ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ২০ শিশুসহ অন্তত ৩১৩ জন নিহত এবং প্রায় ২ হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন।
Published : 08 Oct 2023, 07:47 PM
ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে শনিবার সংঘাত শুরুর পরপরই গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা বিমান হামলা রোববারও চলছে। ওদিকে,দক্ষিণ লেবাননে হেজবুল্লাহ মিলিশিয়া লক্ষবস্তুতে ইসরায়েলের হামলায় সংঘাত গাজার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েল শনিবার রাতভর গাজার বিভিন্ন হাউজিং ব্লক, সুড়ঙ্গ, মসজিদ এবং হামাস কর্মকর্তাদের বাড়িতে বাড়িতেও হামলা চালিয়েছে। চলমান হামলায় এরই মধ্যে ধ্বংস হয়েছে হামাসের কার্যালয়, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এর পাশাপাশি বহু ঘরবাড়ি ও অন্যান্য ভবনও।
বিস্ফোরণের কালো ধোঁয়ায় ছেয়েছে চারিদিক। আকাশে আগুনের কমলা শিখা, স্ফুলিঙ্গর ঝলকানি। আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনের চক্কর দেওয়ার শব্দও ভেসে আসছে। ইসরায়েলি সেনারা এবার আবাসিক ভবনগুলোতে হামলার সময় আগের মতো আর কোনও পূর্ব সতর্কতা জারি করেনি।
গাজার কেন্দ্রস্থলের একটি শরণার্থী শিবিরে আশেপাশের লোকজন ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে মৃতদেহ উদ্ধার করছে। গাজার দক্ষিণের খান ইউনিসে লোকজন রোববার সকালে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষে লাশের সন্ধান শুরু করেছে। সেখানকার এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা রাতের নামাজ পড়া শেষ করতে না করতেই হঠাৎ মসজিদে বোমা হামলা হয়। তারা শিশু, প্রপ্তবয়স্ক আর নারীদেরও আতঙ্কগ্রস্ত করেছে।”
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ২০ শিশুসহ অন্তত ৩১৩ জন নিহত এবং প্রায় ২ হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন। ওদিকে, ইসরায়েলে হামাসের বন্দুকধারীদের আকস্মিক হামলায় নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩০০। সব মিলে দুই পক্ষে প্রাণ হারিয়েছে ৬০০’র বেশি মানুষ।
হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর ২৪ ঘণ্টা পরও ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের বন্দুকধারীদের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াই চলছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামাসের দখল থেকে ২২ টি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তারা। ফিলিস্তিনের শত শত হামলাকারীও নিহত হয়েছে। তবে আরও ৮ টি এলাকায় এখনও লড়াই চলছে।
কয়েক দশকের মধ্যে শনিবার হামাস আকস্মিকভাবে ইসরায়েলে হামলা চালায়। দিনটি ছিল ইহুদিদের ছুটির দিন। ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা রকেট হামলা চালানোর পাশাপাশি সুপরিকল্পিতভাবে স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথ ব্যবহার করে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ঢুকে পড়ে।
তারা কয়েক ঘণ্টা ইসরায়েলি শহর ও সেনাচৌকি অবরুদ্ধ করে রাখে। অভিযানে বেশ কিছু ইসরায়েলি নিহত হয়। কিছু ইসরায়েলি নাগরিককে জিম্মি করে গাজায়ও নিয়ে যায় ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা গাজার আশেপাশের এলাকায় হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে এবং সীমান্ত এলাকার আশেপাশে বাস করা সব ইসরায়েলিকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
ইসরায়েলের এক সামরিক মুখপাত্র এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আমরা হামাসের ওপর তীব্র হামলা চালাব এবং এই যুদ্ধ খুবই দীর্ঘ হবে।”
ওদিকে, গাজায় হামাসের মুখপাত্র আব্দেল-লতিফ-আল-কানুয়া বলেছেন, “আমাদের জনগণের প্রতিরক্ষার খাতিরেই” এই অভিযান চালানো হয়েছে। হামাসের যোদ্ধারা ইসরায়েলে রকেট হামলা এবং অভিযান এখনও চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
৫০ বছর আগে ইসরায়েলে মিসর ও সিরিয়ার আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। শনিবার ইসরায়েলে হামাসের সবচেয়ে বড় এবং প্রাণঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে সেই পরিস্থিতিরই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের এ সংঘাতে ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রচেষ্টা।
দাঁতভাঙা জবাবে হামাসের হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। বিশ্বের দেশগুলো দুইপক্ষের সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে, হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান এবং এর আঞ্চলিক মিত্রদেশ লেবাননের হেজবুল্লাহ। ২০০৬ সালে হেজবুল্লাহ গেরিলারা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। এবারে হেজবুল্লাহকে সংঘাতে না জড়ানোর ব্যাপারে হুঁশিয়ার করেছেন ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র।
কিন্তু লেবাননের হেজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা উত্তরে ইসরায়েলের অধিকৃত সেবা ফার্ম এলাকায় একটি রাডারস্থলসহ তিনটি পোস্টে রকেট এবং গোলা হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলও এর জবাবে দক্ষিণ লেবাননে গোলা হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধ বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ারই আভাস দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামাসের সমর্থনে বিক্ষোভ হচ্ছে। ইরান এবং হেজবুল্লাহ হামাসের ইসরায়েলে হামলা প্রশংসা করছে। লেবাননে হামাসের নেতা ওসমান হামদান বলেছেন, শনিবারের অভিযানের পর আরব দেশগুলোর উপলব্ধি করা উচিত যে, ইসরায়েলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবি মেনে নিলেই তা শান্তি বয়ে আনবে না।
ইসরায়েলের বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতাতেই কী এ হামলা?
বিবিসি-র নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাংক গার্ডনার এর উত্তরে বলেছেন হ্যাঁ।
তার মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেট, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, এর বহির্মুখী গুপ্তচর সংস্থা এমনকী ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর যত কিছু আছে- সব মিলেও হামলার হুমকি আঁচ করতে পারেনি কিংবা তারা কোনও সতর্কবার্তা পেয়ে থাকলেও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি বিস্ময়কর বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা অনেকটা সুদূরপ্রসারী। সংস্থাগুলোতে অর্থায়ন ভাল এবং বিস্তৃত পরিসরে তারা কাজ করে। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর পাশাপাশি লেবানন, সিরিয়া এবং অন্য আরও জায়গায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার চর ও তথ্যদাতা রয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে গাজা এবং ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্ত এলাকার বেষ্টনী বরাবর জায়গায় জায়গায় লাগানো আছে ক্যামেরা, গ্রাউন্ড-মোশন সেন্সর এবং সেসব জায়গায় নিয়মিত সেনা প্রহরারও ব্যবস্থা আছে।