ইরানে যুদ্ধবিরতি ‘চড়া মূল্যে ট্রাম্পের আংশিক বিজয়’
এই আপাত সমঝোতা ট্রাম্পকে সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিল, যা একটি বিপজ্জনক দ্বিধাদ্বন্দ্বের আকার নিচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত শুভ বুদ্ধির উদয় হল। কতক্ষণ এই পরিস্থিতি থাকে বলা মুশকিল, তবে আপাতত স্বস্তি।
ওয়াশিংটন সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার সোশাল মিডিয়া ওয়েবসাইটে এক পোস্টে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘সুনির্দিষ্ট’ শান্তি চুক্তির দিকে ‘অনেকটাই এগিয়েছে’ এবং এই আলোচনাকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন।
তার আগে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় রাত ৮টার মধ্যে ইরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আলটিমেটাম দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান কথা না শুনলে ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন সংক্রান্ত স্থাপনার ওপর ব্যাপক হামলা হবে।
সময়সীমা শেষ হওয়ার ঘণ্টাদেড়েক আগেই আপাত স্বস্তির খবর এল, অনেকটাই ‘কানের পাশ দিয়ে গুলি’ যাওয়ার মতো, বলছেন বিবিসির উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি জার্চার।
সংঘাত বন্ধ এবং বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা হবে কিনা—তা নির্ভর করবে ইরানের ওপরও। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির শাসকগোষ্ঠী বলছে, তারা সমঝোতা অনুযায়ী সবই করবে। তবে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জলসীমা, হরমুজের ওপর যে তাদের ‘আধিপত্য’ থাকবেই, তাও জোর দিয়ে বলছে তারা।
এই আপাত সমঝোতা ট্রাম্পকে সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিল, যা একটি বিপজ্জনক দ্বিধাদ্বন্দ্বের আকার নিচ্ছিল। হয় তাকে অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘আজ রাতে পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকি কার্যকরের মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানো লাগতো, নাহলে পিছিয়ে যেতে হত—যার মাধ্যমে কার্যত তার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও খর্ব হতো। এই দুইয়ের মাঝখানে ট্রাম্প হয়তো আপাতত সাময়িক নিষ্কৃতি কিনে নিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আগামী দুই সপ্তাহ ধরে আলোচনা চালাবেন, চেষ্টা করবেন একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর। সেই আলোচনা খুব মসৃন হবে না বলেই মনে হচ্ছে। তারপরও বিশ্ব বাণিজ্যে স্বস্তির হাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম অনেক দিন পর ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে, মার্কিন শেয়ার বাজারেও দেখা গেছে চাঙাভাব। বিনিয়োগকারীদের মনে হচ্ছে, হয়তো সবচেয়ে খারাপ সময় পার হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সকালেও এই ‘আপাত অগ্রগতিকে’ অনেক দূরের মনে হচ্ছিল। সেসময় তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘যা আর কখনোই ফিরবে না’।
“ইরান এর আগে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পিলে চমকানো হুমকি তাদেরকে আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।
“তবে যেটা স্পষ্ট, সেটা হল ট্রাম্পের হতবাক করা, উত্তেজক হুঙ্কার—ট্রুথ সোশালে একইরকম জঘন্যতায় ভরা এক দাবির দুইদিন পর—আধুনিককালে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, ইঙ্গিতও মেলেনি,” বলেছেন জার্চার।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যদি স্থায়ী শান্তি এনেও দেয়, তারপরও ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কথাবার্তা বিশ্ব এতদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে যে দৃষ্টিতে দেখতো, হয়তো তাতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দেবে, মত এ বিশ্লেষকের।
যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় বিশ্বের কাছে নিজেকে স্থিতিশীলতার পক্ষের শক্তি হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করতো, সেই দেশই এখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে। যে প্রেসিডেন্ট দেশের ভেতরকার রাজনীতির রীতিনীতি ও চর্চা ভেঙে আমোদ পেতেন, তিনি এখন বিশ্ব মঞ্চেও একই কাজে মত্ত।
মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটরা তড়িঘড়ি ট্রাম্পের মন্তব্যের নিন্দা জানান। কেউ কেউ তো একধাপ এগিয়ে তার অপসারণও চান।
“প্রেসিডেন্টের শারীরিক-মানসিক অবস্থার যে ক্রমাগত অবনতি ঘটছে এবং তিনি যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই, তা স্পষ্ট,” এক্সে এমনটাই লিখেছেন কংগ্রেসম্যান হোয়াকিন কাস্ত্রো।
মার্কিন সেনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট চাক শুমার বলেছেন, যে রিপাবলিকানরা ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় যোগ দেবেন না তারা এই যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ‘প্রতিটি পরিণতির জন্য দায়ী থাকবেন’।
