এমন একটি অঞ্চলে ইসরায়েলের ওপর বদলা নেওয়ার হুমকি বাড়ছে, যে অঞ্চলটি এরই মধ্যে গাজা যুদ্ধ এবং লেবাননে সংঘাত বাড়তে থাকা নিয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
Published : 31 Jul 2024, 07:22 PM
ইরানের রাজধানী তেহরানে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক শাখার শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া হত্যার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। হামাসের সশস্ত্র শাখা এরই মধ্যে এ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। হামাসের মিত্র ইরানও বলছে, তারা হানিয়ার রক্তের বদলা নেবে।
ইসরায়েল বিদেশে তাদের চালানো কোনও অভিযানের বিষয়ে সাধারণত মন্তব্য করে না। এবারও হানিয়া হত্যা নিয়ে ইসরায়েল কোনও মন্তব্য করেনি। হত্যার দায়ও স্বীকার করেনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কেবল বলেছে, তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দেখছে। ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য নতুন কোনও নির্দেশনাও তারা জারি করেনি।
কিন্তু হানিয়া হত্যায় সবার নজরই এখন ইসরায়েলের ওপর, যে দেশটি হামাসের সব নেতাকে খুঁজে খুঁজে বের করে সাজা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাছাড়া, ইরানে এর আগে ইসরায়েলের হামলা চালানোর নজিরও আছে।
গত ১৯ এপ্রিলে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র ঘিরে আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর ইসরায়েল যে ধাঁচে হমলা চালিয়েছিল, সেই একই কায়দায় সম্ভবত এবার হামলা চালিয়ে হানিয়াকে হত্যা করেছে তারা।
ইসরায়েলের জঙ্গিবিমানগুলো ইরানের আকাশসীমার বাইরে থেকে রকেট ছুড়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে, এমন একটি অঞ্চলে ইসরায়েলের ওপর বদলা নেওয়ার হুমকি বাড়ছে, যে অঞ্চলটি এরই মধ্যে গাজা যুদ্ধ এবং লেবাননে সংঘাত বাড়তে থাকা নিয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের রেভলুশ্যনারি গার্ড বুধবার তাদের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা পরই হানিয়া নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে জানায়। স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে তেহরানের যে বাড়িতে হানিয়া ছিলেন, সেখানে তিনি এক দেহরক্ষীসহ নিহত হন। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড।
ইসমাইল হানিয়া ছিলেন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান। তিনি মূলত কাতারে থাকতেন। গাজায় যুদ্ধের এই সময়ে তিনি হামাসের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
হামাসের সশস্ত্র শাখা একটি বিবৃতিতে বলেছে, “হানিয়া হত্যাকাণ্ড ‘যুদ্ধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে এবং এর প্রতিক্রিয়াও বড় ধরনের হবে।”
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক বিবৃতিতে বলেছেন,এ ঘটনায় ইসরায়েল নিজেদের জন্যই কঠোর শাস্তি বেছে নিয়েছে। হামাস নেতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া তেহরানের কর্তব্য, যেহেতু তার মৃত্যু হয়েছে ইরানের মাটিতে।
ইরানের বাহিনী গাজা যুদ্ধের শুরুর দিকে সরাসরি ইসরায়েলের মাটিতে হামলাও চালিয়েছে। এখন হানিয়া হত্যার জবাব কীভাবে দেওয়া যায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা বোর্ড বৈঠকে বসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
ওদিকে,ফিলিস্তিনের বিভিন্ন দল ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে হামলা চালানো এবং গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদ বলেছে,ইসরায়েল পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। হামাসের সশস্ত্র শাখা বলেছে, তারা তাদের পথেই চলবে এবং তাদের জয় অনিবার্য।
হানিয়া হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল যখন গাজায় ইসরায়েলের হামলা ১০ মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ শেষের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধ থেকে বৃহত্তর পর্যায়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে যাওয়ার হুমকি এমনিতেই আছে। কাতার, মিশর গাজায় যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।
একইসময়ে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাতেও যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে। ইসরায়েলের গোলান মালভূমিতে হামলায় ১২ শিশু-কিশোর নিহতের ঘটনার পর বৈরুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের সশস্ত্র হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যা করার দাবি করেছে তারা।
ইসরায়েলের ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানে হামাস নেতা হানিয়া নিহত হওয়ার খবর আসে। এসব ঘটনার ঘনঘটায় গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি হওয়া আরও অসম্ভব হয়ে উঠল বলেই মনে হচ্ছে।
আর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং হামাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার ওপর হামলার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্য পুরোদস্তুর যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এমন যুদ্ধ এড়ানো হয়ত অসম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়ড অস্টিন বলেছেন, ওয়াশিংটন উত্তেজনা কমাতে কাজ করবে। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না যুদ্ধ অনিবার্য। কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সবসময়ই আছে বলে আমি মনে করি।”
সূত্র: বিবিসি/রয়টার্স