১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ইসলাম গ্রহণ করায় বন্দি দুই বোনকে মুক্তির আদেশ দিল এলাহাবাদ হাই কোর্ট

বেআইনিভাবে দুই বোনকে আটকে রাখার মাশুল হিসেবে তাদের মা-বাবা এবং ভারতের উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ রূপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

ইসলাম গ্রহণ করায় বন্দি দুই বোনকে মুক্তির আদেশ দিল এলাহাবাদ হাই কোর্ট
উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাই কোর্ট। ছবি: এক্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Aug 2026, 10:59 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তাদের বাবা বাড়িতে বন্দি করে রেখেছেন- এমন অভিযোগে চলা মামলায় অবশেষে দুই বোনকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এলাহাবাদ হাই কোর্ট।

ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারে হস্তক্ষেপের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের ধর্মীয় পছন্দের কারণে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় কোনওভাবেই হস্তক্ষেপ করা যায় না। 

একইসঙ্গে বেআইনিভাবে আটকে রাখার মাশুল হিসেবে দুই বোনের মা-বাবা এবং উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ রূপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। 

এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। হাই কোর্ট জানিয়েছে, স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণ করায় ওই দুই বোনকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

দুইজনকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি পুলিশকেও কড়া বার্তা দিয়েছে আদালত। ওই দুই নারীর ব্যক্তিগত জীবন বা তাদের কোনও সিদ্ধান্তে যেন পুলিশ বা প্রশাসন কোনওরকম হস্তক্ষেপ না করে।

নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবারে আটকে থাকা দুই বোনের মুক্তির দাবিতে দায়ের হওয়া একটি হেবিয়াস কর্পাস রিট আবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাই কোর্ট।

ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকারকেই রায়ের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে আদালত।

গত ৩১ জুলাই এই মামলার আগের শুনানিতে হাই কোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল যাতে দুই বোনকে সশরীরে আদালতে হাজির করা হয়।

সেদিন শুনানি চলাকালেই আদালত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানিয়ে বলেছিল, “কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি নিজের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করে তবে তা তার সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। সেখানে কোনও ধরনের প্ররোচনা, বলপ্রয়োগ বা প্রতারণা না থাকলে তাদের বাবা-সহ কারও অধিকার নেই সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার।”

২০২০ ও ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন ৩৫ ও ২০ বছর বয়সী ওই দুই বোন। বিষয়টি জানতে পেরে তাদের বাবা ঘরে তাদেরকে বন্দি করে রাখেন এবং তাদের নথি-পত্র ও পাসপোর্ট কেড়ে নেন।

গত বছর তারা কোনোমতে পালিয়ে কলকাতায় চলে গেলে তাদের বাবা অপহরণ ও জোর করে ধর্মান্তরের মামলা করেন। আগ্রা পুলিশ কলকাতা থেকে তাদের উদ্ধার করে বাবার হেফাজতে দেয়।

পরে আদালতে দুই বোন অভিযোগ করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণে তাদের বাবা তাদেরকে আটকে রেখেছিলেন এবং ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দুধর্মে ফিরতে চাপ দেন।

আবেদনকারী দুই বোনের পক্ষে হাই কোর্টে যুক্তি তুলে ধরা আইনজীবী সৈয়দ কাইফ হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আদালতের রায় পুনরায় প্রমাণ করল যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতা তার পরিবারের ধর্মীয় পছন্দের অনুমতির ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না।” 

আইনজীবী আরও জানান, “আদালতের এই হস্তক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম হওয়ার পরও তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

“সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায় আছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজস্ব মত, বিশ্বাস এবং ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকারকে মৌলিক স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এলাহাবাদ হাই কোর্টের নির্দেশ সেই দীর্ঘ আইনি পরম্পরাকেই সুদৃঢ় করল”, বলেন এই আইনজীবী।