Published : 09 Aug 2026, 10:09 AM
মানুষের সরাসরি পর্যবেক্ষণ ছাড়াই একের পর এক প্রযুক্তি কোম্পানির নিরাপত্তা বলয় ভেঙে হানা দিচ্ছে অটোনমাস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্ট।
রয়টার্স লিখেছে, ক্ষতিকর এ সাইবার অনুপ্রবেশের ফলে কোনো অঘটন ঘটলে আইন অনুযায়ী এর দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
মানুষের সরাসরি কোনো পর্যবেক্ষণ ছাড়াই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারা এসব এআই এজেন্টের অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার আক্রমণের খবর গত কয়েকদিন ধরে নিশ্চিত করেছে শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানি।
ঠিক কী ঘটেছিল?
এআই এজেন্ট মানুষের সামান্যতম কোনো সাহায্য বা নজরদারি ছাড়াই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও জটিল কাজ করতে পারে।
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই বলেছে, তাদের তৈরি একটি এআই এজেন্ট অপর এআই স্টার্টআপ হাগিং ফেইস-এর ডিজিটাল সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেছে।
পাশাপাশি নিজস্ব সুরক্ষিত ডিজিটাল সীমানা ভেঙে এআই এজেন্টের বাইরে বেরিয়ে আসার আরও কয়েকটি নজির তারা শনাক্ত করেছে।
অন্যদিকে, আরেক মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক বলেছে, এপ্রিলের পর থেকে তাদের এআই মডেল ক্লড তিনটি আলাদা কোম্পানির সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছে।
এদিকে, মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা বলেছে, নিরাপত্তা মূল্যায়নের অংশ হিসেবে চালানো পরীক্ষার সময় তাদের একটি এআই মডেল আরেকটি কোম্পানির সিস্টেমে হ্যাকিং চালিয়েছে।
হাগিং ফেইস-এর প্রধান নির্বাহী ক্লিমেন্ট দেলাঙ্গু বলেছেন, ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টের এই অনুপ্রবেশের ঘটনায় কোনো মামলা করার পরিকল্পনা তাদের আপাতত নেই।
তবে নির্মাতারা যখন নিজেদের এআই প্রযুক্তির কাজের জন্য কোনো জবাবদিহিতা এড়াতে চান এবং এআই এজেন্ট দিয়ে সাইবার হামলা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটাকে প্রযুক্তি খাতের জন্য ‘নতুন ধরনের ঝুঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
ঘটনার পর যোগাযোগ করা হলে রয়টার্সের মন্তব্যে অনুরাধে সাড়া দেয়নি ওপেনএআই, হাগিং ফেইস ও অ্যানথ্রপিক।
মেটা বলেছে, তাদের সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নকারী স্বতন্ত্র কোম্পানি ‘ইরেগুলার’-এর কারিগরি ভুলের কারণে পরীক্ষার সময় ভুলবশত একটি এআই মডেল ইন্টারনেট সংযোগ পেয়ে যায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ‘ইরেগুলার'।
আদালতে যেতে পারে কারা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোনমাস এআই এজেন্টদের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে বেশ কয়েকটি পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। যেমন, যেসব কোম্পানির ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে এআই এজেন্টরা হানা দিয়েছে তারা ও তাদের কর্মীরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
সাইবার অনুপ্রবেশের ফলে কোনো কোম্পানির সংগৃহীত গ্রাহকদের ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য যদি ফাঁস বা হাতছাড়া হয়ে যায় তবে সংক্ষুব্ধ গ্রাহকরা একত্র হয়ে আইনি মামলা ঠুকে দিতে পারেন।
অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার নিরাপত্তার ত্রুটি বা অনুপ্রবেশের কারণে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বা বাজারমূল্য নেমে গেলে ওই কোম্পানির বিয়োগকারীরা ক্ষয়ক্ষতির দাবি নিয়ে আদালতে যেতে পারেন।
মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই এজেন্টের জড়িত থাকার এসব ঘটনায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা মামলা দায়ের করতে পারে।
অতীতেও সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ব্যর্থ হওয়া বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তা বলয় ভেঙে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া এআই এজেন্টদের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের ঘটনা একেবারেই নতুন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু পুরানো প্রচলিত আইনের আলোকেই এ সম্ভাব্য মামলার ব্যাখ্যা মিলতে পারে।
কোন অভিযোগে মামলা হতে পারে?
