Published : 29 Dec 2022, 09:05 PM
ইউক্রেইনে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিশ্চল হয়ে পড়েছে। সেখানে এখন রুশ বাহিনী বা ইউক্রেইনীয় সেনাবাহিনী কেউই উল্লেখ করার মত অগ্রসর হতে পারছে না বলে মনে করেন ইউক্রেইনের গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভ।
বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘পরিস্থিতি থমকে গেছে। কেউই আর অগ্রসর হতে পারছে না।”
গত নভেম্বর মাসে ইউক্রেইনের সেনারা দক্ষিণের খেরসন নগরী পুনঃদখল করে। এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হচ্ছে পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের বাখমুতের আশেপাশে।
বাকি সব জায়গায় রাশিয়ার বাহিনী এখন রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, শীতের কারণে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেইনের সেনাদের গতিও কমে গেছে।
তবে তুলনামূলকভাবে রাশিয়ার সেনারা বেশি বেকায়দায় আছেন বলে মনে করেন বুদানভ। তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়া এখন সম্পূর্ণরূপে আটকে গেছে। তাদের সামনে কোনও পথ খোলা নেই। তাদের বড় ধরনের হার দেখতে হয়েছে এবং আমার বিশ্বাস, ক্রেমলিন আরো একবার সেনা সংগ্রহের ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
যদিও ইউক্রেইনের সেনাদের হাতেও এখন বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে অগ্রসর হওয়ার মত যথেষ্ট রসদ নেই বলে মনে করেন তিনি।
বলেন, ‘‘আমরা একসঙ্গে সব দিকে তাদের হারাতে পারবো না। এমনকি তারাও এটা পারবে না।
‘‘আমরা এখন অধীর আগ্রহে অস্ত্রের নতুন নতুন যোগান পাওয়ার এবং একইসঙ্গে আরো অত্যাধুনিক অস্ত্র পাওয়ার আশায় দিন গুনছি।”
নভেম্বরে ইউক্রেইনের বেশ কয়েকটি এলাকায় রাশিয়ার সেনাদের হার দেখতে হয়েছে। ইউক্রেইনীয়দের আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটেছে।
এ মাসের শুরুতে কিইভের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ২০২৩ সালের শুরুতে বেলারুশ থেকে মস্কোর পদাতিক বাহিনীর নতুন করে আক্রমণ করার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা বলেছের, রুশ বাহিনী এই যে থেমে আছে। হয়তো তারা দ্বিতীয়বার রাজধানী কিইভ দখলের চেষ্টায় শক্তি সংগ্রহ করছে। এই সময়ে লাখ লাখ রিজার্ভ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে রাশিয়া।
যদিও বুদানভ বেলারুশ থেকে রাশিয়ার সেনাদের নতুন করে হামলা শুরুর আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি রাশিয়ার সৈন্য বোঝাই একটি ট্রেন বেলারুশ-ইউক্রেইন সীমান্তের কাছে থেমেছিল এবং কয়েক ঘণ্টা পর সব সৈন্যকে নিয়ে সেটি ফিরে যায়।
‘‘তারা দিনের আলোয় খোলাখুলি এটা করেছে। যাতে সবাই এটা দেখতে পায়। এমনকি যদি আমরা দেখতে নাও চাই তবুও যেন দেখতে পাই।
‘‘তাই এই মুহূর্তে আমি অন্তত বেলারুশ থেকে রাশিয়ার সেনাদের ঢুকে পড়ার এবং কিইভ বা ইউক্রেইনের উত্তরাঞ্চলে আক্রমণের সত্যিকারের কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।”
সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেলারুশের রাজধানী মিনস্ক সফর করেছে।
তিন বছরের বেশি সময় পর তার হঠাৎ বেলারুশ সফর এই গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে, তিনি হয়তো তার দীর্ঘদিনের মিত্র প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্ককো বেলারুশ দিয়ে ইউক্রেইনে রুশ সেনা প্রবেশের ব্যাপারে রাজি করাতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু বুদানভের বিশ্বাস, বেলারুশের নাগরিক সমাজ এই পরিকল্পনাকে কখনোই সমর্থন করবে না। তারা কোনোভাবেই ইউক্রেইন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইবে না।
এছাড়া, বেলারুশের ৪৮ হাজার সেনা যুদ্ধের জন্য কতটা প্রস্তুত সেটা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
‘‘ওই কারণে প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্ক তার নিজ দেশের বিপর্যয় এড়াতে সব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।”
খেরসন পুনঃদখলের পর ইউক্রেইনের সেনারা এখন বাখমুত ঘিরে রুশ বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
রুশ বাহিনী যদি বাখমুত নগরীর দখল নিতে পারে তবে তারা ইউক্রেইনের রসদ সরবরাহ লাইনে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে পূর্বে ইউক্রেইনের শক্তঘাঁটিগুলোর দিতে অগ্রসর হতে তদের সামনে নতুন এক পথ খুলে যাবে।
বাখমুতে মূলত রাশিয়ার ভাড়াটে সেনাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ চলছে। যারা ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ বলে পরিচিত। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন মূলত রাজনৈতিক পুরস্কারের আশায় বাখমুতের দখল নিতে চাইছেন বলে মনে করা হয়।
গত অক্টবর মাসের মাঝামাঝি থেকে রাশিয়া ইউক্রেইন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে ভয়বাহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
ফলে ইউক্রেইনের লাখ লাখ মানুষকে তুষার ঝরা ঠাণ্ডায় বিদ্যুৎ বিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘর গরম থাকছে না। পানি সংকটও দেখা দিয়েছে।
বুদানভ মনে করেন, রাশিয়ার এই আকাশ হামলা সামনেও অব্যাহত থাকবে। তবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের রিজার্ভে টান পড়েছে। রাশিয়ার অস্ত্রশিল্প প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রের যোগান দিতে পারছে না। তাই রাশিয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালাতে ব্যর্থ হবে।
যুদ্ধে এখন অচলাবস্থা দেখা দিলেও বুদানভের দৃঢ় বিশ্বাস, ইউক্রেইন একদিন তাদের বেদখল হওয়া পুরো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করবেই, এমনকী ক্রাইমিয়াও।
তিনি বলেন, ‘‘ইউক্রেইন ১৯৯১ সালের সীমান্তে ফিরছে। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং ইউক্রেইন স্বাধীনতা পায়।”