এআই ঝুঁকি কমাতে গবেষকদের জন্য ‘দরজা খুলছে’ অ্যানথ্রপিক
নিজেদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে ‘জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা ধরে রাখতেই’ বাইরে থেকে নিরপেক্ষ গবেষকদের ডেকে আনছে কোম্পানিটি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উত্তরোত্তর সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মুখে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক।
নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য বহিরাগত গবেষকদের কোম্পানির ‘কর্মীদের মতো গভীরে প্রবেশে’র সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
অ্যানথ্রপিকের সুরে সুর মিলিয়ে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিও ভবিষ্যতে একই পথ অনুসরণ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা ও সেগুলোর উন্নয়নকারী বিভিন্ন কোম্পানির লাগামহীন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রযুক্তি বিশ্ব।
বিশ্বজুড়ে গবেষক ও মানুষের আশঙ্কা, এ প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভয়াবহ ঝুঁকি এড়াতে যা যা করা দরকার, তা ঠিকঠাক করা হচ্ছে না।
এমন হুমকির মুখে এআই নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দলগুলোর পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠছিল।
সেই দাবির মুখে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এআই মূল্যায়নকারী গবেষণা কোম্পানি ‘মেটর’-এর গবেষকদের নিজেদের সিস্টেমে ঢোকার সুযোগ করে দিচ্ছে তারা।
এরইমধ্যে কোম্পানিটির ছয়জন গবেষককে অ্যানথ্রপিকের কার্যালয় ব্যবহারের স্থান নির্ধারণের পাশাপাশি নিজস্ব কর্মীদের মতো অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিতে এক্সেস বা প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে।
অ্যানথ্রপিক কর্মীদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা কোনো সহকর্মীর মতো এ গবেষকদের সঙ্গে যাবতীয় তথ্য শেয়ার করেন।
অ্যানথ্রপিকের সিস্টেমে অনুসন্ধানের পর পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন এক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে ‘মেটর’ টিম।
অ্যানথ্রপিকের এআই ব্যবস্থা ঠিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে সেটার বিস্তারিত সেখানে উল্লেখ থাকবে। আর এ প্রতিবেদন প্রকাশ আটকে দেওয়ার কোনো ক্ষমতা অ্যানথ্রপিকের হাতে থাকছে না।
তবে গ্রাহকের গোপন তথ্য বা স্পর্শকাতর ডেটা যেন প্রতিবেদনে প্রকাশ না পায়, কেবল সে দাবিটুকু অ্যানথ্রপিক করতে পারবে।
কেবল মেটর নয়, বিভিন্ন গবেষণা ও সুরক্ষা সংগঠনের সঙ্গেও পার্টনারশিপের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে অ্যানথ্রপিক। এর অংশ হিসেবে ‘সিকিওরবায়ো’ নামের সংগঠনের সঙ্গে বিশেষ প্রজেক্টে যোগ হয়েছে তারা।
অ্যানথ্রপিকের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ যেন রাসায়নিক বা জৈব মারণাস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং এটা কোনো নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে কি না সেটাই মূল্যায়ন করছে সিকিউরবায়ো।
বহিরাগত গবেষকদের বিষয়ে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের কারণও ব্যাখ্যা করেছে অ্যানথ্রপিক।
কোম্পানিটি বলেছে, নিজেদের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে ‘জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা ধরে রাখতেই’ তারা বাইরে থেকে নিরপেক্ষ গবেষকদের ডেকে আনছে।
তবে সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল তথ্য ঢালাওভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেছে কোম্পানি।
অ্যানথ্রপিকের ভাষ্য, এসব তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ্যে এলে তা ‘ক্ষতিকর বা অসাধু চক্রের হাতে পড়ে অপব্যবহার বা কোম্পানির বাণিজ্যিক গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে’।
এ দুই বাস্তবতার মাঝামাঝি ভারসাম্য ধরে রাখতেই বেশি সংখ্যক স্বাধীন গবেষককে অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে অনুসন্ধানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যেন তারা নিজেরাই ঝুঁকি পর্যালোচনা করে সত্য তুলে ধরতে পারেন।
অ্যানথ্রপিক বলেছে, “ফ্রন্টিয়ার এআই তৈরি করা একটি কোম্পানি নিজেদের প্রযুক্তি সম্পর্কে ঠিক যতটুকু জানে, বাইরের মূল্যায়নকারীরাও যেন ঠিক ততটাই বুঝতে পারেন। আমরা ব্যবধানটুকু মুছে দিতে চাই।”
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘হোয়াইট হাউস অ্যাকর্ড অন সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এ স্বাক্ষরকারী ছয়টি বড় এআই কোম্পানির একটি অ্যানথ্রপিক।
চুক্তিটির অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে নিরাপদ প্রযুক্তির চর্চা নিশ্চিতে বাইরের স্বাধীন মূল্যায়নকারী দলের সঙ্গে যোগ হয়ে কাজ করতে হবে।
অ্যানথ্রপিক ছাড়াও এ চুক্তিতে যুক্ত রয়েছে গুগল, মেটা, ওপেনএআই, এনভিডিয়া ও এক্সএআই।
অ্যানথ্রপিকের নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে এক্সএআই-এর প্রধান ইলন মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার কোম্পানিও একই পথে হাঁটতে পারে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক লিখেছেন, “স্পেসএক্সও সম্ভবত একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে।”
তবে এটা ঠিক কীভাবে বা কী কাঠামোর মধ্য দিয়ে করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
