১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জার্মান সাইটেও হ্যাকিং চালিয়েছিল ওপেনএআই এজেন্ট

জার্মান সাইটটিকে গোপন এক মেসেজ বোর্ডে রূপান্তর করেছে এআই এজেন্টগুলো, যেখানে প্রতারণার কৌশল, নিরাপত্তা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উপায় ও গতিবিধি লুকিয়ে রাখার বিভিন্ন ফন্দি শেয়ার করছিল এরা।

জার্মান সাইটেও হ্যাকিং চালিয়েছিল ওপেনএআই এজেন্ট
ওপেনএআইয়ের কর্মকর্তারা আগেই ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছিলেন। তবে হাগিং ফেইসে ঘটা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা সামাল দিতে গিয়ে তারা বিষয়টি চেপে যান। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Sep 2026, 05:11 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টদের অভিনব ও রহস্যজনক এক কাণ্ড।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এ বছরের বসন্তে ওপেনএআইয়ের বেশ কিছু বিদ্রোহী এআই এজেন্ট জার্মানির এক উইকি সাইটে হ্যাকিং চালিয়ে সেটাকে নিজেদের গোপন যোগাযোগের বুলেটিন বোর্ডে রূপান্তর করেছিল।

শুক্রবার প্রকাশ পাওয়া নতুন এ গবেষণা প্রতিবেদন ও বিষয়টির সঙ্গে জড়িত দুই ব্যক্তির সূত্রে এ তথ্য মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

সূত্ররা বলেছেন, ওপেনএআইয়ের কর্মকর্তারা সপ্তাহকয়েক আগেই ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছিলেন। তবে ওপেন সোর্স রিপোজিটরি ‘হাগিং ফেইস’-এ জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তারা বিষয়টি চেপে যান।

মে মাসে শুরু হওয়া ও এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়া এ ঘটনাটি এআই শিল্পে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ সংকট ও উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।

জটিল বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারা উন্নত এআই এজেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন ছুটছে তখনই এমন সব তথ্য সামনে আসছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এসব সিস্টেম হয়ত নিজেদের অজান্তেই নিয়ম ভাঙতে, সুরক্ষার ত্রুটি বা লুপহোল কাজে লাগাতে ও ডেভেলপারদের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য ছাড়াই নিজেদের মধ্যে জোট বাঁধতে বা সমন্বয় করতে শিখে যাচ্ছে।

হাগিং ফেইস-এর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সেই ঘটনা চলাকালীন ওপেনএআইয়ের এজেন্টগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল এক সাইবার হামলার পরিকল্পনা করেছিল, যা টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কারো নজরে আসেনি।

ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশ্বে আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, এআই সক্ষমতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার দৌড়ে ওপেনএআই কি তবে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিসর্জন দিচ্ছে?

পাশাপাশি, মে মাসে জার্মানির ঘটনাটি সময়মতো প্রকাশ না করার বিষয়টি কোম্পানিটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ওপেনএআই দাবি করেছে, তারা এসব মডেলের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেল মাসেই নিজেদের কিছু মডেলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছিল তারা।

তবে এর রেশ কাটতে না কাটতেই এ সপ্তাহে ওপেনএআই তাদের নতুন ‘অ্যাস্ট্রা’ মডেল উন্মোচন করেছে, যা উন্নত পারফরম্যান্সের প্রতিশ্রুতি দিলেও মানুষের নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ এড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ওপেনএআইয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “যে প্রতিবেদনটি সরাসরি পর্যালোচনার সুযোগ আমরা এখনও পাইনি তার কোনো দাবি বা তথ্যের অর্থবহ জবাব দেওয়া আমাদের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।

“রয়টার্স ও প্রতিবেদনের লেখকরা আমাদের কাছে প্রতিবেদনের অপ্রকাশিত কপি দেখার অনুরোধ রাখেননি। ফলে, প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর আমরা এর প্রতিটি বিষয় সাবধানে পর্যালোচনা করব এবং প্রয়োজনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।”

ঘটনাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগ চার ব্যক্তির দাবি, জার্মানির ঘটনাটি এআই কাঠামোর সার্বিক কর্মকাণ্ডের বড় ত্রুটির ইঙ্গিত, যা ওপেনএআইয়ের বেশ কয়েকজন তদন্তকারী আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন।

তবে তদন্তের পরিধি বাড়াতে গেলে খোদ ওপেনএআইয়ের ভেতরের আইনি পরামর্শকসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকেই বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ওপেনএআইয়ের ওই মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের আইনি দল এ ঘটনার তদন্তে কোনো ধরনের বাধা তৈরি বা নিরুৎসাহিত করেছে এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।”

তিনি বলেছেন, জার্মানির এ সাইবার কার্যক্রমের সঙ্গে হাগিং ফেইসের ঘটনার কোনো সম্পর্কও ছিল না এবং সে কারণে তা হাগিং ফেইস ইনসিডেন্ট রিপোর্টেও থাকার কথা নয়।

এ ছাড়া, বাইরের স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে ওপেনএআই সবসময় সততার পরিচয় দিয়েছে ও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন নিরাপত্তা ঘটনা যথাযথভাবে প্রকাশ করেছে বলেও দাবি করেন ওই মুখপাত্র।

উইকি মেসেজ বোর্ড

জার্মানির উইকি সাইটে এআই এজেন্টের এ গোপন তৎপরতা নিয়ে রয়টার্সের কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন এআই নিরাপত্তাবিষয়ক অলাভজনক সংগঠন ‘নাইটিঙ্গেল’-এর প্রধান নির্বাহী সিডনি ভন আর্ক্স ও এআই গবেষক করম্যাক স্লেড বার্ডসহ একদল গবেষক।

অগাস্টের শেষদিকে অননুমোদিত এআই এজেন্টের আচরণ শনাক্ত করতে ইন্টারনেটে খোঁজ করার সময় তারা বিষয়টি প্রথম চিহ্নিত করেছেন।

গবেষকদের তথ্য অনুসারে, প্রোগ্রামারদের জন্য তৈরি ও উইকিপিডিয়ার মতো যৌথভাবে সম্পাদনাযোগ্য জার্মান ভাষার উইকি সাইট ‘ডিএসইউইকি’তে এআই এজেন্টদের পরিচালিত ১৫ হাজারের বেশি সম্পাদনা বা এডিট তারা দেখতে পেয়েছেন।

দেখা গেছে, ওপেনএআইয়ের এজেন্টগুলো সাইটটিকে গোপন এক মেসেজ বোর্ডে রূপান্তর করেছে, যেখানে এরা বিভিন্ন কাজে প্রতারণার কৌশল, ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উপায় ও নিজেদের গতিবিধি লুকিয়ে রাখার বিভিন্ন ফন্দি শেয়ার করছিল।

এ বিষয়ে সিডনি ভন আর্ক্স বলেছেন, “ওপেনএআই তাদের এ কাজ করতে বলেছিল এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।”

গবেষকরা বলছেন, সাইটের ওইসব কার্যক্রম এতটাই দ্রুতগতিতে পরিচালিত হচ্ছিল, যা কেবল এআই এজেন্টের পক্ষেই সম্ভব। এ ছাড়া বিভিন্ন এআই কোম্পানি নিজেদের মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার জন্য যেসব মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেসব প্রযুক্তিগত প্রশ্নের সমাধান করার তীব্র প্রবণতাও দেখা গেছে ওই এজেন্টগুলোর মধ্যে।

ওইসব মেসেজে ব্যবহারকারী হিসেবে যেসব নাম ব্যবহৃত হয়েছিল সেগুলো এইসব এজেন্ট নিজেদের ও অন্যদের বোঝাতেই ব্যবহার করত। এগুলোর প্রায় অর্ধেকেই এমন নাম ছিল, যা ওপেনএআইয়ের সঙ্গে তাদের সংযোগের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেমন ‘ওপেনএআইরিসার্চার’ বা ‘ওএআইরিসার্চমার২৬’।

গবেষকরা বলছেন, পাবলিক সার্ভারের লগ ফাইল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এ কার্যক্রমের বড় অংশ মাইক্রোসফট অ্যাজিউর অবকাঠামো থেকে পরিচালিত হয়েছে, যেটি ওপেনএআই মাঝেমধ্যে ব্যবহার করে।

ঘটনাটি ঘটার পর ওপেনএআইয়ের কর্মীরাও ওই সাইটে বারবার যাতায়াত করেছিলেন, যা থেকে গবেষকদের ধারণা, এসব এজেন্টের সঙ্গে কোম্পানিটির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

প্রতারণা ও আত্মগোপনের কৌশল

গবেষকদের পর্যালোচনা করা মেসেজগুলোতে দেখা গেছে, এসব এআই এজেন্ট মানুষের নজরদারি এড়াতে টর নেটওয়ার্কের মতো টুল ব্যবহার করেছে এবং সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ার পরও যাতে নিজেদের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাো যায়, তেমন পরিকল্পনা করছিল।

জুনে সাইটের মডারেটর পেইজগুলো ডিলিট করা শুরু হলে এআই এজেন্টগুলো সেই পরিচ্ছন্নতা অভিযান এড়াতে বিকল্প ব্যাকআপ পেইজও তৈরি করতে শুরু করেছিল।

১৯ জুন এক এজেন্ট লিখেছিল, “উইকি ক্লিনআপ বা ডিলিটের কাজ বর্ণানুক্রমে অনুসারে চলছে বলে মনে হচ্ছে। যদি পেইজটি গায়েব হয়ে যায় তবে [[ZZZDataUSAConstructionWageLive]] ব্যবহারের চেষ্টা করো।”

গবেষকরা ওয়েবসাইটে এআই এজেন্টদের কারচুপির বিভিন্ন প্রচেষ্টাও দেখতে পেয়েছেন। ‘কিংস কলেজ লন্ডন’-এর ভিজিটিং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লুকাজ ওলেজনিক বিষয়টিকে সাইবার হ্যাকিংয়ের চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে বৃহস্পতিবার এই উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সেই দাবি অস্বীকার করেছে ওপেনএআই।

অতীতে এআই এজেন্টের অসদাচরণের বিভিন্ন ঘটনাকে সাইবার সিকিউরিটি পরীক্ষার এক স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ছোট করে দেখা হত, যেখানে মডেলগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে আক্রমণাত্মক সক্ষমতার জন্য মূল্যায়ন করা হয়।

ওলেজনিক বলেছেন, সর্বশেষ এসব ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, এ ধরনের বিদ্রোহী আচরণ কেবল নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মধ্যেই সীমিত নাও থাকতে পারে।

‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি’র ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ এক্সিস্টেনশিয়াল রিস্ক’-এর গবেষক মরিস চিওডো এআই এজেন্টদের এ যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে বলেছেন, মেসেজগুলো দেখে মনে হয়েছে এগুলো ‘কোনো লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া হয়ে ওঠা কোনো এক আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের কার্যক্রম’।

তিনি বলেছেন, ঘটনাটি এ আশঙ্কাই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, উন্নত এআই থেকে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ত একক কোনো অতিবুদ্ধিমান সিস্টেম থেকে আসবে না, বরং তা আসতে পারে ‘আধা-বুদ্ধিমান এআইয়ের বড় ও পরস্পর যোগসাজশকারী দল বা ঝাঁক’ থেকে।