ট্রাম্পের নিজের দলের অনেকে প্রেসিডেন্টের পক্ষে থাকলেও, আগে প্রায় প্রতিটি ইস্যুতে তিনি দলের কাছ থেকে যে একচেটিয়া সমর্থন পেতেন, মঙ্গলবার থেকে তা দেখা যাচ্ছিল না।
প্রেসিডেন্টের ‘সভ্যত ধ্বংসের’ হুমকির কড়া সমালোচনা করেন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও জর্জিয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অস্টিন স্কট।
“প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে ফল হবে উল্টো। আর আমি সেগুলোর সঙ্গে একমত নই,” বিবিসিকে এমনটাই বলেন তিনি।
ট্রাম্পসমর্থক হিসেবে খ্যাত উইসকনসিনের সেনেটর রন জনসন বলেন, ট্রাম্প যদি তার কথামতো বোমাবর্ষণ করতে থাকেন তবে তা হবে ‘মারাত্মক ভুল’।
টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান নাথানিয়েল মোরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, তিনি ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসকে সমর্থন করছেন না।
“আমরা এমনটা নই, এটা সেই নীতিগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় যা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাকে পথ দেখিয়ে আসছে,” লিখেছেন তিনি।
ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা যায় আলাস্কার সেনেটর লিসা মুরকোস্কি’র। তিনি খোলামেলা সমালোচনা করে লেখেন, “ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সুবিধা পেতে করা হয়েছে, এমন অজুহাতেও প্রেসিডেন্টের এমন হুমকি পার পেতে পারে না।”
তবে ওই হুমকি যে কাজে এসেছে, হোয়াইট হাউস এখন সে কৃতিত্ব নিতেই পারে। পাশাপাশি এটাও সত্য, জনসমর্থন ক্রমশ কমতে থাকা যে প্রেসিডেন্টের এখন দলের ভেতরই সমালোচকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যাকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তার জন্য এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার যে কোনো পথই হবে ‘স্বস্তির’।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া ট্রুথ সোশাল পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সামরিক লক্ষ্য ‘পূরণ করেছে এবং অনেক বেশি কিছু অর্জন করেছে’।
এটা ঠিক—ইরানের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা অনেকটাই কমেছে; গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর এ বছরের ছয় সপ্তাহের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের অনেককে হত্যাও করতে পেরেছে। তারপরও ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থা টিকে আছে, এবং এই যুদ্ধ তাদের নৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে অনেকে ধারণাও করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আরও অনেক লক্ষ্য পূরণ নিয়েও সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর মূল উপাদান ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোথায় তা অজানা। ইয়েমেনের হুতিদের মতো আঞ্চলিক প্রক্সিদের ওপরও তেহরানের প্রভাব থেকেই যাচ্ছে।
এর বাইরে থাকছে হরমুজ প্রসঙ্গও। ইরান যদি শুল্ক বা অন্য কোনো উপায়ে অর্থ না নেওয়ার শর্তেও প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেয়, তাও বিশ্ববাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলসীমার ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এখন আগের চেয়ে আরও বেশি দৃশ্যমান হল।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের বার্তার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ইরান ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ স্থগিত রাখবে এবং ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে’ হরমুজ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ‘মৌলিক রূপরেখা’ মেনে নিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তেহরানের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চল থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নিতে হবে, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞু তুলতে হবে, যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে।
এইসব দাবির কোনোটিই ট্রাম্প মেনে নেবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই। একইসঙ্গে বোঝা যাচ্ছে, সামনের দুই সপ্তাহের আলোচনা খুবই পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হতে যাচ্ছে, এবং একইসঙ্গে এটি নতুন করে সংঘাত শুরুর আগে প্রস্তুতি নেওয়ার চালও হতে পারে।
তবে আপাতত একে ট্রাম্পের ‘আংশিক রাজনৈতিক বিজয়’ মনে করছেন অ্যান্থনি জার্চার।
“তিনি একটি নাটকীয় হুমকি দিয়েছিলেন, এবং কাঙ্ক্ষিত ফলও পেয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি হচ্ছে সাময়িক নিষ্কৃতি, স্থায়ী নিষ্পত্তি নয়। প্রেসিডেন্টের কথা-কাজের দীর্ঘমেয়াদী মূল্য এবং পুরো যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনও অনেকটাই বাকি,” বলেছেন তিনি।
