সেই তালেবান যোদ্ধারাও এখন অন্যরকম জীবনে

তালেবান শাসনের এক বছরে আফগানিস্তানে বদলাল অনেক কিছুই।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 August 2022, 05:12 PM
Updated : 9 August 2022, 05:12 PM

আফগানিস্তানের তালেবানের পুনরায় ক্ষমতারোহনের এক বছর পার হল। এই এক বছরে দেশটির নাগরিকদের জীবন বদলে গেছে অনেকটাই। বিচরণের ক্ষেত্র সীমিত হয়েছে নারীদের, শিক্ষার সুযোগ হয়েছে সঙ্কুচিত। দারিদ্র্যও বাড়ছে দেশটিতে। কিন্তু বিপরীতে সংঘাত-সহিংসতাও কমেছে। যে তালেবান যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে লড়ছিলেন, তাদের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন।

২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের সময় আফগানিস্তানে ছিলেন বিবিসির সাংবাদিক সিকান্দার কারমানি; এক বছর পর আবার দেশটি ঘুরে যা দেখেছেন, তা তুলে এনেছেন এক প্রতিবেদনে।

যুদ্ধের ময়দান থেকে টেবিলে

গত গ্রীষ্মে তালেবান বাহিনী যখন কাবুল দখলে এগোচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সেনারা যখন আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছিলো, তখন আইনুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বিবিসির। তালেবান যোদ্ধা হিসেবে উত্তরাঞ্চলীয় বালখ জেলায় লড়ছিলেন তিনি।

শীতল, অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আইনুদ্দিন তখন বলেছিলেন, “সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতি যাতে না হয়, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু এটা যুদ্ধ এবং মানুষ মারা যাবে। আফগানিস্তানে আমরা ইসলামিক ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা মেনে নেব না।”

তার কয়েক মাস পর আবার আইনুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসির। আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানকে আলাদা করা আমু দরিয়া নদীর পাশে ভাজা মাছ খেতে খেতে তিনি বলছিলেন, তালেবান বাহিনীতে তিনি ছিলেন একজন ‘স্নাইপার’। তার হিসাবে, তিনি আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ডজনখানেক সদস্যকে হত্যা করেছেন এবং নিজেও ১০ বার আহত হয়েছেন।

তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনুদ্দিনকে বালখ প্রদেশের ভূমি ও নগর উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তখন তার কাছে বিবিসির প্রশ্ন ছিল, বছরের পর বছর ধরে তিনি যে ‘জিহাদ’ করছিলেন, তা ‘মিস’ করেন কি না? দ্বিধা না করেই তিনি উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হ্যাঁ’।

তার এক বছর পর কাঠের ডেস্কের ওপাশে বসা আইনুদ্দিনকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি যেন এখনও এই পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ইসলামিক আমিরাতের সাদা কালো পতাকার পাশে বসে আইনুদ্দিন অবশ্য স্বীকার করেছেন, তার এই নতুন দায়িত্বটাও গুরুত্বপূর্ণ।

“আমরা আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছি, খোদাকে ধন্যবাদ আমরা তাদের পরাজিত করেছি, এবং এখন আমরা আমাদের কলম দিয়ে আমাদের জনগণকে সেবা করার চেষ্টা করছি।”

আইনুদ্দিন বললেন যুদ্ধ করার সময় তিনি খুশি ছিলেন, তবে তিনি এখনও খুশিই আছেন।

অবশ্য তালেবানের আরও কয়েকজন সদস্য ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন, তারা বরং কিছুটা ক্লান্তি বোধ করছেন তাদের এই নতুন দপ্তরভিত্তিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে।

আইনুদ্দিন যাদের নিয়ে কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগই বিগত সরকারের আমলে প্রথম কাজে যোগ দিয়েছে; যদিও শহরের অন্যত্র কিছু কিছু বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন যে তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে তালেবান।

আইনুদ্দিনের কাছে প্রশ্ন ছিল, তিনি প্রশাসনিক এই পদের জন্য যোগ্য কি না?