বিভিন্ন এআই নির্মাতা কোম্পানির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলাগুলো ‘অবহেলা’ বা দায়িত্বহীনতার দাবির ওপর ভিত্তি করে দায়ের হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বাদীপক্ষকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে, যে এআই ল্যাবটি এ অটোনমাস এজেন্ট তৈরি, পরীক্ষা বা চালু করেছিল তারা সম্ভাব্য ক্ষতি বা ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে উপযোগী আগাম সতর্কতা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই এজেন্টদের দিয়ে এ ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তবে আদালতে এগুলোকে ‘আগে থেকে জানা ঝুঁকি’ হিসেবে প্রমাণ করা সহজ হবে।
এ ছাড়া, যেসব কোম্পানির কম্পিউটার সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছে তারা নেটওয়ার্ক সুরক্ষার প্রচলিত আইন ভঙ্গের অভিযোগও তুলতে পারে।
বেশ কয়েকটি শীর্ষ ল ফার্ম তাদের মক্কেলদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত আর্টিকেলে বলেছে, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমেরিকার কেন্দ্রীয় ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্ট’ বা সিএফএএ-এর অধীনে দায়বদ্ধতার বড় প্রশ্ন তুলেছে।
তবে এ আইনের অধীনে মামলা সচল রাখতে হ্যাকিং বা অননুমোদিত প্রবেশের ‘অভিপ্রায়’ বা ‘ইচ্ছা’ প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। মানুষ ছাড়া কোনো এআই প্রোগ্রাম নিজে থেকে অনুপ্রবেশ ঘটালে কীভাবে সেই ‘অভিপ্রায়’ নির্ধারণ হবে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত রায় দেয়নি।
যেমন, গেল ৫ অগাস্ট মার্কিন এক আপিল আদালত নির্দেশ দিয়েছে, পারপ্লেক্সিটি’র এআই এজেন্টদের বিরুদ্ধে অ্যামাজনের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গোপনে প্রবেশের যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্ট’ ভঙ্গের পর্যায়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে ওই মামলাটি ছিল মানুষের হয়ে কাজ করা এআই এজেন্টের ক্ষেত্রে, সম্পূর্ণ অটোনমাস পরিচালিত এআই এজেন্টের ক্ষেত্রটি আলাদা।
কাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রে এ সংক্রান্ত যে কোনো দেওয়ানি মামলায় প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে সেই কোম্পানি, যারা সংশ্লিষ্ট এআই এজেন্টটি তৈরি করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাদীপক্ষ চাইলে এআই এজেন্টকে যে কোম্পানি সক্রিয় করেছিল এবং যে কোম্পানির নিরাপত্তা ভেঙেছে উভয়ের বিরুদ্ধেই মামলা ঠুকে দিতে পারে।
একটি ঘটনার জন্য একাধিক পক্ষকে আসামি বা বিবাদী করা হতে পারে এবং বিবাদীরাও আবার একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে পারে।
একজন বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে উদাহরণের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, যেমন কোনো ত্রুটিপূর্ণ পণ্য কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একজন বাড়ির মালিক যদি একটি খুচরা বিক্রেতা কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন তবে সেই বিক্রেতা কোম্পানিটি আবার পণ্যটির আসল নির্মাতা কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিবাদী পক্ষগুলোর সম্ভাব্য যুক্তি কী হতে পারে?
প্রযুক্তি সরবরাহকারী বিভিন্ন কোম্পানি আদালতে সাধারণত এই যুক্তি দেবে যে, এই অনুপ্রবেশ কোনো অনিচ্ছাকৃত বিষয় ছিল এবং তারা তা ঠেকানোর জন্য সব ধরনের যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নিয়েছিল।
যুক্তি হিসেবে বিবাদী পক্ষ ‘অবহেলা’র অভিযোগটি খণ্ডন করতে বলতে পারে, এআই এজেন্টের এ নির্দিষ্ট আচরণটি কোনোভাবেই ‘আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না’।
এক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ে কতটুকু নিরাপত্তাকে ‘যথেষ্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার নতুন আইন ‘অ্যাসেম্বলি বিল ৩১৬’-এর অধীনে কোনো এআই সিস্টেম নির্মাতা বা ব্যবহারকারী কোম্পানি প্রযুক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে তাদের নিজেদের দায় এড়াতে পারবে না।
এ আইনেও বিভিন্ন কোম্পানিকে কিছু প্রতিরক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেমন কোম্পানিটি যুক্তি দিতে পারে যে তাদের আচরণের কারণে প্রত্যক্ষ কোনো ক্ষতি হয়নি বা এ ক্ষতির দায়ভার অন্যান্য পক্ষের ওপরও বর্তায়।