১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কে কিনবে অ্যাপলের ১৯৯৯ ডলারের ফোল্ডএবল আইফোন?

উন্মাদনা কেটে যাওয়ার পর ডিভাইসটির চড়া দাম ও অ্যাপলের নির্দিষ্ট ক্রেতাকেন্দ্রিক ধারণার অভাব এটাকে ধনী ও শৌখিন প্রযুক্তিপ্রেমীদের ক্ষুদ্র এক পরিসরে আটকে ফেলতে পারে।

কে কিনবে অ্যাপলের ১৯৯৯ ডলারের ফোল্ডএবল আইফোন?
অ্যাপল তাদের নতুন ফোল্ডএবল ফোনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ক্রেতার কথা স্পষ্টভাবে বলেনি। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Sep 2026, 10:14 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১ হাজার ৯৯৯ ডলারের চড়া দামে আত্মপ্রকাশ করেছে অ্যাপলের নতুন ফোল্ডএবল ফোন। তবে এ দামি ও আকর্ষণীয় ডিভাইসটি ঠিক কাদের জন্য তৈরি তা নিয়ে প্রযুক্তি মহলে শুরু হয়েছে প্রশ্ন। 

ক্যালিফোর্নিয়ার কুপার্টিনোয় আয়োজিত জমজমাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিড় জমানো কিছু পর্যবেক্ষক এরইমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, বিত্তবান প্রযুক্তিপ্রেমীদের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে এ ফোনের আবেদন কতটুকু টিকবে।

রয়টার্স লিখেছে, অ্যাপলের নির্বাহীরা জুম, স্ল্যাক ও নেটফ্লিক্সের মতো জনপ্রিয় বিভিন্ন অ্যাপ বড় স্ক্রিনে চালিয়ে ‘আইফোন ডুও’র বহুমুখী ব্যবহার দেখিয়েছেন। কাজের পাশাপাশি কনটেন্ট তৈরি ও বিনোদনের ক্ষেত্রে ডিভাইসটি কীভাবে কাজে লাগবে তা তুলে ধরা হয়েছে অনুষ্ঠানে।

অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাস বলেছেন, ‘আইপ্যাডের মতো স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ অনুভূতির এ বড় ডিসপ্লে’ আইফোন ডুওকে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হাবে পরিণত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।

ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজির বিশ্লেষক ক্যারোলিনা মিলানেসি বলেছেন, “অ্যাপল সাধারণত নির্দিষ্ট ক্রেতা ঠিক করে দেয় না। তবে, এ ক্ষেত্রে তারা স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করা থেকেও দূরেই থেকেছে।”

এদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাপল ব্র্যান্ডের প্রভাব ও সুনামই আইফোন ডুও’র প্রাথমিক বিক্রি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট। তবে উন্মাদনা কেটে যাওয়ার পর ডিভাইসটির চড়া দাম ও অ্যাপলের সুনির্দিষ্ট ক্রেতাকেন্দ্রিক ধারণার অভাব এটাকে কেবল ধনী ও শৌখিন প্রযুক্তিপ্রেমীদের ক্ষুদ্র এক পরিসরে আটকে ফেলতে পারে। আর এ সমস্যাটি এ ক্যাটেগরি চালুর পর থেকেই তাড়া করে ফিরছে।

বাজার গবেষণা কোম্পানি ‘আইডিসি’র তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালে ফোল্ডএবল ফোন বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারের মোটের ওপর তিন শতাংশের কম দখল করবে। বাজারে অ্যাপলের প্রবেশের পরও ২০২৭ সালে এই চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।

আইফোন ডুও বাজারে আসার পর এ বছরের শেষ নাগাদ অ্যাপল প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট বিক্রি করতে পারে। ছবি: রয়টার্স

আইফোন ডুও বাজারে আসার পর এ বছরের শেষ নাগাদ অ্যাপল প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট বিক্রি করতে পারে

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিল শাহ বলেছেন, “অবশ্যই এর অবস্থান নির্ধারণে কিছুটা ঘাটতি ছিল। আমাদের দিক থেকে স্পষ্ট ছিল না যে, ফোনটি কাজের জন্য না বিনোদনের জন্য। তবে আইফোন বরাবরই বহুমুখী ডিভাইস হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে।”

