Published : 31 Aug 2026, 11:21 PM
গত ২৬ অগাস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং এর জেরে প্রলয়ংকরী বন্যায় নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কা এখন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে এবং ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই ধ্বংসলীলা কেবল মানবজীবনই কেড়ে নেয়নি, প্রকৃতির চিরচেনা রূপও বদলে দিয়েছে। বসন্ত পেরিয়ে গেলেও এবার কাঠমান্ডু উপত্যকায় কোকিলের চিরচেনা কোনও কলতান শোনা যায়নি।
নেপালের দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখক, শিল্প-ইতিহাসবিদ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সোফিয়া এল পাণ্ডে লিখেছেন, গত ৪৫ বছরেরও বেশি সময়ে এই প্রথম, আমাদের বাগানের ল্যাপসি গাছটিতে বসন্তের বার্তা নিয়ে কোনও কোকিল ডেকে ওঠেনি।
গাছটি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে; আছে সেই কাকগুলোও, যাদের বাসায় কোকিল ডিম পাড়ে। কিন্তু পাখির দেখা নেই। কাঠমান্ডু উপত্যকার বহু মানুষ এবার বসন্তে এই পাখির সুরেলা ‘কু-হূ’ ডাক শোনার প্রহর গুনে বিফল হয়েছেন।
অনিয়ন্ত্রিত জলবায়ু পরিবর্তন আর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ভাঙা প্রতিশ্রুতিগুলো দেখতে দেখতে এই আশঙ্কা আগেই জেগেছিল। মনে ভয় ছিল, উষ্ণতর বসন্ত আর ইট-কাঠের চাপে সবুজ হারাতে থাকা এই রূঢ় উপত্যকাকে একদিন হয়ত কোকিল সত্যিই চিরতরে বিদায় জানাবে।
তবে এই পরিযায়ী পাখির অনুপস্থিতি কেবল একটি গান গাওয়া পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়; এ এক গুরুতর অশুভ সংকেত। বিশ্ব যখন জলবায়ু সংকট এড়িয়ে নিজের মতো চলছে, তখন এই দৃশ্য স্পষ্টতই জানান দিচ্ছে যে, নেপালের পরিবেশ কতটা বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছে গেছে।
পরিবেশবিদরা পাখির নীরবতাকে হিমালয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার একটি প্রাথমিক ও মারাত্মক আলামত হিসেবেই দেখছেন।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নেপাল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এক লীলাভূমি। ক্রান্তীয় আবহাওয়া আর সরাসরি হিমালয়ের কোলের মেলবন্ধনে দেশটিকে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্যই বলা যায়।
ইউনেস্কো স্বীকৃত সগরমাথা ও চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি এটি ‘তৃতীয় মেরু’ খ্যাত অঞ্চলেরও কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আজ সেই প্রাকৃতিক সম্পদ অস্তিত্ব সংকটে। রসুয়ায় আগাম কোনও সতর্কতা ছাড়াই বয়ে গেল এক প্রলয়ঙ্করী বন্যা।
হঠাৎ ঘটে গেলেও এই বিনাশের প্রস্তুতি তলে তলে তৈরি হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়ায় আজ সবকিছুই চরম ঝুঁকির মুখে- প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ থেকে শুরু করে বর্ণিল পাখি, উচ্চভূমির স্বচ্ছ হ্রদ, বরফাবৃত পর্বত, দেবদারু বন, স্থানীয় ফলমূল ও সবজি, দূষিত বাতাস ধুয়ে দেওয়া আষাঢ়ের বৃষ্টি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মানুষসহ পশুপাখির বেঁচে থাকা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বন্যা, হিমবাহ গলন, আকস্মিক ধস ও দাবদাহের মতো নিয়মিত ঘটনার পরও আমাদের মূল ভাবনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ঢাকা পড়ে থাকে।
নেপালের রসুয়ার ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার ঠিক আগমুহূর্তেই এই নিবন্ধের খসড়া লেখা হয়েছিল। দেশটির জাতীয় অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন কত মারাত্মক প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কে মানুষ কতটা উদাসীন ছিল তা ফুটে উঠেছে এ লেখায়।
আর নেপালের জাতীয় মনস্তত্ত্বের ওপর যে মানসিক আঘাত (ট্রমা) এসেছে, যার মুখোমুখি হয়ে এখন দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে সে কথা নাহয় বাদই গেল।
যেখানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার চেষ্টা চলছে, সেখানে নেপালের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের চড়া মাশুল নেপালকে অব্যাহতভাবেই গুনতে হবে।
অতএব, জাতীয় বাজেট তৈরি, নীতি নির্ধারণ কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজে জলবায়ু সচেতনতাকে মৌলিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্বের কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান সামান্য হলেও, নদীগুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্যের দিকে তাকালেই নিজেদের অপচয় ও ব্যক্তিগত উদাসীনতার মাশুল স্পষ্ট হয়।
সমাজে যারা সচ্ছল তারা অসচ্ছলদের চেয়ে অনেক বেশি ভোগ করেন, বর্জ্য তৈরি করেন এবং কার্বন নিঃসরণ ঘটান। অথচ জলবায়ু সংকটের সার্বিক প্রভাব পড়ে সবার ওপর, যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যকে আরও বাড়ায়।
