেন মুসলিমদের পবিত্র নগরী মক্ক ও মদিনার পথে। আর সেই অভূতপূর্ব সমুদ্রযাত্রার নেতৃত্বে ছিলেন খোদ এক মোগল রাজকন্যা।

মোগলদের সময় সেটিই ছিল কোনো নারীর প্রথম এই তীর্থযাত্রা, যা মুসলিমদের কাছে পরিচিত হজ নামে।

সেই নারী তীর্থযাত্রীদের যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের কন্যা গুলবদন বেগম। ৫৩ বছর এই বাবরকন্যার নেতৃত্বে সেদিন রাজপরিবারের ১১ জন নারী ফতেহপুর সিক্রির হারেম থেকে রওনা হয়েছিলেন দীর্ঘ ছয় বছরের এক কঠিন যাত্রায়।

কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি- নতুন যুগের সূচনাকারী এই তীর্থযাত্রার খুব বেশি তথ্য নেই ইতিহাসের পাতায়।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, সে সময়কার পুরুষ ইতিহাসবিদরা সম্ভবত এই নারীদের ‘সম্মান ও পবিত্রতা’ রক্ষার কথা ভেবেই তাদের ভ্রমণের তথ্য লিপিবদ্ধ করে যাননি।

গুলবদনের এই মক্কাযাত্রা একদিকে যেমন ছিল সাহসিকতা ও মহানুভবতার উদাহরণ, অন্যদিকে এটি ছিল এক ধরনের ‘বিদ্রোহ’।

লেখক ইতিহাসবিদ রুবি লাল তার ‘ভ্যাগাবন্ড প্রিন্সেস: দ্য গ্রেট অ্যাডভেঞ্চার্স অব গুলবদন’ বইয়ে তেমনটাই বলেছেন। এ মাসের শেষদিকেই প্রকাশিত হবে বইটি। 

মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম এবং একমাত্র নারী ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাত গুলবদন বেগম সম্পর্কে ‘হুমায়ূননামায়’ কিছু কথা থাকলেও অশ্চর্যজনকভাবে তার ভ্রমণ সম্পর্কে কিছুই নেই তাতে। আর অসম্পূর্ণ এই বইটির কিছু পাতাও উধাও হয়ে গেছে।     

ইতিহাসবিদ রুবি লাল সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় অটোম্যান ইতিহাস, পার্সিয়ান এবং মোগল সময়কালের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি ও বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে এই মোগল রাজকন্যার অজানা ভ্রমণবৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন তার বইয়ে। 

“রাজপরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ঘটনা লিখে রাখাটা একটি সাধারণ বিষয় ছিল তখন। সে সময় গুলবদনও লিখতেন। কিন্তু গুলবদনের বইয়ের সম্পূর্ণ একটি কপিও নেই। শক্তিশালী চরিত্রের একজন নারীকে ঘিরে এমন নীরবতা অনেক কথাই বলে,” বলেন এই ইতিহাসবিদ।

ইতিহাস বলছে, গুলবদনের জন্ম ১৫২৩ সালে কাবুলে। বাবরের তৃতীয় স্ত্রী দিলদার বেগম জন্ম দেন গুলবদনের। হিন্দুস্তান জয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাবর তখন ছিলেন কাবুল থেকে বহু ক্রোশ দূরে। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন হিন্দুস্তান নামেই পরিচিত ছিল।

বিভিন্ন যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বাবর যখন ঘরে ফিরতেন, তখনই কেবল খুব অল্পসময়ের জন্য বাবার সঙ্গে দেখা হতো গুলবদনের। এভাবেই তিনি অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন। সৎ ভাই হুমায়ূন এবং ভাগ্নে আকবরের মতো রাজপরিবারের ক্ষমতাবান পুরুষদের সঙ্গেও তার এমন কালেভদ্রে দেখা হতো।

রাজপরিবারের পুরুষরা রাজ্যের সীমানা বাড়ানোর জন্য যখন বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত, সে সময় সম্রাটের মা-খালা, বোন, সম্রাটের অন্য স্ত্রী ও তাদের মেয়েদের মতো ক্ষমতাবান নারীদের সংস্পর্শে বেড়ে ওঠতে থাকেন গুলবদন বেগম।

অন্দরমহলের বাসিন্দা হলেও রাজকর্মে এই নারীরা রাখতেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; সম্রাট এবং রাজপুত্রদের কাছে তারা ছিলেন আস্থাভাজন পরামর্শদাতা।

গুলবদনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শুরু হয় শিশু বয়সেই। প্রথম মোগল কন্যা হিসেবে মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি কাবুল থেকে আগ্রা যান। সে সময় বাবর কেবল আগ্রা দখল করেছেন।  এরপর শের শাহ সুরির হাতে হিন্দুস্তান থেকে যখন বিতাড়িত হয়ে জন্মস্থান কাবুলে ফেরেন, তখন গুলবদন বিবাহিত একজন নারী।

কয়েক মাস ধরে ভ্রমণে যাত্রায় গুলবদন এবং রাজপরিবারের নারীরা তাঁবুতে রাত্রিযাপন করতেন; কখনো পালকিতে কিংবা কখনো ঘোড়ার পিঠে চড়ে মাইলের পর মাইল বিপদস্কুল পাহাড়ি পথ তারা পাড়ি দিয়েছেন। যাত্রাপথে চোর-ডাকাত ছাড়াও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হয়েছে তাদেরকে।

ইতিহাসবিদ রুবি লাল বলেন, “মোগল নারীরা এ ধরনের যাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন। কারণ পুরুষদের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধযাত্রার সময় তাদেরকে প্রায়ই নতুন জায়গায় যেতে হতো কিংবা অস্থায়ী শিবিরে থাকতে হতো।”

সম্ভবত এ কারণেই মোগল রাজকন্যা গুলবদন ১৫০০ সালের শেষদিকে ভাগ্নে আকবরের কাছে হজযাত্রার অনুমতি চেয়েছিলেন, ভাষ্য রুবি লালের।

এই ইতিহাসবিদ তার বইয়ে লিখেছেন, মোগল রাজবংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় আকবরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বরাবরই ছিল; হিন্দুস্তানে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি আকবর নিজেকে পবিত্র এবং তার অপ্রতিরোধ্য আধ্যাত্মিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেছিলেন।     

আকবরই প্রথম মোগল শাসক যিনি রাজপরিবারের সব নারীদের নির্জন হারেমে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সম্রাট আকবর সম্পর্কে লাল তার বইয়ে লিখেছেন, রাজপরিবারের নারীদের দুর্ভেদ্য হারেমে রাখার অর্থ ছিল তাদের কাছে (আকবরের) নিজের গরিমার প্রমাণ দেওয়া।

কিন্তু হারেমের বন্দিজীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন গুলবদন এবং সম্রাটকে জানান, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনি মক্কা যেতে মনস্থির করেছেন। অবশেষে ১৫৭৬ সালের অক্টোবরে তিনি এবং রাজপরিবারের কয়েকজন নারী মক্কাযাত্রা করেন।

‘সালিমী’ এবং ‘ইলাহী’ নামের দুটি জাহাজ তাদের সমুদ্রযাত্রার জন্য ঠিক করে দেন সম্রাট আকবর। রাজকীয় জাহাজ দুটিতে ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা বোঝাই কয়েকটি বাক্স, নগদ কয়েক হাজার রুপি এবং ১২ হাজার পোশাক।

“সাধারণ নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুণ এবং শিশুরা মোগল রাজধানী ফতেহপুর সিক্রির লাল পাথুরে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দেখেছিল তাদের বিদায়যাত্রা,” লিখেছেন ইতিহাসবিদ রুবি লাল।

কিন্তু শুরু থেকেই তাদের এই যাত্রা ছিল বিপদসঙ্কুল। মক্কা অভিমুখী সমুদ্রপথটি তখন ছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে। মুসলিমদের জাহাজ লুণ্ঠন এবং পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য কুখ্যাত ছিল পর্তুগিজরা। অন্যদিকে পারস্য হয়ে মক্কা যাওয়ার স্থলপথটিও ছিল অনিরাপদ। এই পথে প্রায়ই পর্যটকদের ওপর সশস্ত্র বিভিন্ন দলের হামলে পড়ার ঘটনা ঘটত।

পর্তুগিজ হামলা এড়িয়ে নিরাপদযাত্রার জন্য গুলবদন এবং তার সঙ্গীদেরকে সুরাট বন্দরে প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এরপর চার সপ্তাহে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছেন জেদ্দায়। সেখান থেকে উটের পিঠে টানা কয়েকদিন উত্তপ্ত মরুভূমিতে চলার পর মক্কায় পৌঁছেন।   

কিন্তু মক্কা পৌঁছানোর পরই সময়টিই ছিল মূলত গুলবদনের ভ্রমণের আকর্ষণীয় অধ্যায়। গুলবদন এবং তার সঙ্গীরা চার বছর আরবে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রুবি লালের বইয়ে লেখা হয়েছে- “হারেম ছাড়ার সিদ্ধান্তে একমত হওয়ার পর তারা একইভাবে যাযাবর, মুজায়ির (সাময়িকভাবে) হয়ে মরুভূমিতেও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।”

বিপুল মুদ্রা এবং মূল্যবান জিনিসপত্রের কারণে তারা সবার আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ান। মোগল রাজকন্যার দানশীলতা ক্ষুব্ধ করে তোলে অটোম্যান সুলতান মুরাদকে। রাজকন্যার কর্মকাণ্ডকে তিনি সম্রাট আকবরের রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখেছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গুলবদন ও তার সঙ্গী নারীদের আরব থেকে উৎখাতে তিন তিনবার ফরমান জারি করেছিলেন। কিন্তু কোনোবারই গুলবদন আরব ছাড়তে রাজি হননি।

“এটি ছিল একজন মোগল নারীর অপ্রত্যাশিত বিদ্রোহের নজির। এতেই বোঝা যায়, গুলবদন তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে কতটা দৃঢ়চেতা ছিলেন,” বলেন রুবি লাল।

গুলবদনের একরোখা মনোভাবের কারণে বিরক্ত হয়ে সুলতান নিন্দাসূচক শব্দ- ‘না মেশরু’ (অনিয়ম কিংবা ভুল কাজের জন্য তিরষ্কার) বলেছিলেন। শব্দটি এতটাই গুরুতর ছিল যে, আকবরের কানে পৌঁছালে তিনিও রুষ্ট হয়েছিলেন।

১৫৮০ সালে সুলতানের সর্বশেষ ফরমান জারির পর গুলবদন এবং তার সঙ্গীরা আরব ত্যাগ করে দেশের পথে রওনা হন এবং ১৫৮২ সালে ফতেহপুর সিক্রির ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে খানওয়া এলাকায় পৌঁছেন।

হিন্দুস্তান পৌঁছানোর পর গুলবদনকে ‘নবাব’ হিসেবে সম্মান দেখানো হয়। খোদ আকবর তাকে স্বাগত জানান। আকবরের নিজের হাতে লেখা ‘আকবরনামা’তে একমাত্র নারী হিসেবে তার অবদানও লিপিবদ্ধ হয়েছে।   

কিন্তু আকবরনামার একটি অধ্যায়ে গুলবদনের মক্কা সফরের কথা উল্লেখ থাকলেও আরবে তার অবস্থান এবং সুলতান মুরাদের সমালোচনা করে কিছুই লেখা হয়নি এতে।