১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

হামাস ও ইসরায়েলের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক কোনও অগ্রগতি ছাড়াই শেষ

হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনা কোনও বড় অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে।

হামাস ও ইসরায়েলের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক কোনও অগ্রগতি ছাড়াই শেষ
মিশরে প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসির সঙ্গে জ্যারেড কুশনার। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Aug 2026, 12:48 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:51 PM

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা এবং বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার গাজা যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে প্রথমে মিশরে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস এবং পরে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনও বড় অগ্রগতি বা সফলতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

গাজার জন্য প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে রোববার মিশরে হামাসের নেতাদের সঙ্গে নজিরবিহীন এক একান্ত কূটনৈতিক বৈঠক করেন জ্যারেড কুশনার। ২ ঘন্টারও বেশি সময় এই বৈঠক হয়েছে।

কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গাজা শান্তি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস) এর মহাসচিব নিকোলায় ম্লাদেনভ এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ওদিকে, হামাসের পক্ষ থেকে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন নেতা খলিল আল-হায়া।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে এল যখন ওয়াশিংটন গাজার জন্য প্রস্তাবিত ১৫-দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইছে, যে পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে এই শান্তি পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ করে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসকে নিষিদ্ধ গোষ্ঠী মনে করলেও গাজা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন গোষ্ঠীটির সঙ্গে বৈঠক করেছে। 

হামাস নেতাদের সঙ্গে কেন বৈঠক করলেন কুশনার?

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসকে নিষিদ্ধ, ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে দেখে। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যার বেশিরভাগই হয়েছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মার্কিন দূত কুশনার এবং হামাস নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগকে মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ এর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও প্রভাষক মাহজুব জুয়েরি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ফিলিস্তিনি সমাজে হামাস এমন এক রাজনৈতিক শক্তি যাকে উপেক্ষা করা যায় না- সেই বাস্তবতার কাছে যুক্তরাষ্ট্রে এক ধরনের নতিস্বীকারই বলা যায় কুশনারের প্রতিনিধি দল ও হামাসের মধ্যকার সরাসরি এই বৈঠককে।

তিনি বলেন, হামাসকে কোণঠাসা করার ইসরায়েলের চেষ্টার পরও ওয়াশিংটন স্বীকার করে যে, সমস্যার যে কোনও স্থায়ী সমাধানের জন্য হামাস একটি অপরিহার্য পক্ষ বা শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

আর এই বিষয়টিই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে আসছেন এবং তিনি মার্কিন নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী বলে উল্লেখ করেন জুয়েরি।

ওদিকে, ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক 'ভিশন সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট'-এর পরিচালক আহমেদ আতাবনা আল-জাজিরাকে বলেছেন, ফিলিস্তিনি উপদলগুলো বর্তমানে মিশরীয়, কাতারি এবং তুর্কি মধ্যস্থতাকারীদের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী কৌশলগত আলোচনার অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা এখন বলতে পারি যে ফিলিস্তিনিরা এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো শর্তসাপেক্ষ বা কৌশলগতভাবে হলেও একটি ভাল দরকষাকষির অবস্থানে রয়েছে।”

বৈঠকে হামাসের অবস্থান:

মিশরের রাজধানী কায়রোয় হামাস নেতা খলিল আল-হায়া এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কুশনার বৈঠক করেন। সেখানে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ ও গাজার শাসনভার হস্তান্তরের রূপরেখা নিয়ে কথা হয়।

হামাস বলেছে, তারা এই রূপরেখায় রাজি। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে প্রথমে ইসরায়েলের তাদের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ওপর, যার মধ্যে আছে গাজায় হামলা বন্ধ করা এবং সেনা প্রত্যাহার করা।

গত মাসে ট্রাম্প এক ঘোষণায় বলেছিলেন, ১৫ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা মেনে হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়েছে। একে ট্রাম্প একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, হামাস পুরোপুরি সব অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে সরবে না।

কুশনার বৈঠকে হামাসকে অস্ত্র পরিহার ও সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। হামাস সম্প্রতি ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে সম্মত হওয়ায় এর আওতায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

গাজার শাসনক্ষমতা হামাসের হাত থেকে সরিয়ে একটি স্বাধীন বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসন বা 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা'র কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও ছিল আলোচ্য বিষয়।

হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে এবং হামলা বন্ধ করলে তারা একটি বেসামরিক কমিটির কাছে ক্ষমতা ও অস্ত্র হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।

জেরুজালেমে নেতানিয়াহু-কুশনার বৈঠকে বড় কোনও অগ্রগতি হয়নি

জেরুজালেমে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কুশনারের দীর্ঘ সময় বৈঠক হলেও কোনও সমঝোতা হয়নি। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়েছে, হামাস সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত তারা গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ পর্যন্ত গাজায় অভিযান চালিয়ে যাবে ইসরায়েলি বাহিনী।

ওদিকে, হামাসের দাবি ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতি মেনে চলুক। গাজায় যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তার ধারাবাহিকতা বা পর্যায়ক্রম নিয়ে উভয় পক্ষই বৈঠকে দ্বিমত পোষণ করেছে।

সোমবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে কুশনার এবং গাজা শান্তি পর্ষদের দূত ম্লাদিনভের কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে নেতানিয়াহু ও কুশনার একমত হয়েছেন যে, হালকা অস্ত্রসহ হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা পুনর্গঠন শুরু হবে না।

বৈঠকটিকে গভীর ও ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল এবং বোর্ড অব পিস বা শান্তি পর্ষদ বিশ্বাস করে যে, গাজায় কোনও পুনর্গঠন শুরু হওয়ার আগেই সেখানে নিরস্ত্রীকরণ দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, নেতানিয়াহু গাজায় নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিকীকরণমুক্ত প্রক্রিয়ার জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা এবং স্যানিটেশন, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে কাজ করার জন্যও আরেকটি ওয়াকিং গ্রুপ গঠনে 'বোর্ড অফ পিস'-এর সঙ্গে একমত হয়েছেন।

বোর্ড অব পিস-এর একজন কর্মকর্তা বৈঠকটিকে নিবিড় এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি রূপরেখা বা পথ নিয়ে একমত হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তা এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি।