Published : 16 Mar 2026, 02:05 PM
বজ্রের শব্দে কেঁপে উঠল অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলো।
“আমরা লাফিয়ে উঠে দৌড়ে বারান্দায় ছুটলাম। হাতে ক্যামেরা। ভাবছি কোনো যুদ্ধবিমান বা ইরান থেকে ছুটে আসা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের শব্দ।
“কিন্তু যখন বুঝলাম এটা দুবাইয়ের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো আরেকটি সুপারকারের গর্জন, আকাশচুম্বী ভবনগুলোর গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে যার শব্দ কান ঝালাপালা করে দিয়েছে, অনেকটা নির্ভার হলাম। ক্যামেরাম্যান মার্ক জারভিস ও আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে ১০ দিন ছিলাম সেসময় বহুবার এমনটা ঘটেছে,” বলেছেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির জন রে।
তিনি বলছেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী শহর দুবাই যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে গেছে—একদিকে আগুন জ্বলছে, অন্যদিকে স্বাভাবিক জীবনযাপন অব্যাহত রাখার মরিয়া চেষ্টাও চলছে।
‘সামনে আগাও, এখানে দেখার তেমন কিছু নেই’ সম্ভবত এখন তাদের সরকারি মন্ত্র।
সারাবিশ্ব থেকে যাওয়া পর্যটক, ব্যবসায়ী আর প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়—এই সুনামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের দুবাইয়ের সমৃদ্ধি। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এবারের যুদ্ধ, উপসাগরের অল্প পথ পেরিয়ে আসা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রে ওই ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে।
মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো জায়গাকে ‘বৈধ নিশানা’ হিসেবে দেখা ইরান আশপাশের যত দেশে হামলা চালাচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টায় তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা তার ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও করা লোকজনকে ভয়াবহ শাস্তি, বড় অঙ্কের জরিমানা এমনকি প্রয়োজনে জেলে পাঠানোরও হুমকি দিয়ে রেখেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন আগেই শহরের ওপর দিয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ভিডিও করায় কঠোর সাইবার অপরাধ আইনে ৬০ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।
এর সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি হুট করে যুদ্ধের মুখে পড়ে তড়িঘড়ি দেশে ফেরা ব্রিটিশদের শঙ্কামিশ্রিত সাক্ষ্য যোগ করার পর দুবাইয়ে ‘আসলে কী হচ্ছে’ তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা শুরু হয়।
এক ধরনের ধারণা তৈরি হয় যে গণমাধ্যম বোধহয় পুরো চিত্র হাজির করছে না; মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি এবং দুবাই এখন থেকে আর নিরাপদ নয়—এমন ভাবনা ছড়াতে শুরু করে।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পরদিন দুবাই পৌঁছানো যুক্তরাজ্যের সাংবাদিকদের একজন জন রে তেমনটা দেখেননি।
“আমরা দেখতে পাই ভীত-সন্ত্রস্ত এক শহর, এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছে যেটা ভাবেইনি কেউ, কীভাবে শেষ হবে তাও অজানা। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আড়াল করা হচ্ছে বলে যে জল্পনা তার সপক্ষে কিছুই দেখিনি আমরা,” বলেছেন তিনি।
এর একটা কারণ হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা; বিপুল বিনিয়োগ করলেও এই ব্যবস্থা যে শেষ পর্যন্ত বেশ কাজে এসেছে তা মনে হচ্ছে।
এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাই ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ৯০ শতাংশকে ‘ধরাশায়ী’ করতে পারছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনই প্রতিহত করা হচ্ছে দুবাই থেকে অনেক দূরে, ইরান আর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৃথক করা সরু সমুদ্রসীমার ওপরে।
তাহলে দুবাই কী নিশ্চিন্ত? মোটেও না।
“আমাদের প্রথম সকালে আমরা আমাদের হোটেলের খুব কাছেই সুপরিচিত পাম জুমেইরাহতে দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শুনি, সম্ভবত সফলভাবেই কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে, কিন্তু তাও ভূমির তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে,” বলেছেন রে।
এরকম ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে পড়ন্ত ধ্বংসাবশেষ।

“এক সপ্তাহান্তে পর্যটকধন্য দুবাই মেরিনাতে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের উল্টো দিকে থাকা আকাশচুম্বী এক ভবনে শেষ মুহূর্তে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহতের পর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। এত জোরে শব্দ হয়, যেমনটা আর আমরা শুনিনি। ধ্বংসাবশেষের টুকরো পড়ে এক গাড়িচালক নিহত হন, তার গাড়িতে আগুন ধরে যায়,” বলেন আইটিভির এ সাংবাদিক।
ওই ঘটনার ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হচ্ছে।
“দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা ভেবে, ভিডিওর ব্যাপারে বিধিনিষেধের নিয়ম মাথায় নিয়েই আমরা সড়কে দৌড়ে যাই। টাওয়ারের গোড়ায় শঙ্কিত, উত্তেজিত কিন্তু আতঙ্কিত নন এমন কয়েক ডজন লোককে দেখতে পাই। কেউ ছবি-ভিডিও তোলার চেষ্টা করছিলেন, কেউ কেবল দেখছিলেন,” বলেছেন রে।
তাদের দুবাই পৌঁছানোর আগের দিনই সুপরিচিত ফেয়ারমন্ট হোটেল ও বুর্জ আর আরব হোটেলও পড়ন্ত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাতে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তার রেশ পর্যটকদের অনেকের মধ্যে কয়েকদিন পরও পাওয়া যায়।
যদিও রে বলছেন, যে সপ্তাহদেড়েক তারা উপসাগরের ওই শহরটিতে ছিলেন, তারা যুদ্ধ সম্বন্ধে খুব বেশি কিছু শোনেননি।
তাদের মোবাইল ফোনে জোরে অ্যালার্ম বাজার পর খুব কম ক্ষেত্রেই রাতের আকাশে সক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিনন্দন আলোর খেলা দেখা যেত। বেশিরভাগ সময়ই তারা শুনতে পেতেন অনেক দূরে যুদ্ধবিমানের মৃদু গর্জন।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা ও দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা এর পরের কয়েকদিন পুরোপুরি বন্ধই ছিল। রে এবং তার সহকর্মীরা সৌদি আরব থেকে গাড়িতে করে দুবাই পৌঁছেছেন।
কয়েকদিন পর যখন দুবাই বিমানবন্দর খোলাও হয়, তা ছিল অনিয়মিত ও সীমিত আকারে। এ পরিস্থিতিতে আটকে পড়া হাজার হাজার ব্রিটিশ পর্যটকদের অনেকেই আকাশ বা স্থলপথে দুবাই ছাড়ার অন্য আর কী কী পথ থাকতে পারে তা খোঁজা শুরু করেন।
আইটিভির সাংবাদিক রে এই ব্রিটিশ পর্যটকদের কাছ থেকে পরিস্থিতি ও তাদের ভাষ্য জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেকেই কথা বলতে চাননি। যুদ্ধের কারণে নয়, তাদের ভাষ্য হোটেল ব্যবস্থাপক, ট্যুর পরিচালক বা আমিরাতের কর্তৃপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে—এই ভয়ে।
এ পর্যটকদের সিংহভাগ দীর্ঘ রাত হোটেলের বেজমেন্টে কাটিয়ে শঙ্কার মধ্যে থাকলেও তাদের বেশি উদ্বেগ ছিল ধারণার চেয়ে বেশিদিন দুবাইয়ে থাকায় ফুরিয়ে আসা অর্থ ও ফ্লাইট ধরতে না পারলে কীভাবে বাড়ি ফেরা যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায়।
ল্যাংকাশায়ারের এত তরুণ যুগল, কেইটলিন ও ডিলান যেমনটা বলেছেন, “আমাদের ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সীমা ছুঁয়ে ফেলেছি আমরা। এমন পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি, যখন কোনো টাকা বা বাড়ি যাওয়ার টাকা ছাড়া আমরা এখানে আটকা পড়বো।”
পর্যটকদের দুশ্চিন্তা এক জায়গায়, দুবাইয়ে থাকা প্রবাসী ব্রিটিশদের চিন্তা আরেক জায়গায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বাইরে থেকে যতই অত্যাধুনিক, সহিষ্ণু হোক না কেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে তার অবস্থান বেশ সরল— কোনো ধরনের ভিন্নমত কখনো কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না।
এরকম কোথাও সাংবাদিকদের জন্য প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে বেশ মুশকিল। দুবাইভিত্তিক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা ক্যামেরায় বারবার সরকারের প্রশংসা করছেন, তারা যে ভীত নন তা জানাচ্ছেন। কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর সাধারণ আলোচনায় ভেতরে থাকা উদ্বেগ মোটেও লুকাতে পারছেন না।

দুই লাখের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক এখন দুবাইকেই তাদের ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন; অনাকাঙ্ক্ষিত এ যুদ্ধের মধ্যে এদের রক্ষায় আমিরাত সরকারের সক্ষমতার ওপর আস্থাও বেশিরভাগেরেই এখনও অটুট বলেও মনে হচ্ছে।
“এই পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে কাছের যে ঘটনার তুলনা করতে পারি, তাহল কোভিডের সময়কার লকডাউন,” শুনশান রাস্তা ও সৈকতগুলোকে দেখিয়ে বলেছেন এক প্রবাসী। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগেও ওই সড়ক আর সমুদ্রগুলো ছিল লোকে লোকারণ্য।
দুবাইয়ে ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের প্রধান কেটি কেনান অবশ্য বলছেন, ব্যবসা এখনও আগের মতোই চলছে।
প্রবাসীরা সমানে দুবাই ছাড়ছে—একে ‘বাড়িয়ে বলা গল্প’ হিসেবেই দেখছেন তিনি। তার মতে, অনেকেই ঠিকঠাক ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন, পরের বার ফিরে আসার উদ্যম নিয়ে।
কেনানের কথা সত্য হয় কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। কেননা, দুবাই ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বাকিদের আসল বিপদ নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলে এবং ইরান কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে তার ওপর।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের হামলার কৌশলে পরিবর্তন অনেকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এটা সত্যি যে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে আরব আমিরাতের দিকে যত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুটে গেছে, তার তুলনায় এখন অনেক কম যাচ্ছে। হতে পারে ইরানের সক্ষমতাও কমে গেছে; কিন্তু ইদানিং তারা নিশানাও বদলে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে তাদের নিশানা ছিল সামরিক ও যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, কিন্তু রে যেদিন দুবাই ছাড়ছিলেন সেদিন দুটি ড্রোন বিমানবন্দরে আঘাত হানে, যে কারণে অনেক ফ্লাইট ছাড়তে কয়েক ঘণ্টা দেরিও হয়।
এরপর শুক্রবার দুবাইয়ের কেন্দ্রস্থলে ড্রোন হামলার খবর মেলে; শহরের ওই এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকে।
বিমানবন্দর, পর্যটন ও ব্যবসায়িক এলাকায় হামলা হওয়া শুরু হলে তা দুবাইয়ের জন্য ঘোর বিপদ ডেকে আনতে পারে। কেননা, যুদ্ধ অনেক সপ্তাহ চললে, এবং রাজস্ব আয়ের খাতগুলো নিয়মিত হামলার শিকার হলে বা ঝুঁকিতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ধাক্কা হবে প্রবল।
দীর্ঘসময় ধরে শহরটিতে থাকা এক বাসিন্দা যেমন বলছিলেন, “মনে রাখবেন এই শহরে কোনো তেল নেই। আপনারা যা দেখছেন সবই গড়ে উঠেছে ব্যবসা ও পর্যটনের মাধ্যমে। এখন অর্থই যদি না প্রবাহিত হয়, তাহলে দুবাইয়ের থাকেই বা কী?”