তার উত্তর এল- “আমরা সামরিক ও আধুনিক উভয় ধরনের শিক্ষাই অর্জন করেছি। আমরা সামরিক বাহিনী থেকে আসলেও এখন আমরা এই জায়গায় কাজ করছি। আগের সরকারের সঙ্গে আমাদের কাজের তুলনা করে দেখতে পারবেন আপনি এবং জানতে পারবেন কে ভালো ফল বয়ে আনছে।”

অবশ্য তিনি এটাও বললেন যে গেরিলা যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে লড়াই করার চেয়ে সরকার পরিচালনা কঠিন কাজ।

তালেবান আন্দোলনের কাছে এটা একটা সঙ্কট। কারণ এই গোষ্ঠী এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে শাসক গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

ইউটিউবার এখনও ভিডিও নির্মাণে

গত বছর তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে ঢোকার পর অনেক বাসিন্দাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই শহরে তালেবান সদস্যরা বছরের পর বছর আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়েছে। তারপরেও তরুণী রোয়েনা, যিনি ইউটিউবে ভিডিও নির্মাণ করেন, ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

গত অগাস্টে রোয়েনা বিবিসিকে বলেছিলেন, তিনি নিশ্চিত নন যে পুরুষের পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন কি না?

এক বছর পরেও অস্বস্তির এই বাতাবরণ কাটেনি। শুধু রোয়েনার জন্যই নয়, আফগানিস্তানজুড়েই একই পরিস্থিতি।

মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার বিষয়ে তালেবান নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, আফগানদের বড় একটি অংশের মধ্যে এবং এমনকি তালেবানের বিভিন্ন পর্যায়েও হতাশা রয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, ১৯৯০ এর দশকে প্রথম তালেবান সরকারের পথে না হেঁটে বর্তমান তালেবান সরকার অবশ্য ছোট মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা করার ব্যবস্থা করে বর্তমান নারী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা শেষ করার সুযোগ দিয়েছে।

তবে তালেবান নেতৃত্বের প্রভাবশালী ও কট্টরপন্থিরা কিশোর বয়সী মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর ঘোর বিরোধী এখনও। ফলে মনে হচ্ছে, গত ২০ বছরে সেদেশে নারী অধিকারের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে।

একইভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া যেসব সরকারি চাকরিতে নারীরা নিয়োজিত ছিলেন তাদের অফিসে ফিরতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপরেও ব্যক্তিগত ব্যবসায় নিয়োজিত হাতেগোনা নারীরা তাদের কাজ করে যাচ্ছেন।

Also Read: তালেবানের প্রত্যাবর্তনের এক বছর: স্বাধীনতা ফিরে পেতে লড়ছেন নারীরা

রোয়েনা এখনও ভিডিও নির্মাণ করে চলেছেন, নিজের মুখ ঢেকে রাখছেন না, তবে হিজাবের বাঁধন এখন আগের চেয়ে শক্ত করতে হয়েছে। এখন কাবুলে চলাফেরার সময় তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে চলাফেরা করেন, একটি কালো আবায়া (বোরখার মতো পোশাক) ও মুখে মাস্ক থাকে তার।

তালেবান গোষ্ঠী নির্দেশ জারি করেছে যে নারীদের প্রকাশ্যে চলাফেরা করার সময় মুখ ঢেকে চলতে হবে। তবে এবার এই নির্দেশ বাস্তবায়নে ততটা কঠোর নয় তারা। বেশিরভাগ বড় শহরেই নারীরা শুধু মাথায় ঘোমটা দিয়ে চলাফেরা করছে, আর এই দৃশ্য অনেকটাই স্বাভাবিক।

তালেবানের অধীনে এখন জীবনযাত্রা কেমন- তা ব্যাখ্যা করার সময় রোয়েনা শব্দ বাছাই করলেন সতর্কতার সঙ্গে।

“মেয়েরা ও নারীরা অবশ্যই হিজাব পরবে, কিন্তু ইসলামে তাদের যা যা অধিকার রয়েছে তা নিশ্চিত করা উচিৎ। তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিৎ না, তাদের কাজ করতে ও পড়তে দেওয়া উচিৎ।”

লড়াইয়ের ময়দান গ্রামটি এখন নিরাপদ

সংবাদ মাধ্যমে বেশিরভাগ সময় আফগানিস্তানের বড় শহরগুলোতে বোমা বিস্ফোরণের খবর ফলাও হলেও তীব্র লড়াইয়ের বড় অংশই সংঘটিত হয়েছিল দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গ্রামের দিকে।

