১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান

জাপানে আঞ্চলিক ভোটে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পুনরায় চালুর অনুমোদন পেয়েছে। এটি পরিচালনা করবে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো)।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান
টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Dec 2025, 03:20 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:22 PM

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের প্রায় ১৫ বছর পর পারমাণবিক শক্তিতে ফেরার পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান। আঞ্চলিক ভোটে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পুনরায় চালুর অনুমোদন পেয়েছে। 

সোমবার থেকে চালু হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। জাপানের পারমাণবিক জ্বালানিতে ফেরার ক্ষেত্রে এ এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১১ সালের ভূমিকম্প ও সুনামির পর বন্ধ করে দেওয়া ৫৪টি চুল্লির একটি ছিল। 

চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর থেকে বিশ্বের ভয়াবহতম পারমাণবিক বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত জাপানের ফুকুশিমা দাইইচি দুর্ঘটনার পর কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিপর্যয়ের পর থেকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে জাপান তাদের ৩৩টি সচল চুল্লির মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪টি পুনরায় চালু করেছে। 

তবে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া হতে যাচ্ছে প্রথম কেন্দ্র, যেটি টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) পরিচালনা করবে। ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও এই টেপকোই পরিচালনা করত।

সোমবার নিইগাতা প্রশাসনিক অঞ্চলের অ্যাসেম্বলিতে গভর্নর হিদেয়ো হানাজুমির প্রতি আস্থা ভোট পাস হয়। হিদেয়ো গত মাসে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার প্রতি আস্থা ভোটের ফলে কেন্দ্রটি চালু করায় আর কোনও বাধা রইল না।

ভোটের আগে প্রায় ৩০০ বিক্ষোভকারী, যাদের অধিকাংশই প্রবীণ নাগরিক, নিইগাতা অ্যাসেম্বলির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। 

৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে তারা ‘পারমাণবিক শক্তি চাই না’, ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পুনরায় চালুর বিরোধিতা করি’, ‘ফুকুশিমাকে সমর্থন করুন’  লেখা ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ জানান।

বিক্ষোভের শুরুতে সমবেতরা জন্মভূমির প্রতি মমত্ববোধের গান ‘ফুরুসাতো’ গেয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। একজন বিক্ষোভকারী মাইকে প্রশ্ন করেন, “টেপকো কি কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া চালানোর যোগ্য?” উপস্থিত জনতা সমস্বরে চিৎকার করে উত্তর দেয়, “না!”

পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকে জানিয়েছে, টেপকো আগামী ২০ জানুয়ারি এই কেন্দ্রের সাতটি চুল্লির প্রথমটি চালু করার কথা বিবেচনা করছে। 

টেপকোর মুখপাত্র মাসাকাতসু তাকাতা বলেন, “আমরা এ ধরনের দুর্ঘটনা আর কখনও না ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নিইগাতাবাসীকে যেন একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয় তা নিশ্চিত করছি।” 

তবে কন্দ্রটি চালুর নির্দিষ্ট সময় নিয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। নিইগাতা বাসিন্দাদের সমর্থন পেতে এ বছরের শুরুর দিকে টেপকো আগামী ১০ বছরে এই প্রশাসনিক অঞ্চলে ১০০ বিলিয়ন ইয়েন (৬৪১ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। 

কিন্তু অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এখনো সন্দিহান। অক্টোবরে প্রিফেকচার থেকে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ বাসিন্দা টেপকোর মাধ্যমে এই কেন্দ্র পরিচালনার বিষয়ে উদ্বিগ্ন।

৫২ বছর বয়সী আয়াকো ওগা ২০১১ সালে ফুকুশিমা কেন্দ্রের চারপাশের ২০ কিলোমিটার জুড়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের একজন। বর্তমানে তিনি নিইগাতার কৃষক এবং পারমাণবিক বিরোধী কর্মী। 

ওগা বলেন, “আমরা পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি সরাসরি জানি এবং এটি উপেক্ষা করতে পারি না।” তিনি আরও জানান, ফুকুশিমার ঘটনার পর থেকে তিনি এখনও মানসিক ট্রমা বা পিটিএসডির মতো উপসর্গে ভুগছেন।

সোমবারের ভোটকে টেপকোর প্রথম চুল্লিটি পুনরায় চালুর চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই একটি চুল্লি চালু হলে টোকিও অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ২ শতাংশ বাড়বে।

দুই মাস আগে ক্ষমতা গ্রহণ করা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির খরচ কমাতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। 

জাপানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভরশীল। ক্রমবর্ধমান এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ২০৪০ সালের মধ্যে পারমাণবিক শক্তির হিস্যা দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এশিয়া প্যাসিফিকের ভাইস চেয়ারম্যান জশুয়া এনগু বলেন, “কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে জনস্বীকৃতি পাওয়া এই লক্ষ্য অর্জনে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হবে।”

তবে ওগার মতো বিক্ষোভকারীদের কাছে ফুকুশিমার সেই শিক্ষা ভোলার নয়। সোমবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “ফুকুশিমা দুর্ঘটনার শিকার হিসেবে আমি চাই যে, জাপানের বা বিশ্বের কোথাও আর কাউকে যেন পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষতির শিকার না হতে হয়।”