২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

অবিশ্বাস্য আয়, বড় খরচ, ঝুঁকি নিয়ে পুঁজিবাজারমুখী অ্যানথ্রপিক

ক্লড মডেলকে প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাউড অবকাঠামো সরবরাহের পাশাপাশি অ্যানথ্রপিকে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে মার্কিন দুই প্রযুক্তি জায়ান্ট।

অবিশ্বাস্য আয়, বড় খরচ, ঝুঁকি নিয়ে পুঁজিবাজারমুখী অ্যানথ্রপিক

কোম্পানিটির বিবরণীতে গেল এক বছরে অ্যানথ্রপিকের এই দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 10:22 AM

Updated : 27 Oct 2026, 10:22 AM

তীব্র লোকসান, বিপুল খরচ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিরাপত্তা ঝুঁকির খতিয়ান তুলে ধরে যুক্তরাষ্টের শেয়ারবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্তির আবেদন করেছে মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক।

সোমবার যুক্তরাষ্টের শেয়ারবাজারে ছাড়া দেড় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যায়নের এই আইপিও নথিতে একদিকে কোম্পানিটির তীব্র লোকসানের চিত্র ও অন্যদিকে রাজস্ব আয়ে চোখধাঁধানো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

কোম্পানিটির বিবরণীতে গেল এক বছরে অ্যানথ্রপিকের এই দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে।

বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বেপরোয়া খরচের ওপর ভর করেই এআই শেয়ার বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে, যা বাজারদর অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেখানো ও বাড়তে থাকা ঋণের চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পাশাপাশি, এআই প্রযুক্তির ক্রমাগত ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছে অ্যানথ্রপিক।

এআইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কায় কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই আগে থেকেই উন্নত এআই মডেলগুলোর উন্নয়ন কিছুটা ধীরগতির করার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অ্যানথ্রপিকের নিট লোকসান ব্যাপকভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৭০ কোটি ডলারে। কোম্পানিটির শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য বন্ডের বাজারদর বা ‘ফেয়ার ভ্যালু’ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এ বড় অংকের লোকসান দেখা গেছে।

এ সময় কোম্পানিটির মোট আয় বা রাজস্ব ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার।

৩০ জুন শেষ হওয়া প্রান্তিকে বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় অ্যানথ্রপিকের রাজস্ব আয় ১৩৬৮ শতাংশের মতো গতিতে বেড়েছে।

তবে আইপিও নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আয়ের এই প্রবৃদ্ধির হার কমতে ও তা মাঝেমধ্যেই ওঠানামা করতে পারে।

এ মাসের শেষদিকে হতে যাওয়া এই আইপিওর মাধ্যমে অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোকে ওয়াল স্ট্রিট কীভাবে মূল্যায়ন করবে তার একটি ‘বেঞ্চমার্ক’ হিসেবে অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

শেয়ারবাজারের অস্থিরতার কারণে অনেক কোম্পানিই আইপিও পিছিয়ে দেওয়ায় বাজারে যেখানে বেশ নিরুত্তাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই আইপিওতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল অ্যানথ্রপিক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে কোম্পানিটি বড় ধরনের মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে, যা তাদের ব্যায়বহুল এআই প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে।

অন্যদিকে, ডেটা সেন্টার, চিপ ও কম্পিউটিং সক্ষমতার পেছনে খরচ করা ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আদৌ দ্রুত মুনাফা এনে দিতে পারবে কি না তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয় বাড়ছে।

ঋণনির্ভর এই বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে এআই ও প্রযুক্তি শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ওপর চড়া সুদের হার ও বন্ডের বাড়তি মুনাফা বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলেছে।

এরপরও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা মেটেনি। প্রথা ভেঙে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মূলধন তোলার লক্ষ্য নিয়েছে মেটা।

অন্যদিকে, এআই চিপ ও সার্ভার হার্ডওয়্যার লিজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে অ্যাপোলোর সঙ্গে চার হাজার কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে স্পেসএক্স।

Image

এআই প্রযুক্তির ক্রমাগত ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। ছবি: রয়টার্স

মূল্যায়ন প্রত্যাশা

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি এক বিনিয়োগকারী অনুষ্ঠানে অ্যানথ্রপিক কিছু আর্থিক বিবরণ তুলে ধরার পর কোম্পানিটির মূল্যায়ন কিছু কমিয়ে ধরছেন বর্তমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা।

এক সপ্তাহ আগে কোম্পানিটির মূল্যায়ন প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হলেও বর্তমানে তা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

আইপিও-কেন্দ্রিক গবেষণা ও ইটিএফ সেবাদাতা কোম্পানি ‘রেনেসাঁ ক্যাপিটাল’-এর জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যাট কেনেডি বলেছেন, “অ্যানথ্রপিকের পর্যাপ্ত মূলধন থাকলেও আইপিও কোম্পানিটিকে মূল্যবান আর্থিক সুবিধা দেবে।

“কোনো কোম্পানিই প্রকাশ্যে শেয়ার ছাড়ার দোরগোড়ায় বেশি সময় কাটাতে চায় না। কারণ এটা মূল লক্ষ্য থেকে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

“হয়ত আগামী বছর তারা আরও বেশি মূল্যায়ন পেতে পারত। তবে তারা এখনই ঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্তটি দ্রুত বাস্তবায়ন করার পথ বেছে নিয়েছে।”

এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকির ভারসাম্য

অ্যানথ্রপিক বলেছে, ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া ১২ মাসে ‘ফরচুন ৫০০’ তালিকার অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানি ও ‘গ্লোবাল ২০০০’ তালিকার ৩০ শতাংশের বেশি কোম্পানি তাদের গ্রাহক ছিল, যাদের প্রত্যেকে কোম্পানিটিকে অন্তত ১ লাখ ডলার করে রাজস্ব এনে দিয়েছে।

এমন এক সময়ে আইপিওর উদ্যোগ এল যখন অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব গবেষণাতেই উন্নত এআই সিস্টেম নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় এসব এআই মডেলের মধ্যে কোড নষ্ট, জালিয়াতিতে সহায়তা করা এবং তথ্য বিকৃতির মতো আচরণ দেখা গেছে।

বাণিজ্যিকভাবে শেয়ারবাজারে ছাড়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার মুখে শক্তিশালী বিভিন্ন এআই মডেলকে কোম্পানিগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবে এসব তথ্য সেই দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়েছে।

বিবরণীতে নিজেদের এআই মডেলের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে অ্যানথ্রপিক। এসব মডেল ‘আত্মরক্ষার মতো আচরণ’ দেখতে পারে, যার মধ্যে ‘ব্ল্যাকমেইল বা ব্ল্যাকমেইলের মতো আচরণ’ রয়েছে।

“আমাদের নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়নকে দ্রুততর করতে এআই ব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যবহার এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে আমাদের মডেলগুলোর সক্ষমতা সুরক্ষামূলক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতার চেয়েও বেশি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে।”

কোম্পানিটি আরও বলেছে, তারা নিজেদের কম্পিউটিং ও অবকাঠামোগত কাঠামোর জন্য অ্যামাজন, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো সীমিত কয়েকটি ক্লাউড সেবাদাতা কোম্পানি ও ব্রডকমের মতো সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করে।

এই ধরনের সম্পর্ক এক ধরনের ‘নির্ভরশীলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে। আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অ্যানথ্রপিক ন্যাসডাকে ‘এএনটি’ প্রতীকে লেনদেন করবে।

তবে কতগুলো শেয়ার বিক্রি করা হবে বা প্রস্তাবিত দামের সীমা কেমন হবে সেসব তথ্য ও শর্তাবলি এই নথিতে প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।

Image

উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরির দৌড়ে শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে অ্যানথ্রপিক। ছবি: রয়টার্স

রাজস্ব আয়ে চোখধাঁধানো প্রবৃদ্ধি

গবেষকদের একটি দল দিয়ে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন গেল মে মাসের ফান্ডিং রাউন্ডে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। সিলিকন ভ্যালি ও ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে সেখানে।

অ্যানথ্রপিকের শুরুর দিকের কৌশলগত পার্টনারদের মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন ও গুগল।

ক্লড মডেলকে প্রশিক্ষণ ও পরিচালনারার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাউড অবকাঠামো সরবরাহের পাশাপাশি এই দুই প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যানথ্রপিকে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

আবেদন নথিতে কোম্পানিটি বলেছে, “আমরা বিশ্বাস করি এআইয়ের এ বিপুল প্রাচুর্য শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইন্টারনেটের প্রভাবের চেয়েও বড় পরিসরে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে দ্রুত রূপান্তরিত করবে।”

কোম্পানিটির আশা, সামনের দিনগুলোতে তাদের কম্পিউটিং ও অবকাঠামোগত ব্যয় সার্বিকভাবে বাড়বে ও অদূর ভবিষ্যতেও এটাই তাদের সবচেয়ে বড় পরিচালন ব্যয় হিসেবে বহাল থাকবে।

Image

জুনে সাড়ে সাত হাজার কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছে স্পেসএক্স, যা কোম্পানিটির মূল্যায়ন ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায় ও আইপিওর ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। ছবি: রয়টার্স

উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরির দৌড়ে শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে অ্যানথ্রপিক।

চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই গেল জুনে গোপনে আইপিওর জন্য আবেদন করেছে ও ২০২৭ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে।

ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স-এর রেকর্ড আইপিওর পরপরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যানথ্রপিক।

জুনে সাড়ে সাত হাজার কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছে স্পেসএক্স, যা কোম্পানিটির মূল্যায়ন ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায় ও আইপিওর ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে।

অ্যানথ্রপিকের এ আইপিওর জন্য গোল্ডম্যান স্যাকস ও মরগ্যান স্ট্যানলিকে প্রধান ব্যাংকের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে, যাদের সঙ্গে আন্ডাররাইটার হিসেবে রয়েছে আরও ২০টি কোম্পানি।

শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুর দিকের স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণের জন্য ‘স্ট্যাবিলাইজেশন এজেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে মরগ্যান স্ট্যানলি।

স্পেসএক্সের আইপিওতেও নেতৃত্ব দেওয়া গোল্ডম্যান ও মরগ্যান স্ট্যানলির জন্য এই নতুন দায়িত্ব আরেকটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।