উদ্দেশ্যের প্রশ্ন

অ্যাপল তাদের নতুন ফোল্ডএবল ফোনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ক্রেতার কথা স্পষ্টভাবে বলেনি, অর্থাৎ মার্কিন বাজারে যে ফোনটির দাম সর্বোচ্চ স্টোরেজে ৩ হাজার ১৯৯ ডলার হতে পারে ঠিক কোন ধরনের মানুষ বা ক্রেতারা এত অর্থ খরচ করে এটা কিনবেন অ্যাপলের বিপণন বা বিজ্ঞাপনে সেই বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ২০১০ সালে আইপ্যাড বাজারে আনার সময় ট্যাবলেট কম্পিউটারটিকে মিডিয়া ও বিনোদন ব্যবহারের দুর্দান্ত এক মাধ্যম হিসেবে নতুন ক্যাটেগরির সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

২০১৫ সাল নাগাদ তৎকালীন অ্যাপল প্রধান নির্বাহী টিম কুক এ ট্যাবলেটের নতুন ‘প্রো’ লাইনটিকে সৃজনশীল পেশাজীবীদের কাজের এক হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত করেছেন।

অ্যাপল ওয়াচকে শুরুতে ফ্যাশন পণ্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ডিভাইসটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস সহচর হিসেবে উন্নীত হয়েছে।

২০২৩ সালে অ্যাপল তাদের ‘ভিশন প্রো’ অগমেন্টেড রিয়ালিটি হেডসেট নিয়ে বাজারে কিছুটা হোঁচট খেয়েছিল।

বিশ্লেষকরা এর প্রযুক্তির প্রশংসা করলেও চড়া দাম ও বিনোদনের বাইরে এর স্পষ্ট ব্যবহারের অভাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

জমে থাকা চাহিদা

কাউন্টারপয়েন্টের বিশ্লেষক নিল শাহ বলেছেন, আইফোন ডুও বাজারে আসার পর এ বছরের শেষ নাগাদ অ্যাপল প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট বিক্রি করতে পারে। কারণ বর্তমান আইফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে সুপ্ত চাহিদা রয়েছে। কেবল এ বিক্রির মাধ্যমেই অ্যাপল বৈশ্বিক বাজারের এক চতুর্থাংশ দখল করে নিতে পারে।

ফোনের বর্তমান বাজার দখলকারী স্যামসাং ২০১৯ সাল থেকে তাদের ডিভাইস বিক্রি করে আসছে এবং অ্যালফাবেটের গুগল ও চীনের হুয়াওয়ের মতো কোম্পানির বিকল্প ডিভাইসও বাজারে রয়েছে।

শুরুতে স্ক্রিন ভেঙে যাওয়া ও যন্ত্রাংশ উঠে যাওয়ার মতো বেশ কিছু ত্রুটির কারণে ফোল্ডএবল ফোন নিয়ে ‘ফোল্ডগেট’ নামে পরিচিত এক বিপর্যয় পার হতে হয়েছিল স্যামসাংকে।

কাউন্টারপয়েন্টের তথ্য অনুসারে, ফোল্ডএবল বাজারে এখন ৪০ শতাংশ ধরে রেখেছে স্যামসাং। জুলাইয়ে পাসপোর্টের আদলে নতুন ডিজাইনের ফোল্ডএবল ফোন উন্মোচন করেছে কোম্পানিটি।

ডিভাইসটি এর পূর্বসূরিদের ছাড়িয়ে গেছে ও আইফোন ডুও’র জবাবে স্যামসাংয়ের শুরু করা প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিটি অ্যাপলকে ‘আমাদের ফেলে দেওয়া খাবার পুনরায় গরম করার’ জন্য উপহাস করেছে।

এরপরও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বাইরে গ্রাহক আকর্ষণ করতে হিমশিম খাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বাজার প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে।

প্রযুক্তি গবেষণা কোম্পানি ‘ওমডিয়া’র তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালের পর ফোল্ডএবল স্মার্টফোনের চালানে অ্যাপলের প্রবেশই সবচেয়ে বড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এনে দেবে। তারা ২০২৬ সালে বাজারের পূর্বাভাস ২২৩ লাখ ইউনিট নির্ধারণ করেছে।

‘টেকন্যালিস রিসার্চ’-এর প্রধান বিশ্লেষক বব ও’ডানেল বলেছেন, আইফোন ডুও’র চড়া দাম বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এর সম্ভাব্য ক্রেতা কমিয়ে দিয়েছে। তবে অ্যাপলের কট্টর ভক্তরা প্রাথমিক বিক্রি ঠিকই বাড়িয়ে দেবে।

“এ নিয়ে মানুষের মাঝে তীব্র আগ্রহ থাকবে, যা কিছুদিনের জন্য একটি স্ট্যাটাস সিম্বল বা মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে। কারণ আমার মনে হয় ফোল্ডএবল আইফোন সহজে পাওয়াও কঠিন হবে।”