সরকারি আবদারে নিরাপত্তা কমাবো না: হোয়াটসঅ্যাপ

বিশ্বব্যাপী অসংখ্য দেশে কয়েকশ কোটি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছে, তাই সব দেশে একই গোপনতা মান বজায় রাখার যুক্তি দিয়েছেন অ্যাপটির প্রধান।

প্রযুক্তি ডেস্ক
Published : 31 July 2022, 11:21 AM
Updated : 31 July 2022, 11:21 AM

কোনো সরকারি আবদারে নিজস্ব মেসেজিং সেবার নিরাপত্তা না কমানোর নিশ্চয়তা দিয়েছেন হোয়াটসঅ্যাপ প্রধান।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে উইল ক্যাথকার্ট বলেন, কোনো সরকার যদি প্ল্যাটফর্মের এনক্রিপশন দুর্বল করতে বলে, তবে সেই অনুরোধ গ্রহণ করা ‘বোকামি’ হবে।

শিশু নিপীড়কদের চিহ্নিত করতে ব্যক্তিগত মেসেজ স্ক্যান করার সম্ভাব্যতা বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। মেসেজিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ‘ফ্রন্ট লাইন’ আখ্যা দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের কঠোর সমালোচনাও করেছে দেশটির শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা ‘ন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু চিলড্রেন (এনএসপিসিসি)’।

যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইনে শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট মোকাবেলায় তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন (ই২ইই)’ সেবা। অনলাইনে মেসেজ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সেবা দেয় এই প্রযুক্তি। কেবল প্রাপকের হাতেই থাকে মেসেজ ‘ডিক্রিপ্ট’ করার চাবিকাঠি। কেবল প্রেরক ও প্রাপকই মেসেজগুলো পড়তে পারেন, কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলেও তাতে প্রবেশাধিকার পায় না।

হোয়াটসঅ্যাপস ও সিগনালের মতো অ্যাপগুলোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিচার হচ্ছে এই প্রযুক্তি। ক্ষেত্রবিশেষে ফেইসবুকের মেসেঞ্জার এবং টেলিগ্রামেও মেলে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সেবা।

বিবিসি জানিয়েছে, বর্তমানে ই২ইই প্রযুক্তিতে ব্যবহারকারীর গোপনতা লঙ্ঘন না করেই বেআইনি ছবি চিহ্নিত করার প্রযুক্তি নির্মাণে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।

তবে তা আদৌ সম্ভব কি না, সে প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান বলে জানিয়েছে বিবিসি। এক্ষেত্রে মূল সেবাদাতার জায়গা থেকেই মেসেজ স্ক্যানিং করাই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছেন অনেকে। কিন্তু এতে ই২ইই প্রযুক্তির মৌলিক ধারণাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

‘ক্লায়েন্ট-সাইড স্ক্যানিং’ অযৌক্তিক

“ক্লায়েন্টের জায়গা থেকে স্ক্যানিং বাস্তব জগতে কাজ করবে না,” বিবিসিকে বলেছেন ক্যাথকার্ট।

বিশ্বব্যাপী অসংখ্য দেশে কয়েকশ কোটি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছে, তাই সব দেশে একই গোপনতা মান বজায় রাখার যুক্তি দিয়েছেন অ্যাপটির প্রধান।

“আমাদের যদি নিরাপত্তা কমাতে হয়, শুধু একটি দেশের অনুরোধ রাখতে, তাতে… সেটা গ্রহণ করা খুবই বোকামি হবে। এতে ২ শতাংশে চাহিদার কারণে ৯৮ শতাংশের কাছে আমাদের পণ্য আকর্ষণ হারাবে” বিবিসিকে বলেছেন উইথ ক্যাথকার্ট।

অন্যদিকে ইউরোপিয়ান কমিশন বলছে, নিজস্ব শিশু নিপীড়নের ছবি চিহ্নিত করতে এবং মুছে দিতে তৎপর হতে হবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই।

এ প্রসঙ্গে ক্যাথকার্টের মত, “যা প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেটা হলো আমরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সবার মেসেজ পড়বো। আমার মনে হয় না মানুষ সেটা পছন্দ করবে।”

বিবিসি জানিয়েছে, অ্যাপলের গত বছরের পদক্ষেপই প্রতিফলিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাম্প্রতিক চেষ্টায়। গেল বছরে ছবি আইক্লাউডে আপলোড করার আগেই স্ক্যান করার প্রযুক্তি আনার চেষ্টা করেছিল অ্যাপল। কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনতা নিয়ে সরব সংস্থাগুলোর প্রতিবাদের মুখে সেই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন এই প্রযুক্তি জায়ান্ট।

এ প্রসঙ্গে অধিকারকর্মীদের সংগঠন ‘ইউরোপিয়ান ডিজিটাল রাইটস’-এর নীতিমালা পরামর্শক এলা জাকুবোউস্কির মত, “ক্লায়েন্টের পক্ষ থেকে স্ক্যানিং প্রায় সবার ফোনে স্পাইওয়্যার রেখে দেওয়ার সমান।”

“এর মাধ্যমে হ্যাকারদের জন্য আমাদের মেসেজ দেখার সুযোগ তৈরি হবে,” যোগ করেন তিনি।

আর এ প্রসঙ্গে ‘ওপেন রাইটস গ্রুপ’-এর নীতিমালা ব্যবস্থাপক ড. মোনিকা হর্টেনের মত, “অ্যাপল যদি কাজটা ঠিক মতো করতে না পারে, তবে দেশের সরকার কীভাবে পারবে?”

‘ক্লায়েন্ট-সাইড স্ক্যানিং’কে বড় পরিসরে নজরদারি বলে আখ্যা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

হোয়াটসঅ্যাপ নিজেই তৎপর

এমন পরিস্থিতিতে উইল ক্যাথকার্টের দাবি, হোয়াটসঅ্যাপ ইতোমধ্যেই শিশু নিপীড়নের কয়েক লাখ ছবি মুছে দিয়েছে।

“এমন অনেক কৌশল আছে যা অনেক কার্যকর, যাতে সবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে না কিন্তু প্রযুক্তি শিল্প এখনো তা গ্রহণ করেনি। ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রায় সবগুলো সেবার চেয়ে বেশি রিপোর্ট করি আমরা,” যোগ করেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক