Published : 15 Jul 2026, 10:12 AM
ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এনে মামলা করেছে অ্যাপল। কোম্পানিটির দাবি, এটি কেবল কয়েকজন সাবেক কর্মীর বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড নয়। অভিযোগের যে বর্ণনা অ্যাপল দিয়েছে, তাতে গোটা বিষয়টি ছিল অ্যাপলে ওপেনএআইয়ের চালানো সমন্বিত সাইবার অপারেশন।
টেকক্রাঞ্চে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় জেলা আদালতে দায়ের করা ৪১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে অ্যাপল বলেছে, ওপেনএআই তাদের গোপন প্রকৌশল তথ্য, হার্ডওয়্যার নকশা এবং শিল্প নকশাসংক্রান্ত প্রযুক্তি সংগ্রহের জন্য বর্তমান ও সাবেক অ্যাপল কর্মীদের ব্যবহার করেছে। মামলায় ওপেনএআইয়ের পাশাপাশি কোম্পানিটির দুই কর্মী এবং ওপেনএআইয়ের অধিগ্রহণ করা হার্ডওয়্যার কোম্পানি আইওকেও আসামি করা হয়েছে।
দেখে নেওয়া যাক অ্যাপলের তোলা বিস্ফোরক অভিযোগগুলো কী কী-
গোপন নেটওয়ার্কে প্রবেশের অভিযোগ
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অ্যাপলের সাবেক সিস্টেমস ইলেকট্রিক্যাল প্রকৌশলী চ্যাং লিউকে ঘিরে।
অ্যাপলের দাবি, ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার পরও লিউ একটি আগে অজানা ত্রুটি বা ‘জিরো-ডে’ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেন। অ্যাপল বলছে, এই ত্রুটির বিষয়ে তারা আগে জানত না। পরে সেটি ঠিক করা হয় এবং নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়টি জানার পর লিউয়ের প্রবেশাধিকার বাতিল করা হয়।
অ্যাপলের দাবি, সার্ভার লগ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ত্রুটিটি হয়তো আরও কয়েকজন ব্যবহার করতে পারতেন। তবে লিউ ছাড়া অন্য কেউ এটি কাজে লাগিয়েছেন, এমন প্রমাণ মেলেনি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরি ছাড়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে লিউ অ্যাপলের শেয়ার্ড নেটওয়ার্ক থেকে কয়েক ডজন গোপন হার্ডওয়্যার সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছেন। এসব নথির মধ্যে ছিল অপ্রকাশিত পণ্যের তথ্য, কারিগরি প্রেজেন্টেশন, প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন এবং বিভিন্ন গোপন প্রকল্পের নথি।
অ্যাপলের আরও দাবি, লিউ তার কাছে থাকা অ্যাপলের ইস্যু করা ল্যাপটপ ফেরত দেননি। একইসঙ্গে নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়, এমন একটি প্রোগ্রাম তিনি মুছে ফেলেননি।
কী ধরনের প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তা অবশ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই।
প্রমাণ রয়েছে মেসেজ চালাচালিতে
অভিযোগপত্রে কয়েকটি ব্যক্তিগত বার্তাও যুক্ত করেছে অ্যাপল।
কোম্পানিটির দাবি, নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারার বিষয়টি জানতে পেরে লিউ অ্যাপল কর্মী ইউ-টিং পেংকে লিখেছিলেন, “হা হা, আমি দেখছি নেটওয়ার্ক স্টোরেজে ঢুকতে পারি। সো ফানি!”
