১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে ইউনিট্রি: একদিনেই শেয়ারের দাম ছয় গুণ

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান প্রযুক্তি লড়াইয়ের প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া চীনা রোবটিক্স খাতের জন্য এ সাফল্যকে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে ইউনিট্রি: একদিনেই শেয়ারের দাম ছয় গুণ
রোবটিক্স খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি যেখানে লোকসানে ধুঁকছে, সেখানে ইউনিট্রি ব্যতিক্রম। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Aug 2026, 03:45 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:52 PM

সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের প্রথম দিনেই শেয়ারের দামে নতুন ইতিহাস গড়ল চীনের হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি ইউনিট্রি। লেনদেন শুরুর প্রথম দিনেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ছয় গুণ হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান প্রযুক্তি লড়াইয়ের প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া চীনা রোবটিক্স খাতের জন্য এ সাফল্যকে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দৌড়ানো, নাচ ও মার্শাল আর্ট দেখাতে পারে এমন রোবট তৈরি করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে হুন্দাই মোটর গ্রুপের মালিকানাধীন ‘বস্টন ডাইনামিক্স’ ও ইলন মাস্কের টেসলা’র মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের সঙ্গে সরাসরি টেক্কা দেওয়া ইউনিট্রি।

চার পাওয়ালা ও মানুষের মতো দেখতে রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানিটিকে চীনে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দেশটির প্রযুক্তি জায়ান্টদের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত নানা প্রভাবশালী কোম্পানিও এতে মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

রোবটিক্স খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি যেখানে লোকসানে ধুঁকছে, সেখানে ইউনিট্রি ব্যতিক্রম। তাদের তৈরি রোবটের বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনও বেশ সীমিত হলেও কোম্পানিটি লাভজনক অবস্থায় রয়েছে।

ইউনিট্রি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম চীনা হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি না হলেও তাদের এ অভাবনীয় আত্মপ্রকাশ পুঁজিবাজারে আসার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা ও মানদণ্ড তৈরি করবে।

সাংহাইয়ের আইভি ক্যাপিটালের ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ও পার্টনার ইয়ান কাই বলেছেন, “তারা শীর্ষস্তরের কোম্পানি ও তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাজারে দর এত বেশি।

“ইউনিট্রির শেয়ারের দাম ধরাবাঁধা কোনো আর্থিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়নি, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানামুখী বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত হয়েছে।”

প্রথম আসার বাড়তি সুবিধা

প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ‘স্টার মার্কেট’-এ প্রথম দিনে সকালের অধিবেশন শেষে শেয়ারটির দাম দাঁড়ায় ৮৮৩.৮৭ ইউয়ানে। এর প্রাথমিক আইপিও নির্ধারিত দাম ছিল ১৫০.৮ ইউয়ান।

সেই তুলনায় দাম এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির সার্বিক বাজারদর এখন প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। দিনের শুরুতে শেয়ারপ্রতি দর সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ ইউয়ানে পৌঁছেছিল। তবে পরবর্তীতে তা কিছুটা কমে স্থির হয়।

এ বছর চীনে নতুন কোনো কোম্পানির শেয়ার তালিকায় যোগ হওয়ার প্রথম দিনে গড়ে যে ২৭৯ শতাংশ দরবৃদ্ধির রেকর্ড ছিল, ইউনিট্রি তাকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।

যেদিন প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন শেয়ারের দরপতনের কারণে সার্বিক চীনা পুঁজিবাজারের মূল সূচক দুই শতাংশ পড়েছে ঠিক সেই দিনই ইউনিট্রির শেয়ারের এ উল্লম্ফন ঘটল।

রাজধানী বেইজিংয়ে ‘ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স’ শুরুর ঠিক পরপরই বাজারে ইউনিট্রির এ বড় আত্মপ্রকাশ ঘটল। হাজার হাজার চীনা কোম্পানি এই সম্মেলনে তাদের নতুন উদ্ভাবন ও রোবটিক্স প্রযুক্তির অগ্রগতি দেখিয়েছে।

চীনের জনসংখ্যা কমে যাওয়ার হারের কারণে যে শ্রমসংকট তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তি দিয়ে তা সামাল দিতে দেশটির সরকার এসব রোবটিক্স উদ্যোগের ওপর বড় বাজি ধরেছে।

‘স্প্রিং মাউন্টেন পু জিয়াং ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর চেয়ারম্যান উইলিয়াম সিন বলেছেন, ইউনিট্রির এ ঝোড়ো আইপিও সাফল্য বাজারে তাদের শুরুতেই এগিয়ে থাকার সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করবে। ফলে এমন শিল্প যেখানে বেশিরভাগ কোম্পানিই লোকসানের মুখ দেখছে সেখানে তারা শক্ত পায়ে টিকে থাকতে পারবে।

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেছেন, “প্রতিযোগিতার এ প্রারম্ভিক পর্বে যে কোম্পানি আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে তারাই প্রয়োজনীয় মূলধন ও সম্পদ নিজেদের করে নেবে। বাজারে দীর্ঘদিন টিকে থাকার সক্ষমতাও কেবল তাদেরই থাকবে।”

মার্কিন বাজার বন্ধের মুখে চীনা বিভিন্ন রোবট নির্মাতা

চীনে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে হুড়োহুড়ি করলেও অনেকেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এখন পর্যন্ত ইউনিট্রির বেশিরভাগ বিক্রিই ছিল সাময়িক বা এককালীন। বাস্তবে তাদের তৈরি খুব কম রোবটই বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা কোম্পানি ও ইউনিভার্সিটিতে এদের পণ্য বেশি বিক্রি হয়।

জুলাইয়ে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ বা এফসিসি বিদেশ থেকে তৈরি হিউম্যানয়েড ও চার পাওয়ালা রোবটের ভবিষ্যৎ সব মডেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যার মধ্যে ইউনিট্রির নামও রয়েছে।

এ সিদ্ধান্ত ইউনিট্রির জন্য বড় এক আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ করে দিল। নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিল্পগুলোতে মার্কিন উদ্ভাবন ব্যবহার করে চীন কীভাবে দ্রুত নিজেদের প্রসার ঘটিয়েছে ইউনিট্রি তারই স্পষ্ট উদাহরণ।

পেন্টাগনের সাবেক এক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের তিন শীর্ষ গবেষক রয়টার্সকে বলেছেন, ইউনিট্রি তাদের সবচেয়ে সফল ‘রোবট ডগ’-এর বিভিন্ন নকশা মূল মার্কিন সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে হওয়া উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর ওই গবেষণাটি রোবটিক্স খাতের সার্বিক অগ্রগতির জন্য প্রকাশ হয়েছিল, যা সাধারণ নিয়মের মধ্যেই পড়ে। ফলে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউনিট্রি অবৈধ কিছু করেনি।

এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ইউনিট্রি।

এর আগে, জুনে ইউনিট্রিকে চীনা সামরিক বাহিনীর সহায়ক কোম্পানিগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের ‘চীনা প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম জোগানদাতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।

এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মানে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না হলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী ভবিষ্যতে ইউনিট্রির কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না। ইউনিট্রির দাবি, তাদের তৈরি বিভিন্ন রোবট কেবল বেসামরিক কাজেই ব্যবহৃত হয়।