স্কুলগুলোতেও জলবায়ু সচেতনতা সম্পর্কে কিছুই শেখানো হয় না, আর ভোগ বা ব্যবহারের ধরণ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে তো প্রশ্নই ওঠে না। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আবর্তনশীল বা চক্রাকার অর্থনীতি শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও বেশির ভাগ মানুষের কাছেই তা তেমন অর্থ বহন করে না।
অর্থনীতিবিদ কেট রাওয়ার্থের ২০১৭ সালের বিখ্যাত বই ‘ডোনাট ইকোনমিক্স: সেভেন ওয়েজ টু থিংক লাইক আ ২১স্ট-সেঞ্চুরি ইকোনমিস্ট’ বইটি আমাদের শেখায়, কীভাবে পরিবেশ ধ্বংস না করে এবং মানুষের বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়।
অর্থনীতি কেবল গণিত এবং চাহিদা ও জোগানের রেখচিত্র নয়, বরং এটি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক বিজ্ঞান- যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি তৈরির সময় বাস্তব জগতের বৈষম্য, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করতে বাধ্য।
এসব বড় বড়, পরিবর্তনমুখী চিন্তাভাবনাগুলো কেবল বুদ্ধিমান মানুষদের মাথায় আলোচনার বিষয় হিসেবে থেকে গেলেই হবে না। এগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিতে রূপান্তর করা দরকার এবং প্রতিটি খাতের প্রতিটি স্তরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন—যাতে মানুষেরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, যেমন শিক্ষা থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভোগ, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বাণিজ্য, কর ব্যবস্থা এবং পর্যটন—সবকিছুতেই একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
এর উদ্দেশ্য হল, কীভাবে পৃথিবীর সম্পদ আরও টেকসই উপায়ে ব্যবহার করার জন্য নিজেদের পরিবর্তন করা যায়, যা কেবল অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারীদের জন্য উপকারী না হয়ে বরং, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত হবে।
চক্রাকার অর্থনীতিতে সম্পদ বারবার ব্যবহার করায় (পণ্য ব্যবহার করে তা ফেলে না দিয়ে রিসাইক্লিং করা) তা বর্জ্য কমাতে সাহায্য করে।
ওদিকে, ডোনাট অর্থনীতির মূল ভাবনা হল—এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা বৃত্তের ভেতরের শূন্যস্থানে থাকা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে, আবার অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহার করে বৃত্তের বাইরের দেয়াল বা পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট করবে না। এই দুই সীমার মাঝের নিরাপদ স্থানই হল মানুষের আসল বসবাসের জায়গা।
এই মডেল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে আমরা শিক্ষিত হই, প্রশিক্ষিত হই- যাতে একটি সবুজ ও টেকসই পরিবেশে বাস করা যায়, যা আমাদের অতিরিক্ত ভোগের অভ্যাস বদলে এক পর্যায়ে নিয়ে আসে যা আমরা আসলে ভোগ করার সামর্থ্য রাখি—তবে তা কেবল আর্থিক খরচের সক্ষমতার দিক থেকে নয়, বরং নৈতিক, আত্মিক এবং পরিবেশগত সীমানার দিক থেকেও।
আর এই প্রক্রিয়া অবশ্যই, যারা ইতোমধ্যেই অভাবগ্রস্ত তাদের চেয়ে ধনীদের জন্য অনেক বেশি সহজ। আর ঠিক তখনই এই ব্যবধান দূর করতে রাষ্ট্র বা সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা, উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা এবং টেকসই শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে। এইসব সুযোগ-সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নেপালের এখনও অনেক দূর যাওয়ার আছে। শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলোকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কোনওদিক থেকেই আর উপেক্ষা ঠিক হবে না। সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কিছু করার সুযোগ থাকলে এবং কার্বন নিঃসরণ ও অতিরিক্ত ভোগের কারণে পৃথিবী রসাতলে যাচ্ছে ভেবে রাতের ঘুম হারাম হলে বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা যাবে না। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে—এমন আশা করে দিন পার করাও বন্ধ করতে হবে।
পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে পরিবর্তন প্রথমে নিজ থেকে এবং নিজের পরিবার থেকেও শুরু করতে হবে। আমাদের এমনভাবে বাঁচতে শিখতে হবে যাতে আমরা প্রকৃতির ক্ষতি না করি। আমরা যেন লোভের বশে সব সম্পদ ধ্বংস না করি বা পরিবেশের ক্ষতি দেখেও চোখ বন্ধ করে না থাকি, যা একসময় মানবজাতিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
নীতির কথা বলতে গেলে, অনেক বেশি মানুষ পরিবর্তনের দাবি জানালে সরকার হয়ত কথা শুনবে।
নেপালের মূল সমস্যাগুলো যেমন প্রবাসে পাড়ি জমানো, বিনিয়োগের অভাব কিংবা সুযোগের অভাব; তেমনি নীরব জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাবে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ হারানোটাও সবচেয়ে বড় উপেক্ষিত ও ভয়ংকর সত্য, যা এবার কোকিলের নীরবতায় ধরা দিয়েছে। প্রকৃতির এই সতর্কবার্তার পরও এখনই সচেতন না হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।