১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরাক যুদ্ধের কট্টর সমর্থক, সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মৃত্যু

ডিক চেনি দাবি করেছিলেন, ইরাকের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, যদিও পরে সেরকম কিছু পাওয়া যায়নি।

ইরাক যুদ্ধের কট্টর সমর্থক, সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মৃত্যু
ডিক চেনি। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Nov 2025, 01:47 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:36 PM

ইরাক যুদ্ধের পেছনে মূল ব্যক্তিদের একজন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি মারা গেছেন। 

নিউমোনিয়া ও হৃদরোগের জটিলতায় সোমবার ৮৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তার পরিবারের মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর জানায়।

রিপাবলিকান নেতা চেনি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ইতিহাসে তাকে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে দেখা হয়।

ডিক চেনি ছিলেন ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। তিনি দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দেশটি হুমকি হয়ে উঠছে। 

সেই যুদ্ধে ইরাক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটে। কিন্তু গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্রের অস্তিত্ব আর পাওয়া যায়নি।

চেনি মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও বিতর্কিত ছিলেন। চেনির সঙ্গে বুশ প্রশাসনের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা—যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল এবং কনডোলিৎসা রাইসের বিরোধ দেখা দিয়েছিল।

তিনি সন্ত্রাসবাদে জড়িত সন্দেহভাজনদের ওপর ‘এনহান্সড ইন্টারোগেশন’ (যন্ত্রণাদায়ক জিজ্ঞাসাবাদ) সমর্থন করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল ‘ওয়াটারবোর্ডিং’ ও ‘স্লিপ ডিপ্রাইভেশন’-এর মতো পদ্ধতি ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এইসব পদ্ধতি ‘নির্যাতন’ বলে গণ্য হয়েছিল।

চেনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণের পক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর থেকে, যে কেলেঙ্কারি সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল- এতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ক্রমশ খর্ব হচ্ছিল। 

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নিজের কার্যালয়কেও শক্তিশালী করেন এবং প্রশাসনের ভেতরে নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

ডিক চেনির মেয়ে লিজ চেনিও রিপাবলিকান দলের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা হয়েছিলেন। তবে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনার পর ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেওয়ায় তিনি প্রতিনিধি পরিষদের আসন হারান।

ডিক চেনি মেয়ের অবস্থানকে সমর্থন করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে ডনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিপজ্জনক আর কেউ ছিল নেই।”

চেনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই হৃদ্‌রোগের সমস্যায় ভুগেছেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। পরে আরও অনেকবার হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যায় ভোগেন। ২০১২ সালে তিনি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করেছিলেন।

ইরাক যুদ্ধের হোতা:

চেনি ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডনাল্ড রামসফেল্ড ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে হামলা চালানোর জন্য সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিলেন।

তিনি দাবি করেছিলেন, ইরাকের সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদার যোগাযোগ রয়েছে এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলার সঙ্গে তাদের যোগ থাকতে পারে—যা পরে তদন্তে অসত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

চেনি মনে করেছিলেন, মার্কিন সেনাদের ইরাকে ‘মুক্তিদাতা হিসেবে অভিনন্দন জানানো হবে’ এবং যুদ্ধ ‘কয়েক সপ্তাহেই শেষ হবে।’ কিন্তু স্তবে সেই যুদ্ধ চলেছিল প্রায় এক দশক এবং প্রাণহানিও ব্যাপক হয়েছিল।

ইরাকে কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া না গেলেও চেনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ওই সময়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে আগ্রাসন চালানো এবং তৎকালীন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরানো সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।

ব্যক্তিজীবন:

ডিক চেনির জন্ম ১৯৪১ সালের ৩০ জানুয়ারি নেব্রাস্কার লিঙ্কনে। কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে ওয়াইওমিংয়ে চলে গিয়েছিলেন।

 ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেন, পরে ওয়াইওমিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

তিনি কখনও প্রেসিডেন্ট হননি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য চেষ্টাও করেননি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। দশকের পর দশক ধরে তিনি পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়ে এসেছিলেন।

চেনির শিকারের একটি ঘটনার জন্যও অনেকে তাকে মনে রাখবে। ২০০৬ সালে এক শিকার অভিযানে চেনি দুর্ঘটনাবশত নিজের এক বন্ধুকে গুলি করে আহত করে আলোচনায় এসেছিলেন।