Published : 06 Feb 2026, 01:09 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে শেষ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বর্ধিত মেয়াদও বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক তুমুল অস্থিতিশীলতার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নতুন কোনো সমঝোতায় না পৌঁছানোয় বিশ্বজুড়েই ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
২০১১ সালে স্বাক্ষরিত স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি বা নিউ স্টার্ট চুক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকে নির্ধারিত একটি সীমার মধ্যে বেঁধে রেখেছিল। এতে দেশদুটির স্ট্র্যাটেজিক (দূর থেকে মারা যায়, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়) পারমাণবিক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ ও এ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও ছিল।
বৃহস্পতিবার চুক্তিটির ইতি ঘটায় ১৯৮০-র টান টান স্নায়ুযুদ্ধের দশকের পর এবারই প্রথম মস্কো ও ওয়াশিংটন লাগামহীনভাবে তাদের স্ট্র্যাটেজিক পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার বিস্তৃত করার সুযোগ পেল, বলছে এনডিটিভি।
২০১১ সালে ওই নিউ স্টার্ট চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময় এর মেয়াদ ছিল ১০ বছরের; পরে তা আরও ৫ বছর বাড়ে।
এমন এক সময়ে এই চুক্তি শেষ হল যখন ইউক্রেইন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। এদিকে পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও মিত্রদের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
চীন তাদের স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক ভাণ্ডারকে বিস্তৃত করেই যাচ্ছে; শক্তিধর দেশগুলো নিজ নিজ অঞ্চলকে মুঠির মধ্যে রাখতে মনোযোগী হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়ায় অনেক দেশই এখন পারমাণবিক অস্ত্রে নিজেদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
“চুক্তির ইতি মোটেও বিশ্বকে নিরাপদ করবে না। আসল ক্ষতিটা হবে স্বচ্ছতায়, চুক্তি শেষ হওয়ায় রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়বে,” বলেছেন জেনিভার ইউনাইটেড নেশনস ফর ডিসআর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ গবেষক পাভেল পদভিগ।
নিউ স্টার্ট চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৫০টি করে স্ট্র্যাটেজিক পরমাণু অস্ত্রের ওয়ারহেড মোতায়েন রাখতে পারতো। ইউক্রেইনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় সন্দেহ পোষণ করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চুক্তির যে অংশে একে অপরের অস্ত্রভাণ্ডার পর্যবেক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছিল তা মানা বাদ দেন।
এরপরও তিনি নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ আরও অন্তত এক বছর বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলে তাহলে রাশিয়াও একই কাজ করবে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আরেকদফা নিউ স্টার্টের মেয়াদ বাড়াতে রাজি নন।
“নিউ স্টার্টের মেয়াদ বাড়ানোর বদলে আমাদের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের উচিত হবে একটি নতুন, উন্নত ও আধুনিক চুক্তি তৈরি করা, যা দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে,” বৃহস্পতিবার নিজের সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশালে এমনটাই লেখেন ট্রাম্প।
মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট অবশ্য বারবারই পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে সৃষ্ট হুমকির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন; তিনি চীনকে রেখে নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিও করতে চাইছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বেইজিং এ ধরনের চূক্তির মধ্যে ঢুকতে নারাজ।
“চীনের পারমাণবিক সক্ষমতা কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। এই মুহূর্তে চীনকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় যোগ দিতে বলা যৌক্তিক বা ন্যায্য হতে পারে না,” মঙ্গলবার সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে এমনটাই বলেছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান।
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ‘গঠনমূলক’ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধিতে রাজি হবে এবং বৈশ্বিক স্ট্র্যাটেজিক পরমাণু অস্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখবে বলে চীন আশা করছে, বলেছিলেন তিনি।
নিউ স্টার্ট চুক্তিতে স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও স্বল্প দূরত্বে মারা যায় এবং কম ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম এমন ট্যাকটিকাল পরমাণু অস্ত্র নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ইউক্রেইনে রাশিয়া সামরিক অভিযানে নামার পর এই ট্যাকটিকাল অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছিল, বলেছেন সিআইয়ের সাবেক পরিচালক বিল বার্নস।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে গত কয়েক বছর ধরে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছে। বেইজিং খুব দ্রুত তাদের পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও ধারণা তাদের।
গত বছর কংগ্রেসকে দেওয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে চীনের সামরিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে পেন্টাগন বলেছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক অস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনার জায়গায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে বেইজিং তার পরমাণু ভাণ্ডার সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে।
২০৩০ সালের মধ্যে হাজারের বেশি ওয়ারহেড হাতে পাওয়ার লক্ষ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি কাজ করে যাচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।
বেইজিংয়ের নীতিতে বলা হয়েছে, কেউ পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর আঘাত না হানলে তারাও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তা সত্তেও তারা অস্ত্রের পরিমাণ বাড়িয়ে যাচ্ছে এবং পরমাণু ঝুঁকি কমাতে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কোনো আলোচনাতেই তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না, বলেছে পেন্টাগন।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে প্রবেশ করার ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারিত করার কথা ভাবতে পারে, যা বিশ্বের পরিস্থিতিতে আরও উত্তপ্ত এবং ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ১৯৯২ সালে, রাশিয়া ১৯৯০ সালে, আর চীন ১৯৯৬ সালে।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেশ কয়েকবার ‘অস্তিত্ব বিপন্ন হলে মস্কো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে’ বলে হুমকি দিলেও পরমাণু ভাণ্ডার সম্প্রসারণে রাশিয়াকে খুব বেশি আগ্রাসী বলে মনে হচ্ছে না। এর বদলে তারা বিশ্বজুড়ে যত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা আছে তাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তাদের বুরেভেস্তনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, পসেইডন টর্পেডো ড্রোন, কিনঝাল হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিক বিশ্বজুড়ে নতুন বিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করতে চাইলে সেখানে নেটো সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মতো অনেক বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে হবে বলে রুশ কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন।
এদিকে এক্সিওস জানিয়েছে, নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনার পথ খুলতে আপাতত মস্কো-ওয়াশিংটন উভয়ই আগামী ছয় মাস নিউ স্টার্ট চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলবে।