Published : 02 Aug 2026, 08:16 PM
বর্তমানে ভারতে প্রতি তিনজন বেকার তরুণের মধ্যে দুজনেরই স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে ছিল এই সংখ্যা ছিল আটজনে মাত্র একজন।
গত চার দশকে দেশটিতে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে এখন ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৬ কোটি ৩০ লাখ স্নাতক রয়েছে, যা ১৯৮৩ সালে ছিল মাত্র ৫০ লাখ।
একই সময়ে তাদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা সাত লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। স্নাতক তরুণের সংখ্যা ১৩ গুণ বেড়েছে, আর বেকার স্নাতকদের সংখ্যা বেড়েছে ১৬ গুণ।
সবচেয়ে কম বয়সী স্নাতকদের মধ্যে, ব্যর্থতার হার বলতে গেলে প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৯৮৩ সালে ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব ১৯৮৩ সালের ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একজন স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থী অপেক্ষায় যে বছরগুলো পার করেন, তা এখন আগের চেয়ে আরও দীর্ঘ হয়ে তাদের বয়স ২০ এর কোঠার শেষের দিকে গিয়ে ঠেকছে।
‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ভারতের আয়ের স্তরের একটি দেশের জন্য ঠিক যেমনটা আশা করা যায় তেমনই রয়েছে। আর পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার আরও বেশি হয়েছে।
তাল মিলিয়ে যে বিষয়টি চলতে পারেনি, তা হলো পড়াশোনা শেষে প্রাপ্ত কাজের ধরণ। ২০০৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক পাস করেছে।
এদের মধ্যে প্রায় ২৮ লাখ যে কোনও ধরনের কাজ খুঁজে পেয়েছে। আর মাত্র ১৭ লাখের মতো মানুষ স্থায়ী বেতনভুক্ত চাকরি পেয়েছে।
প্রতিবেদনের ধারাবাহিক তথ্যানুযায়ী, নিজেদের বেকার ঘোষণার পর থেকে এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হলে দেখা যায়, তরুণ স্নাতক পুরুষদের অর্ধেক অংশ কোনও না কোনও কাজ খুঁজে পেয়েছে।
মাত্র প্রায় সাত শতাংশ স্থায়ী বেতনভুক্ত চাকরি পায়, এবং ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হোয়াইট-কলার (দাপ্তরিক কাজ) কাজ খুঁজে পায়।
একজন গ্র্যাজুয়েট বা বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা শিক্ষার্থী কোন শহরে বা এলাকায় থাকছেন, তার ওপর ভিত্তি করে চাকরি পাওয়া বা জীবনে সফল হওয়ারসুযোগ বেশি বা কম হতে পারে।
৩০ বছরের কম বয়সী স্নাতক পুরুষদের মধ্যে বেকারত্বের হার দিল্লিতে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও উড়িষ্যায় তা ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ।
নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ; জম্মু ও কাশ্মীরে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ, তেলেঙ্গানায় ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ স্নাতক নারী বেকার।
ওদিকে, জাতীয় পরিসংখ্যানে পুরুষদের বেকারত্বের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারীদের ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
যদিও অধিকাংশ রাজ্যে নারীদের অবস্থা তুলনামূলক খারাপ হলেও, সব রাজ্যে এমনটি নয়। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং পশ্চিমবঙ্গে স্নাতক পাস করা নারীদের বেকারত্বের হার পুরুষদের চেয়ে কম।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের চেয়েও নতুন, এবং সেগুলো একই দিকে ইঙ্গিত করে।
সরকারের 'পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি জরিপ' বার্ষিক সিরিজ থেকে ইন্ডিয়া টুডের ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডার বছর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যমতে, সব বয়সের স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ (পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১৭ দশমিক৪ শতাংশ)।
এটি তরুণ-যুবাদের সংখ্যার তুলনায় আরও ব্যাপক একটি পরিসংখ্যান।কারণ, এর মধ্যে চল্লিশ ও পঞ্চাশের কোঠায় থাকা স্নাতকরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যারা বেশিরভাগই কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত।
যদি হিসাব-নিকাশ বা সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পুরুষদের প্রতি উদার বা নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গিও রাখা হয়, তাও দেখা যায় যে, উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতন সম্পন্ন করা নারীদের হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দুই গুণ বেশি।
তবে ডিগ্রি অর্জন করা এখনও মূল্যবান। প্রতিবেদনটিও এই বিষয়ে সম্পূর্ণ স্পষ্ট। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেতন চাকরি জীবনে প্রবেশের সময় এবং কর্মজীবনের পুরোটা জুড়েই অ-স্নাতকদের চেয়ে বেশি থাকে, এবং স্নাতক ডিগ্রিধারীদের প্রারম্ভিক বেতন অ-স্নাতকদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে থাকে।
যদিও স্নাতকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ ও সুবিধা কমে আসছে এবং ২০১৭ সাল থেকে তাদের আয় একই জায়গায় আটকে আছে, তবে তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ডিগ্রি এখনো ফলদায়ক। যা বেড়েছে তা হল ডিগ্রি থেকে আয় শুরু হওয়ার আগের অপেক্ষার সময়, এবং সেই অপেক্ষার পর পাওয়া প্রথম কাজ আগের চেয়ে আরও খারাপ বা কম মানের হয়েছে।
পরিবারগুলো পড়াশুনায় যে অর্থায়ন করছে, তাদের জন্য এই অপেক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের (জাতীয় নমুনা জরিপ) শিক্ষা মডিউল অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাইভেট কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিল।
উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সংখ্যা ছিল ৩৭ শতাংশ, যার বিপরীতে প্রাথমিক স্তরে এই হার ছিল ২২ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারগুলো স্কুলের নিজস্ব খরচ ২০,১৩০ রূপির
পাশাপাশি কোচিংয়ের জন্য প্রায় ৬,৩৮০ রূপি খরচ করেছে; যার মানে হচ্ছে, ওই সন্তানের শিক্ষার মোট খরচের প্রায় চার ভাগের এক ভাগই যায়
কোচিংয়ের পেছনে। প্রাথমিক স্তরে এই খরচ স্কুলের খরচের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।
এখানকার গাণিতিক হিসাবটা জটিল। গত দুই দশক ধরে প্রতি বছর ভারত প্রায় ৩৩ লাখ এমন স্নাতক তৈরি করেছে, যাদের জন্য কোনও বেতনভুক্ত চাকরি ছিল না।
সরকার যদি দ্রুত এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারে তাহলে তা ভারতের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার দিকটি বহুলাংশে পূরণ হয়েছে। ভারতের কাছে স্নাতক ডিগ্রীধারীরা রয়েছে। কিন্তু তারা যা তৈরি করতে পারেনি, তা হল ক্লাসরুমের দরজার ওপারে থাকা সুযোগ। তাই গত চার দশক ধরে, ২৫ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচজন স্নাতকধারীর মধ্যে প্রায় দুজনই ভুল দরজার ওপারে অপেক্ষা করে চলেছে।