Published : 19 Aug 2021, 12:27 AM
২০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা ফেরত আসার কালে গোঁড়া ইসলামী দলটি আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা যখন পুনর্দখল করেছে, তখন দেশটির খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা এবং একইসঙ্গে হতাশার দিকটি তুলে এনেছে সিএনএন।
বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশের একটি আফগানিস্তান হলেও খনিজ সম্পদের দিক থেকে একথা খাটে না।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা ও ভূতত্ত্ববিদরা দেখিয়েছিলেন, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মিলনস্থল পার্বত্য এই দেশটিতে ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে।
মাটির নিচে থাকা এই খনিজ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হলেও তা সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারেনি যুদ্ধপীড়িত দেশটি।
আফগানিস্তানের মাটির নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লোহা, তামা ও সোনা। গুরুত্বপূর্ণ ধাতু লিথিয়ামের মজুদ বিশ্বে আফগানিস্তানেই সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়।
“এই অঞ্চলে খনিজ ধাতব সম্পদের দিক থেকে আফগানিস্তান সম্ভবত সবচেয়ে সমৃদ্ধ। শুধু তাই নয়, একুশ শতকের অর্থনীতির জন্য যেসব ধাতব সম্পদ প্রয়োজন, তার প্রাচুর্য রয়েছে দেশটিতে,” বলেন ভূতাত্ত্বিক রড শুনোভার।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, অবকাঠামোর অভাবের পাশাপাশি খরার মতো প্রাকৃতিক কারণ আফগানিস্তানের মূল্যবান খনিজ সম্পদকে এখনও মাটির নিচেই রেখে দিয়েছে।
‘শান্তির’ বার্তা দিয়ে তালেবান জানালো, ‘শরিয়া আইনেই’ সব চলবে
তালেবানের শাসনে এই স্থবিরতার চিত্র খুব যে বদলাবে, তেমন সম্ভাবনা নেই। আবার চীনের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ঝামেলার মধ্যেও খনিজ অনুসন্ধানে তৎপর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
“তারা আসলে তা করবে কি না, এটাই আসল প্রশ্ন,” বলেন ইকোলজিকাল ফিউচারস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী শুনোভার।
আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত চীন
তালেবান প্রতিনিধিদলের চীন সফর, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
এত খনিজ সম্পদ! অথচ আফগানিস্তানে ৯০ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ২০২০ সালে উত্থাপিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের দৈনিক আয় ২ ডলারের কম।
বিশ্ব ব্যাংক তার সর্বশেষ প্রতিবেদনেও বলছে, বেসরকারি খাত বিকশিত না হওয়ায় আফগানিস্তানের অর্থনীতি এখনও বৈদেশিক সহায়তার উপরই নির্ভরশীল।
দুর্বল সরকার, সুশাসনের অভাব যেসব দেশে রয়েছে, সেসব দেশে খনিজ সম্পদ না হয়ে অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়, আফগানিস্তানও এমন উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের আগে সোভিয়েত ইউনিয়নও আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়ে উচ্চাশার কথা শুনিয়েছিল।
কার্বন নির্গমন কমাতে বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়িতে নজর দিয়েছে, তখন আফগানিস্তানে থাকা লিথিয়াম, কোবাল্ট কিংবা নিওডাইমিয়ামের মতো বিরল ধাতুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
লিথিয়াম, কোবাল্ট কিংবা নিওডাইমিয়ামের মতো বিরল ধাতু রয়েছে আফগানিস্তানের খনিজের তালিকায়।
বর্তমানে বিশ্বে এসব ধাতুর চাহিদার ৭৫ শতাংশই জোগান দেয় তিনটি দেশ চীন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও অস্ট্রেলিয়া।
লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ব্যাটারি তৈরিরও মূল উপাদান। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ তামা ও অ্যালুমিনিয়াম।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিথিয়াম মজুদের দিক থেকে বলিভিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে আফগানিস্তান। এখন অবধি এই ধাতুর জানা মজুদের হিসেবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ হল বলিভিয়া।
“যদি আফগানিস্তান তার খনিজ সম্পদ আহরণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তাহলে এক দশকেই দেশটি ওই অঞ্চলের শীর্ষ ধনী দেশের কাতারে উঠে আসবে।”
কিন্তু তার জন্য যে স্থিতিশীল পরিবেশ দরকার, তা আফগানিস্তানে আসবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে আইএমএফের মধ্য এশিয়া বিভাগের সাবেক পরিচালক মহসিন খানের।
দুই দশক পর আফগানিস্তান ফের তালেবানের কব্জায়
খনিজ সম্পদ আহরণ করতে লাগে জ্ঞান, প্রযুক্তি আর বিনিয়োগ; সেই সঙ্গে সময়ও লাগে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসেবে খনিজ পাওয়ার পর তার বাণিজ্যিক উত্তোলনে গড়ে ১৬ বছর সময় লাগে।
আফগানিস্তান এখন বছরে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের খনিজ আহরণ করে বলে হিসাব দেন মহসিন খান। তবে এই আয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই দুর্নীতির কারণে লোপাট হয় বলেও জানান তিনি।
তালেবানের নেতারা।
তালেবান তাদের ক্ষমতা দিয়ে এই খনিজ আহরণের কাজটি করতে পারে বলে বিজ্ঞানী শুনোভার মনে করলেও তাতে ভিন্নমত জানাচ্ছেন নিরাপত্তা বিষয়ক পরামর্শক জোসেফ পার্কস।
তার মতে, তালেবান হয়ত ক্ষমতা দখল করেছে, কিন্তু একটি কার্যকর সরকার গঠন এখনও অনেক দূরের পথ।
আর এক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া যে কঠিন হবে, তা মহসিন খানও স্বীকার করছেন।
“এতদিনেও যেখানে বিনিয়োগ আসেনি, সেখানে বিনিয়োগ করতে যাবে কে? বেসরকারি কোনো বিনিয়োগকারীই এই ঝুঁকি নেবে না।”
আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও এক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দাঁড়াবে। কারণ তালেবান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এমন তালিকায় তাদের নাম এখনও রয়েছে।
এত কিছু পেরিয়ে আফগানিস্তান যদি মূল্যবান এসব সম্পদ তুলতে না পারে, তাহলে তা অনেকটা মূল্যহীন হয়েই মাটির তলায় পড়ে থাকবে।