তালেবান এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট আফগান বাহিনীর যুদ্ধের মধ্যখানে আটকা পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। অনেকেই দুই পক্ষের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারে না। কারণ তাদের সার্বিক চাওয়া সামান্যই, একটি শান্তিপূর্ণ বাসস্থান।

তালেবান ক্ষমতা দখলের পরপরই কাবুলের দক্ষিণ-পূর্বে লোগার প্রদেশের পাদখোয়াব গ্রামে বিবিসির সংবাদকর্মীরা গেলে সেখানকার বাসিন্দারা যুদ্ধের চিহ্ন দেখাতে উদগ্রীব ছিলেন; বলছিলেন, কীভাবে যুদ্ধ তাদের জীবনকে ছাপিয়ে গেছে।

টাইল প্রস্তুতকারক সামিউল্লাহ বলেছিলেন, “পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিলো। আমরা কিছুই করতে পারতাম না, এমনকি দোকান বা বাজারেও যেতে পারতাম না। এখন খোদাকে ধন্যবাদ, আমরা সবখানেই যেতে পারছি।”

শহরাঞ্চলের তুলনায় পাদখোয়াবের মতো গ্রামগুলো তালেবানের মূল্যবোধকে নিজেদের কাছাকাছি মনে করে। সেখানে নারীরা আগেও মুখ আবৃত করেই রাস্তায় বের হত এবং খুব কমই স্থানীয় বাজারে যাতায়াত করত।

গত সপ্তাহে সিকান্দার যখন আবার সেখানে যান, তিনি দেখতে পান স্থানীয় বাজারের কেন্দ্রস্থলের ভবনগুলোতে কিছু বুলেটের আঘাতের চিহ্ন ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা এখনও কৃতজ্ঞ যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

স্থানীয় দর্জি গুল মোহাম্মদ বললেন, “আগে অনেক মানুষ, বিশেষ করে কৃষকরা, আহত হতেন এবং তাদের খুন করা হত, অনেক দোকানিকে গুলি করা হয়েছে।”

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে পড়েছে। যেহেতু বিদেশি সহায়তা আসা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অর্থ ছাড় আটকে রেখেছে। দেশটির সরকারি খরচের ৭৫ শতাংশই এই বিদেশি সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আটকে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে তালেবান সরকার। পশ্চিমা কূটনীতিকরা নিয়মিতভাবেই বলে আসছেন, নারীর প্রতি তালেবানের দমনমূলক নীতির অর্থ হচ্ছে আফগান জনগণের জন্য যে কোনো সহায়তা অবশ্যই সেখানকার তালেবান সরকারকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে।

যার কারণে, শহর এলাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এই সঙ্কটের কারণে সরকারি কর্মীরা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না এবং তাদের বেতনও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এতদিন ‘দিন আনি, দিন খাই’ অবস্থায় ছিলেন, তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ। পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার যোগাড় করা এখন তাদের কাছে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

পাদখোয়াবেও নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং কাজের অভাব, এদুটো স্থানীয়দের নিয়মিত অভিযোগের বিষয়। সামিউল্লাহ বলেন, “অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কোনো কাজ নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আত্মীয়ের মুখ চেয়ে আছে, যারা প্রবাসে আছেন।”

গুল মোহাম্মদ যোগ করলেন, “মাংস ও ফলের কথা ছেড়েই দিন, মানুষ এখন আটাও কিনতে পারছে না।”

তারপরেও সামিউল্লাহ বলছেন, “এটা সত্যি যে আগে এখনকার তুলনায় অনেক টাকা-পয়সা ছিল, কিন্তু আমদের অনেক নির্যাতন সইতে হয়েছে।”

আফগান সরকারি বাহিনীর উপস্থিতি এবং তাদের কাছে গ্রামবাসীর নিগ্রহের প্রসঙ্গ টেনে এই মন্তব্য করেন তিনি।

তালেবানের বিরুদ্ধে খোলামেলা সমালোচনা দিনদিন বিরল হয়ে উঠছে সেদেশে, তবে অনেকের কাছেই, তালেবানের বিজয় তাদের জীবনযাত্রাকে উন্নত করতে সাহায্য করেছে।

যদিও অন্যপক্ষে অনেকেই মনে করেন যে দেশ গড়ার চেষ্টা তারা করছিলেন, তা তাদের চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের সামনে যা আসতে যাচ্ছে, তা যতেষ্টই উদ্বেগের।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক