Published : 15 Sep 2026, 04:42 PM
আলাস্কার সমুদ্রে নতুন নয়টি প্রজাতির সামুদ্রিক স্পঞ্জ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে এ অঞ্চলের অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন ধারণা মিলল।
বৃহস্পতিবার এ আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা নোয়া।
ঘোষণায় সংস্থাটি বলেছে, আলাস্কার উপসাগর ও অ্যালিউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সমুদ্র থেকে নতুন এসব প্রজাতির খোঁজ মিলেছে। নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আলাস্কায় শনাক্তকৃত বা পরিচিত স্পঞ্জ প্রজাতির মোট সংখ্যা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ২৩২টিতে।
নোয়া ফিশারিজ-এর গ্রাউন্ডফিশ ও শেলফিশ স্টক মনিটরিং সংক্রান্ত বার্ষিক বটম-ট্রেউল জরিপের সময় স্পঞ্জগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
২০১২ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত বিভিন্ন নমুনা বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে নতুন এসব প্রজাতির বিবরণ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।
‘জ্যান্ত জলপাম্প’ হিসেবে পরিচিত এসব স্পঞ্জ পৃথিবীর প্রাচীনতম বহুকোষী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম, যার ইতিহাস প্রায় ৬০ কোটি বছরেরও বেশি পুরনো।
কোনো ধরনের মস্তিষ্ক বা জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ না থাকার পরও এরা সমুদ্রের পানি ফিল্টার করে ও সমুদ্রের তলদেশে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য উপযোগী আবাসস্থল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নোয়া ফিশারিজের ‘আলাস্কা ফিশারিজ সায়েন্স সেন্টার’-এর জীববিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহ-লেখক শন রুনি বলেছেন, “এসব স্পঞ্জ বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো উদ্ভিদ নয়, তবে বনের গাছের মতো সমুদ্রের তলদেশে জটিল কাঠামো তৈরি করে, যা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ ও কাঁকড়াদেরকে আবাসস্থল ও নিরাপদ আশ্রয় দেয়।
“যখনই আমরা কোনো নতুন প্রজাতির সন্ধান পাই তা নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করে... সমুদ্রের তলদেশ অন্বেষণ করা বেশ কঠিন, বিশেষ করে পাথুরে স্থানগুলোতে বটম-ট্রেউল জরিপ চালানো সম্ভব হয় না।
“বর্তমানে আলাস্কায় ২৩২টিরও বেশি শনাক্তকৃত স্পঞ্জ প্রজাতি রয়েছে এবং সম্ভবত আরও শত শত প্রজাতি রয়েছে, যা আমাদের কাছে এখনও অজানা। এ ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ খুবই রোমাঞ্চকর।”
অধিকাংশ সামুদ্রিক প্রাণীকে এদের ডানা বা দেহের আকৃতির মতো দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য দেখে সহজে চেনা গেলেও স্পঞ্জের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ কঠিন।
কোনো জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্যান্য স্বতন্ত্র বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য না থাকায় বিজ্ঞানীদের প্রায়ই এগুলোর মাইক্রোস্কোপিক কঙ্কাল এবং জিনগত উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
নোয়ার ‘নর্থওয়েস্ট ফিশারিজ সায়েন্স সেন্টার’-এর আরেক জীববিজ্ঞানী মেরেডিথ এভারেট বলেছেন, “ডিএনএ বারকোড দ্রুত জিনগত রেফারেন্স দেয়। স্পঞ্জের ডিএনএ নিয়ে কাজ করা বেশ জটিল। কারণ এরা ফিল্টার-ফিড বা ছাঁকনি প্রক্রিয়ায় খাবার খায় ও এদের টিস্যুর ভেতরে আমরা প্রায়ই অন্য প্রাণির ডিএনএ ও জৈব রাসায়নিক পাই, যা পরীক্ষার কাজে বাধা তৈরি করে।
“তবে এত চ্যালেঞ্জ থাকার পরও আমরা আলাস্কার বিভিন্ন প্রজাতির জন্য সফলভাবে বেশ কিছু নতুন বারকোড তৈরি করেছি।”
স্পঞ্জের ঘন সম্প্রদায়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মাছের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করে নোয়া। কারণ এগুলো এমন আশ্রয় দেয়, যা মাছের বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি ও প্রজাতি পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে।
এ ছাড়াও, এসব স্পঞ্জ শিকারী ও প্রতিদ্বন্দ্বী জীবদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। যার মধ্যে কিছু উপাদান ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
এত সব পরিবেশগত গুরুত্ব থাকার পরও আলাস্কার গভীর সমুদ্রের স্পঞ্জ সম্প্রদায়গুলো এখন ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে ব্যবহৃত নিকেল ও তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের জন্য গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলন বাড়ানোর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব ও এ অঞ্চলে তলদেশ বা বটম ট্রলিংয়ের কারণে এই বিপদ তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু সংকট তীব্র আকার ধারণের পাশাপাশি এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমুদ্রের তলদেশের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতি করতে পারে– এ আশঙ্কায় পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন প্রস্তাবগুলোর জোরালো বিরোধিতা করে আসছে।
‘সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি’র আলাস্কা অঞ্চলের পরিচালক কুপার ফ্রিম্যান বলেছেন, “আলাস্কার স্পঞ্জের বাগানগুলো সুস্থ মহাসাগরের জন্য বড় ভূমিকা রাখে, যার মধ্যে সব ধরনের মাছ ও কাঁকড়ার জন্য আশ্রয় দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা অন্তর্ভুক্ত।
“বটম ট্রল ফিশিং ক্ষতিকর ও টেকসই নয়। কারণ তা নির্বিচারে সেইসব বাসস্থান ধ্বংস করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখে। এর সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশে খনিজ উত্তোলন যোগ হওয়া মানে কাটা ঘায়ে লবণের ছিটা, যা সমুদ্রের তলদেশের জীবনকে একেবারে আঁচড়ে ধ্বংস করে দেয়।”
আলাস্কা ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়ামের আশপাশের এলাকাসহ প্রশান্ত মহাসাগরের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের লাখ লাখ হেক্টর জুড়ে গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছে।
মার্কিন এসব অঞ্চলের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে এ পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।