Published : 15 Aug 2026, 02:51 PM
ক্যামেরুনে ১৯৮৪ সালে পল বিয়া যখন তার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন, তখনকার এক শিক্ষার্থী নফোরমি বিমের বয়স ছিল ২৩ বছর।
এখন বিমের বয়স ৬৫ বছর, অবসর নিয়েছেন শিক্ষকতা থেকে। আর বিয়ার বয়স ৯৩ বছর, তিনিই দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন। গত বছর এক বিতর্কিত নির্বাচনে অষ্টম মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর ফলে প্রায় ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত তার ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের আগে বিয়া বলেছিলেন, “সেরা সময় এখনও আসা বাকি।” তার বিরোধীরা ওই নির্বাচনকে কারচুপিতে ভরা বলে বর্ণনা করেছিলেন। নির্বাচনে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষও হয়েছিল।
সিএনএন লিখেছে, চার দশক ধরে ক্যামেরুন শাসন করা এ ব্যক্তি গত দুই মাস ধরে নিজের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে রয়েছেন।
তার দপ্তরের ভাষায়, ‘স্বল্প সময়ের ব্যক্তিগত সফরে’ গত ৭ জুন তিনি ইউরোপে যান। কয়েক বছরের মধ্যে মধ্য আফ্রিকার দেশটিতে এটিই তার সবচেয়ে দীর্ঘ টানা অনুপস্থিতি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, “প্রেসিডেন্ট পল বিয়া জীবিত আছেন এবং খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন।”
প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। তবে এবার তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার স্বাস্থ্য এবং তার অনুপস্থিতিতে কে দেশ পরিচালনা করছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে বিয়া সরকারের মুখপাত্র রেনে এমানুয়েল সাদি ফরাসি গত সপ্তাহে রেডিও আরএফআইকে বলেন, বিয়া সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় আছেন এবং তিনি কোনো হাসপাতালে ভর্তি নেই। তবে তিনি বিয়ার অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি।
১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ক্যামেরুনে মাত্র দুজন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পল বিয়া রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেন।
এরপর ১৯৮৪ সালে প্রথম একদলীয় নির্বাচনে জয় এবং পরবর্তীতে বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে টানা সাত নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৪২ বছর ধরে তিনি শাসন ক্ষমতা ধরে রেখেছেন।
সিএনএন লিখেছে, ক্যামেরুনের বেশিরভাগ নাগরিক তরুণ হলেও বিয়াই তাদের দেখা একমাত্র প্রেসিডেন্ট। দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তিনি দূর থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পদে রদবদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন।
একটানা দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে সাংবিধানিক কাউন্সিল যাতে প্রেসিডেন্ট পদ ‘শূন্য’ঘোষণা করে, সেজন্য উদ্যোগ নিতে পার্লামেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় তরুণ নেতা স্যামুয়েল হিরাম ইয়োদি।
যদিও বিয়ার ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিমে আশির দশকের শুরুর সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিয়া যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন তখন তরুণরা তাকে পরিবর্তনের নতুন আলো হিসেবে ভাবত।
“আমরা ভেবেছিলাম তিনি তরুণ, গতিশীল ও সুদর্শন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আশা চরম হতাশায় রূপ নিয়েছে।”
জার্মানিভিত্তিক ক্যামেরুনীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক কলিন্স মোলুয়া ইকমে বলেন, ক্যামেরুনের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা ভেঙে পড়েছে। জরাজীর্ণ সড়ক, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্নীতি এবং তরুণদের বেকারত্ব দেশটির অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ডচাং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক উইলসন তামফু বলেন, প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত থাকলেও সরকারের দৈনন্দিন কাজ চালানোর মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
“কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ক্যামেরুনের ইংরেজিভাষী অঞ্চলগুলোতে কয়েক বছর ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত, উত্তরাঞ্চলে বোকো হারাম জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলা ও তরুণদের অর্থনৈতিক হতাশা সমাধানে মূল উদ্যোগের প্রবল ঘাটতি রয়েছে।”
সিএনএন লিখেছে, ক্যামেরুনের নাগরিকদের গড় আয়ু ৭০ বছরের কম হলেও প্রেসিডেন্ট বিয়া বিদেশে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে ৯৩ বছর বয়সেও টিকে আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিমের মতো লাখ লাখ সাধারণ ক্যামেরুনিয়ান এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “শাসকদের সামান্য সর্দি-কাশি হলেও তারা বিদেশে চলে যান, আর দেশের সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবার অভাবে মারা যান।
“জানি না মৃত্যুর আগে জীবনে দ্বিতীয় কোনো প্রেসিডেন্ট দেখে যেতে পারব কি না!”