Published : 01 Apr 2026, 06:07 PM
আপনার ঘর কী কংক্রিটের, নাকি কাঁচা? ভাত নাকি রুটি খান? মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ আছে, নাকি বাটন ফোন চালান? এক ছাদের নিচে কয়টি বিবাহিত দম্পতি আছে?
ভারতের শতকোটির বেশি মানুষকে আসছে দিনগুলোতে যে ৩৩টি প্রশ্ন শুনতে হবে, এগুলো তার কয়েকটি।
এসব প্রশ্নের সাহায্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনশুমারি; দেড় দশকেরও বেশি সময় আগে ২০১১ সালে সর্বশেষ তারা এমন জনগণনায় মেতেছিল, বলছে বিবিসি।
দুই ধাপে শেষ করতে চাওয়া এই গণনাকে দেখা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হিসেবে। এতে ৩০ লাখেরও বেশি কর্মী এক বছরে ভারতের প্রতিটি লোকের কাছে পৌঁছাবেন, শুনবেন ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর।
দেশটির ১৬তম, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর অষ্টম এ জনগণনায় জাতপাত সংক্রান্ত তথ্যও নেওয়া হবে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির নীতিনির্ধারণ, কল্যাণমুখী সুবিধাদি পৌঁছে দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও এ শুমারির গুরুত্ব অপরিসীম।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যা বিবেচনায় ২০২৩ সালেই চীনকে টপকে গেছে ভারত। দেশটিতে এখন লোকসংখ্যা ১৪০ কোটির বেশি।
এরপরও জন্মহার কমতে থাকায় এবং জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৮ বা তার নিচে হওয়ায় ভারত এখনও বিশ্বের অন্যতম তরুণ দেশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ লোকই কর্মক্ষম বয়সের।
ভারতে সাধারণত প্রতি এক দশকে জনগণনা বা আদম শুমারি হয়ে থাকে। সর্বশেষ হয়েছিল ২০১১ সালে। সে হিসাবে এই দশকের শুরুতে ২০২১ সালেই নতুন গণনা হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড মহামারীর কারণে তা পিছিয়ে যায়, পরে প্রশাসনিক ও নির্বাচনী সূচি ঠিক করতে করতে এ বছরে এসে ঠেকে।
২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৭ হাজারের বেশি উপজেলা, ৯ হাজার ৭০০-র বেশি শহর ও প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার গ্রামে এবারের শুমারি হবে; এতে মাঠপর্যায়ে যারা গণনাকারী বা তাদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকবেন, তাদের বেশিরভাগই হয় স্কুল শিক্ষক, সরকারি কর্মী নয়তো স্থানীয় কর্মকর্তা।
এবারই প্রথম ডিজিটাল পদ্ধতিতে গণনা হবে, গণনাকারীরা মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ ও আপলোড করবেন।
কর্তৃপক্ষ স্ব-গণনা পদ্ধতিও চালু করেছে, এতে বাসিন্দারা ১৬টি ভাষায় সমৃদ্ধ একটি অনলাইন পোর্টালে নিজেরাই তথ্য জমা দিতে পারবেন, যেখানে একটি আলাদা আইডি তৈরি হবে, যা পরে গণনাকর্মীরা যাচাই করতে পারবেন।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণনার দুই ধাপের প্রথমটি হবে খানা জরিপ; এতে বাড়ির অবস্থা, সুবিধাদি ও পরিবারের সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে হবে লোক গণনা। এটি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা। এ পর্বে জনমিতি, শিক্ষা, অভিবাসন ও জন্মহার বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ ধাপে জাতপাত বিষয়ক তথ্যও নেওয়া হবে। ভারতে এই জাতপাত রাজনৈতিভাবে বেশ সংবেদনশীল বিষয়, এবং এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে।
প্রাথমিকভাবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, দিল্লি, গোয়া, কর্ণাটক, মিজোরাম ও ওড়িষার মতো নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় গণনা কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথমে ১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে স্ব-গণনা; এরপর ১৬ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত খানা জরিপ।
ঔপনিবেশিক আমলে মাথা গোনার মাধ্যমে যে গণনা শুরু হয়েছিল পরের দিকে প্রতিনিয়ত তার আওতা বেড়েছে, দেশটির বদলে যাওয়া নীতির প্রতিফলন দেখা গেছে।
১৮৭২ সালের প্রথম গণনা প্রচেষ্টায় ছিল ১৭টি প্রশ্ন। আদতে সেটি ছিল গৃহ নিবন্ধন। কে কোথায় থাকে, তার বয়স কত, সঙ্গে ধর্ম, জাত ও পেশা বিষয়ক তথ্য।
১৮৮১ সালে দেশজুড়ে হওয়া প্রথম সমন্বিত শুমারিতে যে প্রশ্নতালিকা ছিল তাতে পরিচয় (নাম, নারী না পুরুষ, বৈবাহিক অবস্থা), সামাজিক সূচক (জাত, ধর্ম, ভাষা) এবং লিখতে-পড়তে পারা ও প্রতিবন্ধিতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো স্থান পায়।
পরের দশকগুলোতে ভাষা, শিক্ষার হার, পেশা সংক্রান্ত প্রশ্ন আরও সুনির্দিষ্ট হয়, যুক্ত হয় দ্বিতীয় পেশা ও নির্ভরতার ধরন সংক্রান্ত জিজ্ঞাসাও।
১৯০১ সালের শুমারিতে থাকা ১৬টি প্রশ্নের মধ্যে ইংরেজি ভাষায় কার কেমন দক্ষতা সে বিষয়ক প্রশ্নও ছিল।
১৯৪১ সালের শুমারি থেকে শুরু হয় মৌলিক পরিবর্তন। সেবার ২২টি প্রশ্নে ‘আপনি কে’ তার সঙ্গে সঙ্গে ‘আপনি কীভাবে থাকেন’ তাও জানা শুরু হয়।
