Published : 19 Jul 2026, 06:33 PM
যুক্তরাষ্ট্রে ডিসপ্লে, মোবাইল ও অন্যান্য ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স বিভাগ থেকে কর্মী ছাঁটাই করেছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স।
এ ছাঁটাইয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ও টেক্সাসের কর্মীদের ওপর বেশি প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।
এক বিবৃতিতে স্যামসাং বলেছে, ‘স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স আমেরিকা’ বা এসইএ সদর দপ্তর নিউ জার্সির এঙ্গলউড ক্লিফস থেকে টেক্সাসে স্থানান্তর পরিকল্পনায় নিউ জার্সির ৭৩৯টি পদে প্রভাব পড়েছে। কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য নিয়ে কাজ করে এসইএ, যেখানে চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির মুখে পড়া কর্মীদের সিংহভাগকেই টেক্সাসে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে স্যামসাং, বাকিদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে, ঠিক কতজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলেনি কোম্পানিটি।
অন্যদিকে, টেক্সাসের প্ল্যানো অফিসে মোবাইল বিভাগসহ বিভিন্ন শাখার প্রায় ১০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাঁটাইয়ের শিকার এক কর্মী। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় তথ্য দেওয়া সূত্ররা নিজেদের পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।
সদর দপ্তর স্থানান্তরের কারণে কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়া চললেও স্যামসাংয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক বৈপরীত্যকেই স্পষ্ট করে তুলেছে এমন পদক্ষেপ।
একদিকে বিশ্ববাজারে চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্যামসাংয়ের চিপ বিভাগ রেকর্ড মুনাফা ঘরে তুলছে, অন্যদিকে চিপের উচ্চ মূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ঝিমিয়ে পড়েছে কোম্পানিটির ভোক্তা প্রযুক্তি পণ্য বিভাগ।
স্যামসাংয়ের এ সদর দপ্তর স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি বেশ আকস্মিক। কারণ, এক বছরও হয়নি নিউ জার্সির নতুন অফিসে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এসইএ-র কর্মীরা কাজ শুরু করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার সদস্য জশ গটহাইমারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, নিউ জার্সিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মী কর্মরত ছিলেন। গেল বছরের সেপ্টেম্বরে সেই নতুন অফিস উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে তিনিও ছিলেন।
ছাঁটাইয়ের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানা না গেলেও রয়টার্সের দেখা কিছু নথি বলছে, ৩০ জুন কোম্পানিটি কিছু কর্মীকে ‘কোম্পানিজুড়ে কর্মী কমানো’ সংক্রান্ত নোটিশ পাঠায়, যেখানে বলা হয়, এর প্রভাব ‘যথেষ্ট বড় পরিসরে’ পড়বে।
পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘লিংকডইন’-এর বিভিন্ন পোস্ট পর্যালোচনা করে রয়টার্স লিখেছে, টেক্সাস ও নিউ জার্সির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং কর্মীসহ অন্যান্য অঞ্চলের ৩০ জনেরও বেশি কর্মী গত কয়েক সপ্তাহে চাকরি হারানোর বা কোম্পানিটি ছাড়ার কথা বলেছেন। এসইএ-এর কর্মী ছাঁটাইয়ের বিস্তারিত তথ্য এর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
এক বিবৃতিতে স্যামসাং বলেছে, “সদর দপ্তর স্থানান্তরের এ সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের কর্মী কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন, যেসব কর্মী নতুন স্থানে স্থানান্তরিত হতে পারবেন না বা ব্যবসার মূল অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেসব পদের কার্যকারিতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন, সেখানে প্রভাব পড়বে।”
চিপ বিভাগে রেকর্ড মুনাফা, লোকসানের ঝুঁকিতে মোবাইল বিভাগ
এআইয়ের কল্যাণে চিপের চড়া চাহিদার মুখে এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের মুনাফা প্রায় ১৯ গুণ বাড়ার আভাস মিলেছে। গেল মাসেই নতুন চিপ কারখানায় শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে দক্ষিণ কোরীয় এ প্রযুক্তি জায়ান্টটি।
তবে চিপ বিভাগের এই সুবর্ণ সময়ের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে স্যামসাংয়ের মোবাইল ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স বিভাগে।
স্মার্টফোনের বাজারে অ্যাপলের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং টেলিভিশন ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে টিসিএল ও হাইসেন্স-এর মতো চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপের মুখে পড়েছে স্যামসাং।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার হয়ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লোকসানের মুখ দেখতে যাচ্ছে স্যামসাংয়ের মোবাইল বিভাগ। এআই উন্মাদনার কারণে চিপের বাড়তি দামই স্যামসাংয়ের সব ধরনের ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের মুনাফায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
স্যামসাংয়ের এ কর্মী ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের বর্তমান চিত্রের বাইরের কিছু নয়। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিও এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে অন্য বিভাগ থেকে কর্মী ছাঁটাই করছে।
পাশাপাশি, টেসলা ও ওরাকলের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির পথ অনুসরণ করে স্যামসাংও তাদের সদর দপ্তর ও মূল কার্যক্রম টেক্সাসে সরিয়ে নিচ্ছে। কম কর ও ব্যবসাবান্ধব নিয়মনীতির জন্য টেক্সাস অঙ্গরাজ্যটি পরিচিত।
এ অঙ্গরাজ্যে আগে থেকেই স্যামসাংয়ের চিপ কারখানা ও প্ল্যানোতে একটি মোবাইল হাব রয়েছে।
এসইএ-এর একজন বর্তমান কর্মী বলেছেন, সাম্প্রতিক এ ছাঁটাইয়ের পর স্যামসাংয়ের কর্মীদের মনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চিপ বিভাগে সব সম্পদ ও মনোযোগ ঢেলে দেওয়ার কারণে সামনে হয়ত আরও ছাঁটাই আসতে পারে বা কোম্পানিটির হোম অ্যাপ্লায়েন্স, হোম এন্টারটেইনমেন্ট ও মোবাইল বিভাগগুলোকে একীভূত করা হতে পারে।
এক বিবৃতিতে স্যামসাং বলেছে, তাদের ভোক্তা পণ্য ব্যবসায় এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে বড় কোনো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেই। প্রযুক্তি ও এআই ইকোসিস্টেমের মধ্যে বিভিন্ন দলকে আরও কাছাকাছি এনে পারষ্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং সংগঠনকে আরও দক্ষ করে তুলতেই সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হচ্ছে।
নথিপত্র অনুসারে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চিপ বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের মোট কর্মী সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৭৭০ জন।
এদিকে, স্যামসাংয়ের আইটি সেবা সরবরাহকারী সহযোগী কোম্পানি ‘স্যামসাং এসডিএস আমেরিকা’ও নিউ জার্সির রিজফিল্ড পার্ক থেকে ১৭৯টি পদ বিলুপ্তির আভাস দিয়েছে। জুনের এক আইনি নোটিশ থেকে এই তথ্য জানা যায়।
স্যামসাং দাবি করেছে, এ পরিবর্তনটি কেবলই স্যামসাং এসডিএস-এর উত্তর আমেরিকা সদর দপ্তর স্থানান্তরের কারণে হচ্ছে এবং এর সঙ্গে সাধারণ ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই।