Published : 13 Apr 2026, 05:06 PM
হাঙ্গেরির প্রবীণ জাতীয়তাবাদী নেতা ভিক্টর অরবান টানা ১৬ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার পর উদীয়মান মধ্য-ডানপন্থি দল তিসার কাছে ক্ষমতা হারিয়েছেন।
রোববারের সাধারণ নির্বাচনে তার এ হার রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে থাকা তার মিত্রদের জন্যও বড় ধাক্কা, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীলদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, বিশেষ করে তার অনুদার গণতন্ত্রের ধারণার জন্য। কিন্তু অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অলিগার্কদের হাতে আরও সম্পদ চলে যাওয়ায় তিনি দেশের ভেতর ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন।
তার বড় হার হাঙ্গেরির ১৯৯ আসনের পার্লামেন্টে ৪৫ বছর বয়সী পেতর মদ্যার নেতৃত্বাধীন তিসাকে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা উপহার দিয়েছে। এর ফলে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনা থেকে রেহাই পাবে আর আটকে থাকা অনেক গণতান্ত্রিক সংস্কারের দিকে অগ্রসর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রায় সব ব্যালট গণনা শেষে তিসা পার্লামেন্টের ১৩৮টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে মদ্যার অরবানের সাংবিধানিক সংস্কার বাতিল করে দেশকে আগের জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে পারবেন।
রোববারের নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পড়াতেই বোঝা যাচ্ছিল, এই নির্বাচনকে হাঙ্গেরির অনেকেই দেশের জন্য সন্ধিক্ষণ মনে করেছিলেন।
“আমরা পেরেছি। তিসা ও হাঙ্গেরি এই নির্বাচনে জয়ী হয়েছে,” বুদাপেস্টের কেন্দ্রে অনন্য সুন্দর দানিউব নদীর তীরে উল্লসিত, নাচতে থাকা হাজার হাজার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে নির্বাচনে জেতার পর এমনটাই বলেন মদ্যার।
মদ্যার যখন মঞ্চের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, সেসময় লাউডস্পিকারে বাজছিল ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার ‘মাই ওয়ে’, রাতের সেই মুহূর্তে অনেক সমর্থক জ্বলন্ত মোমবাতি ধরে ছিলেন।
“একসঙ্গে আমরা অরবানের দেশ চালানোর ব্যবস্থা বদলে দিয়েছি, আমরা হাঙ্গেরিকে মুক্ত করেছি, দেশের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছি,” বলেন মদ্যার।
তিনি এ নির্বাচনকে হাজির করেছিলেন, ‘পূর্ব বনাম পশ্চিমের’ দ্বন্দ্ব হিসেবে। ভোটারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, অরবান ও ব্রাসেলসের সঙ্গে তার বিরোধ হাঙ্গেরিকে ইউরোপের মূল ধারা থেকে অনেক দূরে ছিটকে দেবে। অন্যদিকে অরবান বলেছিলেন, তিসা জিতলে তারা হাঙ্গেরিকে রাশিয়ার সঙ্গে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে। মদ্যার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
“নির্বাচনের ফল আমাদের জন্য বেদনাদায়ক, তবে স্পষ্ট,” ফলাফল জানার পর তার রাজনৈতিক দল ফিদেসের নির্বাচনী কার্যালয়ে এমনটাই বলেন অরবান। টেলিভিশনের স্ক্রিনে তার ভাষণ চলার সময় বাইরে থাকা তার অনেক সমর্থককে কাঁদতে দেখা গেছে।
অরবানের ১৬ বছরের শাসন অবসানের প্রভাব যে কেবল হাঙ্গেরিতেই পড়বে তা নয়, এর প্রভাব দেখা যাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউক্রেইন এমনকি মহাদেশের বাইরেও।
ইউরোপের অনেক নেতাই এখন আশা করবেন, অরবান আমলে হাঙ্গেরি যেরকম ইউরোপের ইউনিয়নের ভেতরেই মূলধারার বিরোধিতা করতো, এখন থেকে তা আর দেখা যাবে না। ফলে ইউরোপের এ জোট যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেইনকে ৯ হাজার কোটি ইউরো ঋণ দেওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারবে, অরবান যা হতে দিচ্ছিলেন না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতাবা রহমান বলছেন, মাদ্যার এখন দুর্নীতি নির্মূল এবং গুরুত্বপূর্ণ সব পদ থেকে ফিদেস অনুগতদের সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
“মাদ্যার ইউক্রেইনে ৯ হাজার কোটি ইউরো পাঠাতে রাজি হতে পারেন। ভোটের আগে তিনি অনেক সতর্ক ছিলেন। কিন্তু এখন ফিদেসের ভোটারদের মন জয়ের দরকার নেই। যে কারণে আমরা মনে করছি, হাঙ্গেরি এখন ধীরেসুস্থে ইউরোপের বেশিরভাগ বিষয়ে মূলধারার দিকেই অগ্রসর হবে,” বলেছেন তিনি।
তবে অভিবাসনের মতো অনেক বিষয়ে হাঙ্গেরি অরবান আমলের মতোই পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ব্রাসেলসের অনেক কূটনীতিকের আশঙ্কা।
“হাঙ্গেরি এরপরও চ্যালেঞ্জিং অংশীদারই থাকবে, তবে এমন এক অংশীদার হবে যার সঙ্গে অন্য সদস্যরা কাজ করতে পারবে,” বলেছেন একজন।
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রোববার মাদ্যারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আর ইউরোপকে শক্তিশালী করা এবং শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার লক্ষ্যে তার সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
“যখন একটি গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি জয়ী হয় তখন তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে,” টেলিগ্রামে এমনটাই লিখেছেন জেলনস্কি।
অরবানের পরাজয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও হতাশ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে অরবানকেই পুতিনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করা হতো।
তবে কেবল রাশিয়াই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোর ডানপন্থি ঘরানায়ও অরবানের হার জোর ধাক্কা দেবে, এমনকি হোয়াইট হাউসেও।
ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই অরবানের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। তার সমর্থনে নির্বাচনের দিনকয়েক আগে বুদাপেস্ট ঘুরে যান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইউরোপের কট্টর-ডান অনেক নেতাকেও অরবানকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে।
কিন্তু মস্কোর সঙ্গে কূটনীতিক ও রাজনৈতিক অনেক বিষয়ে অরবান প্রশাসনের মাখামাখি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেই তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে বলে মনে করা হচ্ছে।