এখন থেকে ১ হাজার কেজি বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি ইরানের
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের শীর্ষ কমান্ডার এ ঘোষণা দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ এলাকা, পাল্লা এবং ধ্বংসক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে।
এখন পর্যন্ত এক হাজার কেজির কম ওজনের বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান। এবার থেকে তারা কেবল ১ হাজার কেজি বা তার বেশি ওজনের বিস্ফোরকবাহী (পেলোড) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যে এই ঘোষণা দিয়ে আরও জোরালো হামলার পথে যাওয়ারই ইঙ্গিত দিল ইরান।
রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদ মৌসাভি রোববার এ ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ এলাকা, পাল্লা এবং ধ্বংসক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে।
লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মৌসাভি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি এবং দুবাই বিমানবন্দর ও সৌদি আরবের রাস তানুকা তেল শোধনাগারের মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার তীব্রতা ও পরিধি এখন আরও বাড়ানো হবে।
সামরিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি ইরানের একটি নতুন যুদ্ধকৌশল হতে পারে। আগে তারা সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী শাহেদ ড্রোন দিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত রাখার চেষ্টা করত।
কিন্তু এখন তারা তুলনামূলক কম সংখ্যায় অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং ঠেকানো কঠিন এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা বিমান ঘাঁটি বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টারের মতো সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক শানাকা আনসেলম পেরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, এই নতুন ধাপের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের ‘অর্থনীতি’ বদলে দিচ্ছে। অর্থাৎ ভারি বিস্ফোরকবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমীকরণ নতুন করে লিখতে চাইছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছেই সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে।
এর মধ্যে ৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ‘সুমার’ এবং ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ‘সেজিল’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ‘খোররামশহর’ ক্ষেপণাস্ত্র ১ হাজার ৮শ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে ফেলার পরীক্ষা:
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কৌশল ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ টেনে নেওয়া।
ঝাঁকে ঝাঁকে সস্তা শাহেদ-১৩১ ও ১৩৬ ড্রোন এবং স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তারা প্রতিপক্ষের দামী ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শেষ করে দিতে চেয়েছিল।
সাধারণ সামরিক নীতি অনুযায়ী, একটি আগত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ঠেকাতে দুই থেকে তিনটি ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইরানি হামলা ঠেকাতে সফল হলেও এর ব্যয় আকাশচুম্বী।
একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪০ লাখ ডলার, একটি থাড ইন্টারসেপ্টরের দাম ১ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ইসরায়েলি অ্যারো-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে একটি শাহেদ ড্রোনের দাম সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমীকরণ যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে নেই। তবুও ওয়াশিংটন হামলা ঠেকাতে বাধ্য, কারণ একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে আর্থিক ক্ষতির চেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।
ভারি ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়া:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান শাহেদ-১৩৬ ‘কামিকাজে’ ড্রোনসহ প্রায় তিন ডজন দফায় হামলা চালিয়েছে।
রোববার ও সোমবার চালানো ৩৩তম দফায় ইরান ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার পাল্লা এবং ৫৫০ কেজি বোমা বহনে সক্ষম ‘খেইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আরও শক্তিশালী ‘খোররামশহর’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
ইরানের দাবি, তাদের এই আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘ম্যাক-৮’ গতিতে চলতে পারে এবং মাঝ আকাশে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম, যা ইসরায়েলের অ্যারো-৩ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে।
বিশ্লেষক পেরেরা ব্যাখ্যা করেন, “যখন একটি ওয়ারহেডের ওজন এক টন (এক হাজার কেজি) হয়, তখন ব্যর্থতার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায় কারণ আঘাতের স্থানে ধ্বংসের ব্যাসার্ধ দ্বিগুণ হয়। প্রতিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট ইন্টারসেপ্টর তখন দ্বিগুণ ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন কেবল ড্রোন বা কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা সংখ্যা এবং ওজন, উভয়কেই একসঙ্গে ব্যবহার করছে।
আগে ইরান ৪৫০ থেকে ৬০০ কেজি বিস্ফোরক বাহী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছিল।
কিন্তু এখন ইরান সেই ওজন ও ধ্বংসক্ষমতা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর একই ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামো টিকে থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
