১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতের কৃষিপণ্য থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে একের পর এক দেশ?

জাপান আম ফেরত দিচ্ছে, চীন চাল আটকে দিচ্ছে এবং ইউরোপীয় পরিদর্শকরা মশলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে| তাহলে ফসল এবং বিশ্ববাজারের মধ্যে বাধাটা কোথায়? প্রশ্ন ভারতীয় চাষিদের।

ভারতের কৃষিপণ্য থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে একের পর এক দেশ?
ছবি: আল জাজিরা

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 10:28 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

ফলমূল ও শাকসবজি জীবাণুমুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত 'ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট' (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের লখনৌ শহরের রেহমানপুর গ্রামে অবস্থিত। 

বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুমকে সামনে রেখে কেন্দ্রটিতে রপ্তানির জোর প্রস্তুতি চলার সময়ই গত মার্চে হঠাৎ হাজির হয় জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক দল।

তাদের অসন্তোষেই ওলটপালট হয়ে যায় পুরো হিসাব। শোধন ও মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির অভিযোগে গত মার্চের শেষে ভারত থেকে সব ধরনের আম নেওয়া স্থগিত করে দেয় জাপান।

যদিও রপ্তানিসংক্রান্ত কাগজপত্রের ছাড়পত্র ছিল ভিএইটি কেন্দ্রটির, পণ্য পাঠানোর সময়সূচিও ঠিক হয়েছিল। এমনকি মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যের আমচাষিরা জাপানে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাদের সেরা আলফানসো ও কেশর জাতের আম সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।

আম পাঠানোর মৌসুম শুরুর সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ঠিকঠাক হয়ে যওয়ার সময়েই থমকে দাঁড়ায় এর উৎপাদন কাজ।

শোধন, জীবাণুমুক্তকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ সনদের পুরো প্রক্রিয়া পরীক্ষার পর জাপানি পরিদর্শকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে জাপান ভারত থেকে আম আমদানি স্থগিত করে দেয়।

এরপর গত ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার প্ল্যান্ট প্রটেকশন অথরিটি একটি চিঠি পাঠায়। তাতে জানানো হয়, ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা সনদপ্রাপ্ত সব ভারতীয় আমের চালান প্রবেশ বন্ধ থাকবে, যতক্ষণ না পরিদর্শকরা খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হচ্ছেন যে কাজের মান উন্নত হয়েছে।

ভারত ও জাপানের আম বাণিজ্যে প্রায় দুই দশকের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা।  ১৯৮৬ সালেও ফলখেকো ক্ষতিকর পোকার আশঙ্কায় ভারত থেকে আম আমদানি বন্ধ করা হয়েছিল। 

পরে ভিএইচটি কেন্দ্র তৈরি, পোকা দমন পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং প্রতিবছর পরিদর্শনে রাজি হওয়ার পর ২০০৬ সালে দীর্ঘ ২০ বছরের সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার এই ধাক্কা কেবল আমের ওপর দিয়েই যায়নি। সম্প্রতি চীনের বাজারে ভারতের বাসমতি চালের লাইসেন্স বাতিল এবং হংকং ও ইউরোপের বাজারে ভারতীয় মসলায় অতিরিক্ত কীটনাশক পাওয়ার অভিযোগে কড়াকড়ি, সব মিলিয়ে বিষম বিপাকে পড়েছে ভারতের কৃষি রপ্তানি খাত। 

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার পরও কেন বিশ্ববাজারে একের পর এক এমন ‘লাল সংকেত’ বা বাধার মুখে পড়ছে ভারতীয় পণ্য?

জাপান 'আমাদের গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল'

২০২৬ সালের বাণিজ্য স্থগিতাদেশের ফলে বর্তমানে ভারত থেকে রপ্তানিযোগ্য ছয়টি অনুমোদিত আমের জাত সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে আছে আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বেগুনফুলি, চৌসা ও মল্লিকা। 

এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এসব আম রপ্তানির প্রধান মৌসুম। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের আম আমদানি করেছিল জাপান। 

অর্থের অঙ্কে এটি খুব বড় না হলেও বিশ্ববাজারে জাপানের এই অনুমোদন ছিল ভারতীয় ফলের ‘মানসম্মত হওয়ার বড় সনদ’। 

কারণ জাপানি ক্রেতারা আমের জন্য চড়া দাম পরিশোধ করে, আর দেশটিতে প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়ার মানে হল বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাজারে সহজে স্বীকৃতি পাওয়া।

এমন এক সময়ে জাপানে আম বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা এল, যখন ভারতের আমচাষিরা এমনিতেই সমস্যায় ছিলেন। 

 চলতি মৌসুমে মহারাষ্ট্রের কনকন উপকূলে টানা তাপদাহের কারণে আলফন্সোর ফলন মারাত্মক মার খেয়েছিল; তার ওপর পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে জাহাজের ভাড়াও বেড়ে হয় আকাশচুম্বী। 

তাছাড়া, যেসব রপ্তানিকারক বছরের পর বছর ধরে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যের ভিত তৈরি করেছিলেন, হঠাৎ সব অর্ডার বাতিল হওয়ায় তাদের গুদামজাত আম পচে নষ্ট হচ্ছে।

ভারতের মুম্বাইয়ের ফল রপ্তানিকারক বিক্রম শাহ জাপানের বাজারের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, "পরিমাণের দিক থেকে জাপান বড় বাজার ছিল না, তবে এই বাজারই আমাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিত। ওসাকায় ঘুরে ঘুরে ছয় বছর ধরে যে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করেছিলাম, তা এক মৌসুমেই নষ্ট হয়ে গেল।"

ওদিকে, মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আলফন্সো চাষি রাজেশ পাতিল বলেন, জাপানের মান বজায় রাখতে তিনি ব্যাগিং ও বাছাইয়ের যন্ত্রপাতির পেছনে প্রায় ৮০ হাজার রুপি বিনিয়োগ করেছিলেন। 

কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন স্থানীয় বাজারে পানির দরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে।

চালে জিএমও বিতর্ক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা

গত ১৭ এপ্রিল চীন হঠাৎ করেই ভারতের তিনটি শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে। 

বেইজিংয়ের দাবি, ভারতের চালের চালানে নিষিদ্ধ জিনগত রূপান্তরিত উপাদান (জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম বা  জিএমও)-এর উপস্থিতি মিলেছে।

যদিও চাল ব্যবসায়ীরা এই দাবি অস্বীকার করে জানান যে, চালানের আগে তাদের জিএমও-মুক্ত সনদ দেওয়া হয়েছিল এবং ভারত সরকারও জানায়, দেশের কোনও ধানের জমিতে জিএমও চাষ হয় না। 

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত রেকর্ড ১ হাজার ২৫০ কোটি (১২.৫ বিলিয়ন) ডলারের চাল বিদেশে রপ্তানি করেছে, যা তাদের মোট কৃষি রপ্তানির ২০ শতাংশেরও বেশি।

তবে চীনে পণ্য পাঠানোর সুযোগ বন্ধ হওয়ায়, বিপাকে পড়েছেন সেখানকার নিবন্ধিত ৩ চাল রপ্তানিকারক। আর এ ঘটনা সব ব্যবসায়ীর জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন 'অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি'  (এপিইডিএ) চীনের শর্ত মেনে গত ৮ জুন অনুমোদিত ল্যাবরেটরির তালিকা প্রকাশ করেছে। 

তবে নয়াদিল্লির কৃষিবিজ্ঞানী এসকে সিং জানান, ভারতীয় ল্যাবগুলো কীটনাশক পরীক্ষায় দক্ষ হলেও জিএমও পরীক্ষার আধুনিক 'প্রোটিন অ্যানালিসিস' প্রযুক্তি মূলত নয়াদিল্লি ও হায়দরাবাদেই সীমাবদ্ধ। 

ফলে পাঞ্জাব বা হরিয়ানার রপ্তানিকারকদের শত শত কিলোমিটার দূরে নমুনা পাঠাতে হয়, যা সার্বিক তদারকিকে জটিল করে তুলছে।

অসংগঠিত সরবরাহ ব্যবস্থা

আম ও চালের আগে সতর্কবার্তা এসেছিল ভারতের ঐতিহ্যবাহী মসলা খাত থেকে। 

হংকং ভারতীয় মসলায় ক্ষতিকর উপাদান পেয়ে বেশ কয়েকটি পণ্য তুলে নেয়, যার ১২ শতাংশ নমুনায় মানগত ত্রুটি মেলে। 

অন্যদিকে, ২০২৪ সালে ৩১২টি কড়া বার্তা পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতীয় জিরা পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মূল গলদ ভারতের কৃষিখাতের বিচ্ছিন্ন ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থায়। 

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার কোচির খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বোস বলেন, "চাষি বিক্রি করেন ফড়িয়ার কাছে, তিনি দেন আড়তদারকে, আর সেখান থেকে যায় প্রক্রিয়াজাতকারীর কাছে। এই হাতবদলের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জমিতে কী কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং থাকে না।" 

আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে তিনি চাষিদের জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের বিস্তারিত তথ্য ডিজিটাল রেকর্ডে রাখা বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দেন।

প্রতিযোগীদের তুলনায় কোথায় পিছিয়ে পড়ছে ভারত?

ভারতের প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে গেছে। থাইল্যান্ড দেশব্যাপী ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করেছে, ভিয়েতনাম চাষিদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং চিলি ও ব্রাজিল কোল্ড-চেইন (শীতল পরিবহন ও সংরক্ষণ) খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে।

অন্যদিকে, ভারতে পণ্যের মান নিশ্চিত করার প্যাক হাউস রয়েছে মাত্র ২০৭টি, যার ৭২ শতাংশই আবার শুধু মহারাষ্ট্রে। 

অবকাঠামো ও পরিবহনের জটিলতায় রপ্তানি পণ্যের মোট মূল্যের প্রায় ১৫ শতাংশই নষ্ট হয়, যা উন্নত দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। 

এছাড়া, ভারতের ৮৬ শতাংশের বেশি কৃষকই ক্ষুদ্র চাষি (২ হেক্টরের কম জমির মালিক), যার ফলে একক মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্তের মতে, ভারত এতদিন উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম বাজারগুলো চায় বিশ্বস্ত মান। 

যদিও গত এক দশকে ভারতের নিবন্ধিত ল্যাব ২২টি থেকে বেড়ে ৮৯টিতে এবং রপ্তানি সনদ ৬১ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজারে উন্নীত হয়েছে, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি উৎপাদক হওয়ার পরও বৈশ্বিক কৃষি রপ্তানিতে ভারতের শেয়ার মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যে তা মাত্র ১৭ শতাংশে আটকে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ শতাংশ এবং চীনে ৫০ শতাংশ।

বাণিজ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানান, সরকার অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও ক্ষতিকর উপাদান নিয়ন্ত্রণে ল্যাবের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন তহবিল বরাদ্দ করেছে এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা জোরদার করছে।

তবে সরকারি উদ্যোগ ধীরগতির হওয়ায় মাঠপর্যায়ে চরম লোকসানে পড়ছেন চাষিরা। গুজরাটের কেসর আমচাষিরা ক্রেতা হারিয়েছেন, হরিয়ানার কার্নালের বাসমতি ধানচাষিদের স্থানীয় বাজারে চালের দাম ৮ শতাংশ কমে গেছে এবং তামিলনাড়ুর এক হলুদ ব্যবসায়ীর লাভের ১০ শতাংশ অর্থ কেবল পরীক্ষা ফি দিতেই বেরিয়ে যাচ্ছে।

ভারতে যেখানে ৪২ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত, সেখানে জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান ২০ শতাংশেরও কম।

 অনিল গুপ্তের ভাষায়, "এটি কেবল কয়েকটি চালান বাতিল হওয়ার ঘটনা নয়; বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাওয়া অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন মান নিশ্চিত করার শক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন একমাত্র পথ।"