১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মায়েদের চেয়ে জেনজি’রা পিরিয়ড নিয়ে বেশি সচেতন কেন?

“ছেলেদের মা হিসেবে আমি মনে করি, তাদেরও পিরিয়ড সম্পর্কে জানা জরুরি। একজন মেয়েকে আমি যতটা শেখাতাম, আমার ছেলেদেরও ঠিক ততটাই শেখানোর চেষ্টা করব।”

মায়েদের চেয়ে জেনজি’রা পিরিয়ড নিয়ে বেশি সচেতন কেন?
নারীদের পিরিয়ড চক্র সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য উদ্বেগকে কেবল ‘অ্যাংজাইটি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া মোটেও উচিত নয়। ছবি: ম্যাগনিফিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 03:27 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:51 PM

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ তথ্য প্রবাহ, উন্মুক্ত আলোচনা ও অনলাইন কমিউনিটির কল্যাণে পিরিয়ড ও হরমোনজনিত স্বাস্থ্য নিয়ে আগের যে কোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি সচেতন জেনজি নারীরা।

বিবিসি লিখেছে, লজ্জা ও নীরবতার পুরানো ট্যাবু ভেঙে তারা যেমন নিজেদের দেহকে নতুনভাবে চিনছেন তেমনই মায়ের প্রজন্মের না-বলা অজ্ঞতা ও তথ্যের ঘাটতি পূরণ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতায় আনছেন পরিবর্তন।

‘সাইকেল সিংকিং’ বা ‘গোয়িং লুটিয়াল’-এর মতো শব্দগুলো আজকাল অনেক তরুণীর দৈনন্দিন আলাপের অংশ হয়ে উঠেছে। পিরিয়ড ও হরমোনজনিত পরিবর্তন থেকে শুরু করে ‘পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম’ বা পিএমওএস বা প্রজনন সক্ষমতা সম্পর্কে আগের প্রজন্মের তুলনায় জেনজিরা এখন নিজেদের দেহকে অনেক ভালো বোঝেন বলেই দাবি তাদের।

তবে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা এই সচেতনতাকে স্বাগত জানালেও ইন্টারনেটে ভুল তথ্যের প্রসার ও স্বাস্থ্য বিষয়ক দুশ্চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পিরিয়ড ও নারীর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ পরিবর্তিত আলোচনা নিয়ে কথা বলেছেন ভুক্তভোগী নারী, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞেরা।

যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলের বাসিন্দা ইক্বরা ওয়াসিম ১১ বছর বয়স থেকেই পিএমওএস-এর জটিল লক্ষণ, যেমন যন্ত্রণাদায়ক ব্রণ সমস্যায় ভুগছেন।

প্রতি আটজন নারীর মধ্যে গড়ে একজন পিএমওএস-এ আক্রান্ত। নারী বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এই রোগ; যার লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত পিরিয়ড, দেহে অতিরিক্ত লোম গজানো ও অপ্রত্যাশিতভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া।

ডাক্তারদের কাছ থেকে জানার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যম থেকে বিস্তারিত তথ্য শিখেছেন ওয়াসিম। তিনি বলেছেন, তার মায়েরও একই সমস্যা থাকার পরও তিনি এখন মাকে বিভিন্ন লক্ষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় শেখান।

“আমার মা পিএমওএস-এর কারণে মারাত্মক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না।

“আমি যখন তাকে সে সম্পর্কে জানাই, তিনি ভেবেছিলেন আমি যৌন সক্রিয়তার কথা বলছি। তবে আমি মাকে বোঝাই যে এই ওষুধের অনেক ভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। এটাই আমাদের দুটি প্রজন্মের মধ্যে তথ্যের মূল তফাতটা সামনে নিয়ে আসে।

“আমার মায়ের প্রজন্মের নারীদের মধ্যেও জ্ঞান ছিল। তবে তা কেবল পরিবার, পরিচিত নারী বা চিকিৎসকদের মধ্যেই সীমিত। আর এখন কেউ ইন্টারনেটে তার পিরিয়ড বা পিএমওএস নিয়ে কথা বললে লাখ লাখ নারী সেটার সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারেন। আমাদের প্রজন্ম কোনো কিছু ‘স্বাভাবিক’ কি না তা জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করে না। তবে, আমি মনে করি না যে সামাজিক মাধ্যম কোনো চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে।”

উইল্টশায়ারের ‘অল ইয়োর্স পিরিয়ড বক্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্যারোলিন হারম্যান নিজের মেয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ফুডব্যাংকে পিরিয়ডের জরুরি পণ্য সরবরাহ করেন। তিনি বলেছেন, মাসিক সংক্রান্ত শিক্ষা উন্নত করতে এখনও ‘অনেক কাজ বাকি।

“আমাদের দেশে এক স্পষ্ট পারিবারিক বা প্রজন্মের ব্যবধান রয়েছে। আমাদের মতো একটি প্রজন্ম আছে, যাদের পিরিয়ড নিয়ে কিছুই শেখানো হয়নি। আর তাদের আগের প্রজন্মে ছিল এক নীরবতার দেয়াল, যা ভেঙে আমাদের বেরিয়ে আসতে হয়েছে।”

হরমোনের ভারসাম্যের জটিলতায় স্ট্রোকের শিকার হওয়ার পর হারম্যান নিজেই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের এই সহজলভ্যতাকে স্বাগত জানালেও তিনি সতর্কতার বার্তাও দিয়েছেন।

“এসব তথ্য কি মানসম্মত ও নিরপেক্ষ? এগুলো কি ইনফ্লুয়েন্সার কালচারের চক্করে পড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে না?

“তবে সমাজ হিসেবে পিরিয়ড সংক্রান্ত স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা যত বেশি কথা বলব, ততই ভালো। আমাদের তরুণরা যা শিখছে, আমাদেরও তাদের সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলতে হবে।”

অনলাইনে নারী স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় এখনও বেশ কিছু বাধা রয়ে গেছে বলে ধারণা হারম্যানের।

“মেটা ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত সঠিক শব্দগুলোকেও আপত্তিকর হিসেবে ধরে নিয়ে সেন্সর করছে। অথচ যৌন ও সম্পর্ক শিক্ষাক্রমের নীতি অনুসারে, আমাদের ভ্যাজাইনা ও ক্লিটোরিসের মতো সঠিক শারীরবৃত্তীয় শব্দগুলোই ব্যবহার করা উচিত।

“শিশুরা খোলাখুলি কথা বলতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।”

অনেক নারীই বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমেই তারা ‘সাইকেল সিংকিং’ বা পিরিয়ড চক্রের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে প্রথম জানতে পেরেছেন।

কটসওল্ডসের ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও দুই ছেলের মা বেথ লরেন বলেছেন, শুরুতেই কোনো বিষয়কে সামাজিক ‘ট্যাবু’ হিসেবে গড়ে না তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে জানানো জরুরি।

“শিশুরা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে বেশ আগ্রহী ও খোলামেলা। আমরা ভয় না দেখালে বিষয়টি মোটেও ভয়ের কিছু নয়, বিশেষ করে ছেলেদের মা হিসেবে আমি মনে করি, তাদেরও পিরিয়ড সম্পর্কে জানা জরুরি। একজন মেয়েকে আমি যতটা শেখাতাম, আমার ছেলেদেরও ঠিক ততটাই শেখানোর চেষ্টা করব।”

লরেন বলেছেন, সন্তান হওয়ার আগে পর্যন্ত পিরিয়ড চক্রের বিভিন্ন ধাপ বা পর্যায় সম্পর্কে তার নিজেরও স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না।

“আমার মা এ বিষয়ে বেশ খোলামেলা ছিলেন। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা কখনো গভীরভাবে আলোচনা করিনি। আসলে আমার মনে হয় না, তিনি এ বিষয়ে খুব বেশি জানতেন বা এখনও জানেন।

“সত্যি বলতে, ৩০ বছর বয়সী এক নারী হিসেবে আমার অর্জিত জ্ঞানের সিংহভাগই এসেছে সামাজিক মাধ্যম থেকে। তবে এখন যে কোনো কনটেন্ট দেখার সময় আমি তার সূক্ষ্ম বিভিন্ন দিক বিচার করতে পারি এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন থাকি।”

