০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ হবে ‘বড় সামরিক জুয়া’

এটি তেহরানের দিক থেকে নতুন পাল্টা হামলা উসকে দিতে পারে এবং এখন যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে তার ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, মত বিশেষজ্ঞদের।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ হবে ‘বড় সামরিক জুয়া’
ফ্লোরিডায় মিক্সড মার্শাল আর্ট উপভোগ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Apr 2026, 01:18 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:24 PM

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বড় ও অনির্দিষ্টালের সামরিক জুয়া হতে পারে যা তেহরানের দিক থেকে নতুন পাল্টা হামলা উসকে দিতে পারে এবং এখন যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে তার ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। 

চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তার নৌবাহিনী ‘হরমুজ প্রণালিতে ঢোকা বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা সব নৌযানকে আটকাতে’ ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু করছে। 

পরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ইরানে যাওয়া বা দেশটি থেকে বের হওয়া নৌযানের ওপরই কেবল এই অবরোধ থাকবে। 

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী আরব ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত সব ইরানি বন্দরই অবরোধের কেন্দ্রে থাকবে, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।   

সোমবার ওয়াশিংটন সময় সকাল ১০টা থেকে এ অবরোধ কার্যকর হচ্ছে, জানিয়েছে সেন্টকম। 

ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরানকে টোল দেওয়া নৌযানগুলোকে মার্কিন বাহিনী আটক করবে, এমনকি সেগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকলেও।

“অবৈধ টোল দেওয়া কেউই উন্মুক্ত সমুদ্রে নিরাপদ চলাচল করতে পারবে না,” বলেছেন তিনি। 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। ইরান যেন এ পথ থেকে সরে আসে তা নিশ্চিত করতেই ট্রাম্প এবার নিজেই হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দিলেন। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধকে বিশ্বজুড়ে থাকা সব সমুদ্রপথেও বিস্তৃত করলেন।  

যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল-গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশই ইরানলাগোয়া এ সঙ্কীর্ণ জলপথ দিয়ে হত। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়েই এখন জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। 

ট্রাম্পের কৌশল যদি শেষ পর্যন্ত কাজে দেয় তাহলে তিনি শান্তি আলোচনায় ইরানের সবচেয়ে বড় ‘হাতিয়ারকে’ অকার্যকর করে দিতে পারবেন। তেহরানকে ওয়াশিংটনের শর্তে রাজি করাতে অনেকদূর এগিয়ে যাবেন। 

হরমুজে থাকা ইরানি মাইন পরিষ্কার করতে পারলে ট্রাম্প বিশ্ব বাণিজ্যকে যেমন পথে ফেরাতে পারবেন, তেমনি তেলের দামও এখনকার তুলনায় অনেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। 

কিন্তু এ ধরনের নৌ অবরোধ আদতে নতুন যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল এবং অনির্দিষ্টকাল এ পদক্ষেপটি কার্যকর করতে হলে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজও লাগবে, বলছেন বিশ্লেষকরা। 

“ট্রাম্প চান দ্রুত সমাধান। বাস্তবতা হচ্ছে, এই অবরোধ একা বাস্তবায়ক করাটা হবে খুব কঠিন এবং মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রকট,” বলেছেন জো বাইডেনের আমলে পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা, এখন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসিতে কাজ করা ডানা স্ট্রৌল। 

ইরানের প্রতিক্রিয়া

কীভাবে অবরোধ কার্যকর হবে, কতগুলো যুদ্ধজাহাজ থাকবে, কোনো যুদ্ধবিমান থাকবে কিনা, উপসাগরের কোনো দেশ এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করবে কিনা, এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু বলেন মার্কিন সামরিক বাহিনী। 

এ প্রসঙ্গে রয়টার্স মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মন্তব্য চাইলেও তারা সাড়া দেয়নি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত যুদ্ধজাহাজ দিয়ে চাইলে মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধ কার্যকর করতে পারবে, হয়রানি করতে পারবে ইরানি তেল পরিবহনে থাকা অনেক বাণিজ্যিক ট্যাংকারকে। 

কিন্তু যেসব নৌযান মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করবে সেগুলোতে সেনা পাঠানো ও জব্দ করা, কিংবা সেগুলোর ক্ষতিসাধন বা ডুবিয়ে দেওয়া কী সম্ভব? সেসব নৌযানের কোনে কোনোটি যদি বিশ্বের আরেক বড় শক্তি চীনের জন্য তেল পরিবহনের দায়িত্বে থাকে? কিংবা ভারত বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশীদারের নৌযান হয়? 

এদিকে ইরান কি চুপচাপ বসে থাকবে?

মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরে থাকা নৌযান কিংবা মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরের দেশগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। 

“আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যদি আমরা এটা (অবরোধ) শুরু করি, তাহলে ইরান কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবেই,” বলেছেন রাফহেড। 

যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ পার হওয়ায় তেলের দাম এমনিতেই ছয় সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।   

রোববার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তেল ও পেট্রলের দাম এখনকার মতো বেশিই থাকতে পারে। তেমন কিছু হলে ওই মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ইরান যুদ্ধ এমনিতেও দেশটিতে ব্যাপক অজনপ্রিয়, বলছে একাধিক জরিপ।  

গ্যাসের দাম নিয়ে সঙ্কট

তার শর্তে যুদ্ধ থামাতে তেহরান রাজি না হওয়ায় হতাশ ট্রাম্প ইরানে ফের মার্কিন হামলা শুরুরও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো এ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, ধারণা দিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ‍তুলে সেনেটের গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য, ভার্জিনিয়ার সেনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেছেন, পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান স্পিডবোট পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালির সর্বত্র মাইন পাততে পারে কিংবা ট্যাংকারের গায়ে বোমা লাগিয়ে দিতে পারে।

“এটা কীভাবে গ্যাসের দাম কমিয়ে আনবে?” সিবিএসের ‘ফেইস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে প্রশ্ন তোলেন ওয়ার্নার।

সর্বশেষ ৫ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর লাগাতার হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব এবং লুকিয়ে রাখা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে তেহরান ওয়াশিংটনের জন্য আরও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।

রোববার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, “কোনো ইরানি যদি আমাদের বা শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমে ব্যস্ত নৌযানের দিকে গুলি ছোড়ে, তাহলে তাকে উড়িয়ে জাহান্নামে পাঠানো হবে।”

এর প্রত্যুত্তরে দেওয়া বিবৃতিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, কোনো সামরিক নৌযান হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলে তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর কঠোর ও মারাত্মক জবাব দেওয়া হবে। 

আইআরজিসির এ বিবৃতিই বলছে, নৌ অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে। 

স্ট্রৌল বলছেন, এই সঙ্কট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। 

“শেষ পর্যন্ত কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে,” বলেছেন তিনি।