১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরান যুদ্ধে চীনের শান্তি উদ্যোগ সফল হবে?

ইরানে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে বা এরপর কি ঘটবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ পরিস্থিতিতে শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিয়েছে চীন।

ইরান যুদ্ধে চীনের শান্তি উদ্যোগ সফল হবে?
শি জিনপিং। রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Apr 2026, 01:11 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:17 PM

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ছে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে শান্তি স্থাপনকারীর ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে চীন। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন বলছেন যে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘দুই থেকে তিন সপ্তাহের’ মধ্যে শেষ হতে পারে, তখনও এ যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে বা এরপর কি ঘটবে তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। 

এই পরিস্থিতিতে শান্তি উদ্যোগে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই ইরান যুদ্ধে চীন ও পাকিস্তান এরই মধ্যে এক অভাবনীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

দুই দেশ একটি ‘পাঁচ দফা পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করেছে, যার লক্ষ্য একটি যুদ্ধবিরতি করা এবং অবরুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।

পাকিস্তান আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত, যা ট্রাম্পকে এই দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতা করার বিষয়ে রাজি করাতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হয়।

তবে চীন এই শান্তি উদ্যোগে নামছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ট্রাম্পের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনার আগেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।

চীনের লানচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আফগানিস্তান স্টাডিজ সেন্টার-এর পরিচালক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও মনে করেন, চীনের সমর্থন ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। 

তার মতে, চীন নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে ব্যাপক সমর্থন দিচ্ছে যাতে পাকিস্তান এই সংকটে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। 

যুদ্ধ নিয়ে এতদিন নীরব থাকা চীনের জন্য এ এক দিক পরিবর্তনও বটে। কিন্তু দীর্ঘ নীরবতার পর চীন হঠাৎ এখন কেন শান্তি নিয়ে সক্রিয় হল?

শান্তি পরিকল্পনার নেপথ্যে:

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফর করে ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় তার নিজ দেশের প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থন চাওয়ার পরই শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়। পাকিস্তানের এ চেষ্টায় কাজ হয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উভয় দেশ ‘শান্তির পক্ষে নতুন প্রচেষ্টা’ চালাচ্ছে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা একমত হয়েছে যে, ‘সংলাপ ও কূটনীতিই দ্বন্দ্ব নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ’। 

একই সঙ্গে বিবৃতিতে অবরুদ্ধ জলপথগুলো রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। চীনের এই আগ্রহ কেবল তেলের জন্য নয়, যদিও সেটি একটি বড় কারণ। 

তবে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের কাছে আগামী কয়েক মাস চলার মতো পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে। 

চীন মূলত শান্তিস্থাপনকারীর ভূমিকা নিতে চাইছে, কারণ এই যুদ্ধ শি জিনপিংয়ের কাঙ্ক্ষিত ‘স্থিতিশীলতা’কে বিপন্ন করছে। 

চীনের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশ্বজুড়ে পণ্য বিক্রির জন্য একটি স্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতি দেশটির জন্য একান্ত প্রয়োজন।

‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসি’ এর চীন প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান ম্যাট পটিংগার বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়, তবে সেটি চীনের কারখানা ও রপ্তানিকারকদের জন্য কঠিন হবে। 

“এজন্যই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ইরানকে যুদ্ধ শেষ করার পথ খোঁজার পরামর্শ দেন, তখন আমি সেখানে কিছুটা আন্তরিকতা দেখি। বেইজিং আসলে চিন্তিত যে, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে।”

শিল্প ও বাণিজ্যের ঝুঁকি:

জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীনের শিল্পাঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

তেলের চড়া দাম খেলনা তৈরির প্লাস্টিক থেকে শুরু করে আধুনিক সিন্থেটিক কাপড়, ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সেমিকন্ডাক্টরের শত শত যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল পর্যন্ত সবকিছুর সরবরাহ ব্যবস্থাতেই প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের সঙ্গে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে অনেক ব্যবসায়ী নতুন বাজার খুঁজতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে গত বছর বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। 

এই অঞ্চলটি বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে এবং সুপেয় পানির অভাব থাকা এই অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্পে চীনই বড় বিনিয়োগকারী। 

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাকে ‘পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন অফ চায়না’র অনেক প্রকল্প চলমান রয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণেই চীন সৌদি আরবের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ এবং ইরানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদেশ, উভয় পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। 

তেহরান ও বেইজিংয়ের অংশীদারিত্ব কয়েক দশকের পুরনো; চীন ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তারা ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল কেনে।

চীনের অতীত অভিজ্ঞতা:

এর আগেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিস্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করে চীন সীমিত সাফল্য পেয়েছে। ২০২৩ সালে তারা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে তিক্ততা নিরসনে একটি চুক্তির ব্যবস্থা করেছিল।

২০১৬ সালে সৌদি আরবে এক প্রখ্যাত শিয়া আলেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা হয়েছিল, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। 

চীনের মধ্যস্থতায় তারা পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হয়। বেইজিং আশা করেছিল, এই সুসম্পর্ক আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে আনবে।

এক বছর পর বেইজিং ফাতাহ এবং হামাসসহ ফিলিস্তিনের ১৪টি উপদলের নেতাদের আতিথেয়তা দেয়। 

সেই আলোচনার পর পশ্চিম তীর ও গাজার জন্য একটি জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকারের ঘোষণা আসে। যদিও সেটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে সদিচ্ছার প্রকাশই ছিল বেশি। তবুও এটি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের আগ্রহকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সীমাবদ্ধতা:

তবে চীনের এই শান্তি প্রচেষ্টার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিশ্বজুড়ে চীনের অংশীদারিত্বের কোনও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বা সামরিক সমর্থন নেই। চীনের কাছে অর্থনীতিই সবার আগে। 

এই অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাই তাদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও বলেন, “চীন বড় কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক। তাদের অগ্রাধিকার হল অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনের কোনোভাবেই যুদ্ধে জড়ানো উচিত নয়, এ বিষয়ে দেশটিতে ব্যাপক জনমত রয়েছে।”

তবে এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা আছে। চীনের সেই সামরিক সক্ষমতা নেই যে, তারা চাইলেই মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। প্রতিটি উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে চীনের নিকটতম ঘাঁটিটি পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে। 

২০১৭ সালে স্থাপিত এই ঘাঁটিটি মূলত জলদস্যুতা বিরোধী অভিযানের জন্য একটি লজিস্টিক হাব, সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়। 

আবার ২০২৫ সালের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময়ও চীন একপাশে সরে ছিল এবং তেমন সমর্থন না দেওয়ায় একজন অংশীদার হিসাবে তাদের ভূমিকার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছিল।

আর এখন ইরান যুদ্ধ বন্ধে নতুন শান্তি পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান এখনো সাড়া দেয়নি। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে শি জিনপিং নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং শান্তিস্থাপনকারী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন, যা অন্য পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতার ঠিক বিপরীতে তাকে আলাদাভাবে মহিমান্বিত করছে।

অবশ্য নিজেকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে জাহির করার ক্ষেত্রে চীনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা তাদের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। 

হংকংয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ান দখলে চীনের হুমকি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। 

তাছাড়া চীনের কর্তৃত্ববাদী নেতারা মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যান এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করা কিংবা মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করা কোনও শাসকগোষ্ঠীর নিন্দাও করেন না। 

এই সব কারণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্বজুড়ে ‘নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা’র মুখপাত্র হিসেবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবেন, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। 

তবে চীন একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক খেলোয়াড়। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের যে কিছুটা প্রভাব আছে তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে তাদের আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।