Published : 10 Jan 2026, 03:52 PM
অপ্রত্যাশিত এক বিষয়ের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যেসব জিন মানুষের হাড়ের গঠনের ওপর প্রভাব ফেলে সেগুলোর সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক অবস্থার যোগসূত্র পেয়েছেন বলে দাবি তাদের।
গবেষকরা বলছেন, কেন অনেক সিজোফ্রেনিয়া রোগী অস্টিওপোরোসিসের মতো হাড়ের সমস্যায় ভোগেন এবং তাদের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তা ব্যাখ্যা করতে পারে এ যোগসূত্র।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের ‘তিয়ানজিন মেডিকেল ইউনিভার্সিটি জেনারেল হসপিটাল’-এর ড. ফেং লিউ। এ গবেষণার কাজে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে তার দল।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সিজোফ্রেনিয়া ও হাড়ের স্বাস্থ্যের মধ্যে ১৯৫টি সাধারণ জিনগত অঞ্চল বা ‘লোসি’র মিল রয়েছে। এসব সাধারণ অঞ্চলে ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি জিন রয়েছে, যা একইসঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও হাড়ের মজবুত বৈশিষ্ট্য উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।
সিজোফ্রেনিয়া এমন এক মানসিক রোগ, যা একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, অস্টিওপোরোসিস দেহের হাড়কে দুর্বল করে দেয়। ফলে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। প্রথম দেখায় এ দুটি রোগকে সম্পূর্ণ আলাদা বা সম্পর্কহীন বলে মনে হয়।
তবে গবেষকরা দীর্ঘকাল ধরে লক্ষ্য করেছেন, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই হাড়ের ঘনত্ব কম থাকে ও তাদের হাড় বেশি ভেঙে যায়। কেউ কেউ এর জন্য পুষ্টির অভাব, পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়া বা মানসিক রোগের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে দায়ী করেছিলেন। তবে এগুলো দিয়ে সমস্যার পুরো ব্যাখ্যা মেলে না।
এখন এ জিনগত গবেষণাটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এ পুরো ‘জিনোম’ বা বংশগতির মানচিত্র বিশ্লেষণ করতে শক্তিশালী কম্পিউটার টুল ব্যবহার করেছেন গবেষকরা।
এতে সিজোফ্রেনিয়ার তথ্যের সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্যের ছয়টি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের তুলনা করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল গোড়ালি, মেরুদণ্ড ও পুরো শরীরের হাড়ে খনিজের ঘনত্বও।
সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে গোড়ালির হাড়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় হাড়ের যতগুলো অংশ নিয়ে কাজ হয়েছে তার মধ্যে গোড়ালির হাড়ের ঘনত্বের সঙ্গেই সিজোফ্রেনিয়ার সবচেয়ে বেশি জিনগত মিল পাওয়া গেছে।
কিছু জিনগত পরিবর্তন আবার বিপরীতভাবে কাজ করেছে, যেমন কোনোটি হয়ত সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে তবে হাড়ের শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে বা এর উল্টোটা ঘটছে।
জিনের এ মিশ্র প্রভাব থেকেই বোঝা যায় কেন আগের জিনগত বিভিন্ন গবেষণাতে কোনো শক্তিশালী যোগসূত্র মেলেনি। পুরো জিনের গড় ফলাফলের দিকে নজর দেওয়ায় সেই ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে গিয়েছিল, যেখানে সিজোফ্রেনিয়া ও হাড়ের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
গবেষণাটি তিনটি বড় ক্ষেত্রকে এক সুতায় বেঁধেছে, যেখানে রয়েছে মনোরোগবিদ্যা, হাড়ের স্বাস্থ্য ও জিনতত্ত্ব। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে এ গবেষণা।
যেমন ভবিষ্যতে কি ডাক্তাররা একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীর জিনগত তথ্য দেখে আগেভাগেই বলে দিতে পারবেন যে তার হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি কতটুকু? নির্দিষ্ট কিছু মানসিক রোগীর জন্য কি হাড়ের স্ক্যান করা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়াবে? বা সিজোফ্রেনিয়ার কিছু ওষুধ কি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অন্যগুলোর চেয়ে বেশি নিরাপদ হতে পারে?
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জেনোমিক সাইকিয়াট্রি’-এ।
গবেষকরা বলছেন, এ নতুন ধারণা রোগীদের আরও উন্নত সেবা দিতে সাহায্য করবে। ডাক্তারদের এমন সব চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নিতেও সাহায্য করতে পারে, যা মস্তিষ্ক ও হাড় উভয়ের জন্যই নিরাপদ।
ভবিষ্যতে এমন সব পরীক্ষা উদ্ভাবন করা সম্ভব হতে পারে, যা দিয়ে উভয় রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যাবে। ফলে অনেক আগে থেকেই প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুসারে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে।
তবে এ গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া সকল ব্যক্তিই ছিলেন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত। ফলে গবেষণার বিভিন্ন ফলাফল অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও খাটে কি না তা জানার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।
এ ছাড়া এ গবেষণায় কেবল জিনের সাধারণ বিভিন্ন পরিবর্তন খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে বিরল কোনো পরিবর্তন বা পরিবেশগত কারণও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।