জন্মহার, কর্মসংস্থানের অবস্থা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, অভিবাসন ও চাকরি খোঁজার প্রসঙ্গগুলোও ধীরে ধীরে স্থান পেতে থাকে, যাতে বোঝা যায় প্রশাসনের নজর অর্থনৈতিক জীবনাচরণের দিকে ঝুঁকছে।
স্বাধীনতার পর এ পরিবর্তন আরও ব্যাপকতা পায়। ১৯৫১ ও ১৯৬১ সালের গণনায় আসে জাতীয়তা, উদ্বাস্তু নাকি ভূমির মালিক এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত আরও তথ্য।
১৯৭০-র দশক থেকে জনশুমারির চরিত্র বদলে মোটাদাগে আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। অভিবাসন সংক্রান্ত ইতিহাস, বসবাসের কাল, জন্মহারের ধরন, পেশার শ্রেণিবিন্যাস আদর্শ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, বিশেষ করে ২০০১ ও ২০১১ সালের শুমারিতে অর্থনীতির আধুনিকায়নে ঝোঁক স্পষ্ট হয়েছে। নেওয়া হয়েছে যাতায়াতের ধরন, প্রান্তিক বনাম মূলধারার কাজ, শিক্ষায় উপস্থিতি এবং জন্মহার ও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক আরও বিস্তারিত তথ্য।
দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বদলাতে এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে পরিবারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে, শুমারি সেখানে এসেও পৌঁছেছে। এবারের গণনায় একসঙ্গে (লিভ ইন) থাকা যুগল নিজেদের বিবাহিত বলে নিবন্ধিত করার সুযোগ পাচ্ছেন, যদি তারা তাদের সম্পর্ককে ‘স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী’ মনে করেন। ভারতের সমাজে যে চুপিসারে সামাজিক বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে—এসবই তার ইঙ্গিত।
তথ্য সংগ্রহের পরিমাণ ও ধরন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে সেগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হবে তা নিয়ে উদ্বেগও।
ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারসহ (এনপিআর) ডেটাবেজ তৈরির সাম্প্রতিক সব চেষ্টা এবং তার সঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন জনমনে গণনা নিয়ে ভীতি বাড়িয়েছে; গণনার প্রশ্ন নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যবহৃত হতে পারে কিনা তা নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন।
“যদিও নাগরিকত্বের সঙ্গে শুমারির কোনো সম্পর্ক নেই, তাও এটি উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে অনেক পরিবার বাড়িয়ে বাড়িয়ে তথ্য দিতে পারেন বা বাদ পড়ার হাত থেকে বাঁচতে অভিবাসী অনুপস্থিত সদস্যকেও গণনায় যুক্ত করে দিতে পারেন,” বলেছেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় জনমিতিবিদ কেএস জেমস।
এসব উদ্বেগের বাইরেও একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। সেটি হল- জনসংখ্যা বিষয়ক হালনাগাদ তথ্য ছাড়াই ভারতকে গত দেড় দশক তার নানান নীতি ঠিক করতে হয়েছে।
জনশুমারি না হওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষকে নির্ভর করতে হয়েছে নমুনা জরিপের ওপর, তা সে খরচের ধরনই হোক বা শ্রমশক্তি সংক্রান্ত তথ্য। পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় সেসব নমুনা জরিপকে মোটাদাগে প্রতিনিধিত্বমূলক রাখার চেষ্টা করেছে।
অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অশ্বিনী দেশপান্ডের মতো অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভারতের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক মানচিত্র আপডেট করতে এই শুমারি অপরিহার্য, নাহলে কোনটা গ্রাম, কোনটা শহর বা কোনটা উপশহর হয়ে উঠছে সে সম্বন্ধে সঠিক চিত্র মিলবে না।
দেড় দশকে অনেক এলাকা বদলে গেছে কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও তথ্যের জন্য ২০১১ সালের তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করছে
“ভারতের বিশাল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সরকারি ব্যয়ে এর প্রভাব মারাত্মক,” বলছেন দেশপান্ডে।
কোন প্রকল্পের জন্য কারা যোগ্য, তা যদি ত্রুটিপূর্ণ বা পুরনো তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় তাহলে প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা ঠিকঠাক বোঝা যায় না। ফলে প্রকল্পের সুবিধা যাদের দরকার, তারা পান না; আবার যাদের দরকার নেই, তারা পেয়ে যান। এতে পুরো বিতরণব্যবস্থাই ব্যাহত হয়।
কোনটি আদতেই গ্রাম, তা ঠিকঠাক জানা না থাকায় গ্রামের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের টাকা ভুল জায়গায় চলে যাচ্ছে। আবার শহরে আসা মানুষদের সম্বন্ধে সঠিক তথ্য না থাকায় সরকারি অনেক নীতিতে এদের জায়গা হয় না, কোভিড মহামারীর সময় যে ফাঁকফোকর ধরা পড়ে গিয়েছিল।
“এই শুমারি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটিই ভারতের নির্ভুল প্রতিচ্ছবি, যেখানে ধর্ম-জাত থেকে শুরু করে কাজ, পড়াশোনা, সুযোগসুবিধা—সবই ধরা পড়বে, ভারতের মানুষ আসলে কীভাবে থাকে তার পূর্ণাঙ্গ ছবি মিলবে,” বলেছেন দেশপান্ডে।