‘সাইকেল সিংকিং’ থেকে ‘দেহকে জানা’

জনপ্রিয় বই ‘পিরিয়ড পাওয়ার’ ও ‘পেরিমেনোপজ পাওয়ার’-এর লেখক মেসি হিল বলেছেন, ঋতুস্রাব নিয়ে কথা বলা আগের চেয়ে ‘অনেক কম সংকোচের’ বিষয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে ৩০ ও ৪০-এর কোঠায় থাকা অনেক অভিভাবকই এখন তাদের সন্তানদের সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য শেয়ার করছেন।

“বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পরিধি বড় হয়েছে। এখন পিরিয়ড কেবল কীভাবে সামলাতে হয় তার মধ্যে আটকে নেই, বরং নিজের দেহকে বোঝা ও কীভাবে দেহের যত্ন নিতে হয় তা জানার বিষয় হয়ে উঠেছে।

“যৌন শিক্ষার কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। কিছু অভিভাবক মনে করেন ৯ বছরের শিশু প্রজনন সক্ষমতা সম্পর্কে জানার জন্য বড্ড ছোট। তবে তারা বুঝতেই পারেন না, অনেক শিশুর ৯ বছর বয়সেই প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা হয়।”

মেসি হিল বলেছেন, দেহ সম্পর্কে সচেতনতা বা ‘বডি লিটারেসি’ অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া ভালো বিষয়। তবে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কীভাবে এই জ্ঞানকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজে লাগানো যায়।

একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নারীদের পিরিয়ড চক্র সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য উদ্বেগকে কেবল ‘মানসিক দুশ্চিন্তা’ বা ‘অ্যাংজাইটি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া মোটেও উচিত নয়।

“আমার ভয় হয়, ‘এইসব তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য আতঙ্ক বাড়ায়’-- এমন অজুহাত দেখিয়ে হয়ত আবার নারীদের অভিজ্ঞতাকে খাটো করা হবে। যেন আমরা আমাদের দেহের তথ্যগুলো সামলাতে সক্ষম নই!

“নারীদের কথাকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার পেছনে এক দীর্ঘ ও তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। ‘হিস্টিরিয়া’ শব্দটি এসেছে জরায়ুর গ্রীক শব্দ থেকে। শত শত বছর ধরে নারীদের যন্ত্রণা ও মানসিক আবেগকে জরায়ুর ত্রুটি হিসেবে বর্ণনা করে চিকিৎসা হিসেবে জরায়ু কেটে ফেলা বা ‘হিস্টেরেক্টমি’র মতো পথ বেছে নেওয়া হত।

“বর্তমানে যখন কোনো নারীর নিজের দেহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকে স্রেফ ‘অ্যাংজাইটি’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয় তা আমাদের সেই কুৎসিত ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়।”

‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল’-এর পিএইচডি গবেষক পপি টেইলর বলেছেন, এখন আট বছর বয়স থেকেই অনেক শিশুর প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়ে যাচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ‘যৌন ও সম্পর্ক শিক্ষাক্রমের’ আওতায় ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি এক গবেষণা করেছেন।

টেইলর বলেছেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন কিশোরী তাদের প্রথম পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগে স্কুলে এ সংক্রান্ত কোনো শিক্ষা পায়নি।

“আরেকটি বড় বিষয় অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাইভেসির সংস্কৃতি ভেঙে প্রত্যেকের দেহ ও তাদের সহপাঠীদের দেহে কী পরিবর্তন ঘটছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি, যাতে সবাই একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে।”

মেনোপজ সংক্রান্ত সামাজিক বিভিন্ন আন্দোলন যে এক বড় সামাজিক পরিবর্তন এনেছে সে কথা উল্লেখ করে টেইলর বলেছেন, “এ ধরনের আলোচনা নারীদের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কথা বলার দরজা খুলেছে এবং চিকিৎসা গবেষণাও বাড়িয়েছে।

“আমি মনে করি এমন পদক্ষেপ নিজের দেহকে ভালোভাবে জানা মানুষকে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।”