অভিযোগ অনুযায়ী, জবাবে পেং লিখেছিলেন, “আমি রেডি।”
আরেকটি বার্তায়, অ্যাপল ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লিউ লিখেছিলেন, “আমার কাছে এখনও আরেকটি কম্পিউটার আছে।”
অ্যাপলের দাবি, পরে তারা এসব বার্তা অ্যাপলে পেংয়ের অফিসে ব্যবহার করা কম্পিউটারে খুঁজে পেয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ, পেং সে সময় অ্যাপলে কর্মরত থাকলেও লিউ তার কম্পিউটার ব্যবহার করছিলেন। পরে পেংও ওপেনএআইয়ে যোগ দেন। তবে তিনি মামলার আসামি নন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
ওপেনএআইয়ের নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েও একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে অ্যাপল।
অ্যাপলের দাবি, আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের পণ্য নকশা বিভাগের সাবেক প্রধান এবং বর্তমানে ওপেনএআইয়ের প্রধান হার্ডওয়্যার কর্মকর্তা ট্যাং ইউ ট্যানের নির্দেশ দিতেন, অ্যাপলে কর্মরত চাকরিপ্রার্থীরা যেন সাক্ষাৎকারে অ্যাপলের প্রকৃত যন্ত্রাংশ, কম্পিউটারভিত্তিক নকশার ফাইল এবং প্রোটোটাইপ নিয়ে যান।
অ্যাপলের অভিযোগ অনুযায়ী, একজন প্রার্থী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, “অফিস থেকে এগুলো নেওয়া যায়, তা তো আমি জানতামই না।”
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চাকরি ছাড়তে যাওয়া কর্মীদের অ্যাপলের নিরাপত্তা প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলার কৌশল শেখানো হতো। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ‘যা যা জানা প্রয়োজন’ ধরনের নথিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে কোম্পানিটি।
অ্যাপলের আরও অভিযোগ, ওপেনএআই কর্মীদের চাকরি ছাড়ার সময় অ্যাপল কোনো নথিতে স্বাক্ষর করতে বললে আগে সেটি ওপেনএআইকে জানাতে এবং কোনো নথিতে স্বাক্ষর না করতে কর্মীদের পরামর্শ দেওয়া হতো।
আইও ও সরবরাহকারীদের নিয়েও অভিযোগ
মামলায় ওপেনএআইয়ের অধিগ্রহণ করা কোম্পানি আইওর বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছে অ্যাপল।
আইফোন নির্মাতার দাবি, সাবেক অ্যাপল কর্মীদের প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি অ্যাপলের অনুমতি বিষয়ে মিথ্যা কথা বলে এক পার্টনার কোম্পানিকে ভুল বুঝিয়ে গোপন ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যাটারির নকশাসংক্রান্ত গোপন তথ্য ব্যবহার করে সরবরাহকারীদের এমন প্রশ্ন করা হয়েছে, যা অ্যাপলের ভাষ্য অনুযায়ী, কেবল কোম্পানির ভেতরের ব্যক্তিদেরই জানার কথা।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, দাবি অ্যাপলের
অভিযোগপত্রে অ্যাপল বলেছে, ওপেনএআইয়ে বর্তমানে চার শতাধিক সাবেক অ্যাপল কর্মী কাজ করছেন। কোম্পানিটির ভাষ্য, তাদের অনেকের কাছেই অ্যাপলের গোপন তথ্য থাকার কথা। তবে ওপেনএআই শুধু সেই অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে আরও গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আদালতের তদন্তপর্ব শুরু হলে বর্তমানে যে ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বড় পরিসরে গোপন তথ্য আত্মসাতের অভিযোগও সামনে আসতে পারে।
অ্যাপল আরও অভিযোগ করেছে, এই ধরনের আচরণে ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বই উৎসাহ দিয়েছে। অভিযোগপত্রে ওপেনএআইয়ের নতুন হার্ডওয়্যার উদ্যোগকে “গোড়া থেকেই পচে যাওয়া” বলে বর্ণনা করে অ্যাপল দাবি করেছে, সেটি অবৈধভাবে সংগ্রহ করা বাণিজ্যিক গোপন তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আদালতে যাওয়ার আগে
অ্যাপলের দাবি, আদালতে যাওয়ার আগে তারা বিষয়টি মীমাংসারও চেষ্টা করেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বেগের বিষয়গুলো জানিয়ে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোম্পানিটি কোনো জবাব দেয়নি। এরপরই ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় জেলা আদালতে মামলা করেছে অ্যাপল এবং জুরি বিচারের আবেদন জানিয়েছে।
ওপেনএআই অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কোম্পানিটির বক্তব্য, “অন্য কোম্পানির বাণিজ্যিক গোপন তথ্যের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা এমন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি তৈরির দিকেই মনোযোগী, যা বিশ্বের মানুষের উপকারে আসে।”
মামলাটি আদালতে গড়ালে চলতি বছরই এর শুনানি শুরু হতে পারে।